মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে যে মারাত্মক বিপর্যয় নেমে আসার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল, তা থেকে বিশ্ব অর্থনীতিকে রক্ষা করার ক্ষেত্রে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের গৃহীত জ্বালানি কৌশল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাত শুরুর পর জ্বালানি বিশ্লেষকরা কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করেছিলেন যে, এই দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ফলে অপরিশোধিত তেলের দাম বর্তমানের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে। তবে সংঘাতের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সবচেয়ে ভয়াবহ সেই পূর্বাভাসগুলো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ওয়াশিংটনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে চীনের প্রেসিডেন্টের আসন্ন রাষ্ট্রীয় সফরের প্রাক্কালে এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, বৈশ্বিক তেলের বাজার স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে বেইজিংয়ের দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি স্বনির্ভরতা নীতি এবং কৌশলগত মজুদ বিশ্ব অর্থনীতিকে বড় ধরনের ধস থেকে রক্ষা করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ এবং তেহরানের পক্ষ থেকে কৌশলগত হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ করে দেওয়ার পরও তেলের বাজার কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে থাকার পেছনে মূলত চীনের এই সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপই দায়ী।
বিশ্লেষকদের মতে, বেইজিংয়ের এই কৌশলের পেছনে কোনো জনহিতকর উদ্দেশ্য না থাকলেও, বিশ্ববাজারে তেলের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে তা বৈশ্বিক অর্থনীতির পাশাপাশি চীনের নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করত। মার্কিন জ্বালানি তথ্য প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বের বৃহত্তম তেলের মজুদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে চীন বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করে গত বছরের শেষ নাগাদ প্রায় ১৪০ কোটি ব্যারেলে উন্নীত করেছে। বিশেষ করে যখন মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালীতে তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়, তখন চীন তাদের এই বিশাল কৌশলগত মজুদ ব্যবহার করে অপরিশোধিত তেল আমদানি নাটকীয়ভাবে কমিয়ে দেয়। দেশটির এই পদক্ষেপে বৈশ্বিক বাজারে তেলের অতিরিক্ত চাহিদার ওপর চাপ কমে যায়, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপসহ সমগ্র বিশ্বের ওপর তেলের মূল্যবৃদ্ধির মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাবকে অনেকাংশে প্রশমিত করতে সক্ষম হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বৈদ্যুতিক যানবাহনের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং বিকল্প শক্তির উৎসের ওপর বেইজিংয়ের জোর দেওয়ার বিষয়টিও এই সংকটে তাদের সহনশীলতা বা বাফার ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সৌদি পাইপলাইন বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং লোহিত সাগরে হুথি বিদ্রোহীদের তৎপরতার কারণে হরমুজ প্রণালী কেন্দ্রিক ঝুঁকি এখনো পুরোপুরি কাটেনি।
এই সামগ্রিক পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ইরান ইস্যু এবং জ্বালানি কৌশল নিয়ে গভীর মতপার্থক্য স্পষ্টভাবে বজায় রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন বেইজিংয়ের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বজায় রাখার চেষ্টা করলেও এবং ইরানকে যুদ্ধ বন্ধে বাধ্য করার জন্য চীনের অর্থনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানালেও, চীন নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থের বাইরে গিয়ে মার্কিন নির্দেশ অনুযায়ী বড় কোনো পদক্ষেপ নিতে নারাজ। বিশেষ করে তাইওয়ান দখলসহ সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি হিসেবে চীন এই বিশাল জ্বালানি মজুদ গড়ে তুলেছিল বলে অনেক বিশেষজ্ঞ অভিমত প্রকাশ করলেও, বর্তমান বৈশ্বিক সংকটে এই মজুদ ব্যবহারের ফলে বিশ্ববাজারে তেলের দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়া রোধ করা সম্ভব হয়েছে। ব্যাংক অফ আমেরিকার সাম্প্রতিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালীতে বিঘ্ন অব্যাহত থাকলে বছরের দ্বিতীয়ার্ধে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ৮৩ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১৫০ ডলার পর্যন্ত উঠে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এমন এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে হোয়াইট হাউস সরাসরি বেইজিংয়ের ভূমিকার বিষয়টি স্বীকার করতে অনীহা প্রকাশ করলেও, জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে চীনের আমদানি কমানোর ও নিজেদের মজুদ ব্যবহারের সিদ্ধান্তটিই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে তেলের বাজারকে বড় ধরনের বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার একমাত্র কার্যকর চালিকাশক্তি ছিল।
পরিশেষে বলা যায়, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত এবং এর ফলশ্রুতিতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তৈরি হওয়া দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা কেবল মার্কিন ভূরাজনৈতিক নীতিমালার ব্যর্থতা বা সফলতাই নির্ধারণ করছে না, বরং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে চীনের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সক্ষমতার এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চাপ এবং তেলের উচ্চমূল্য নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষের মুখেও চীন যেভাবে নিজস্ব অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নিরাপত্তা বজায় রেখে বিশ্ববাজারকে সামাল দিয়েছে, তা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বেইজিংয়ের দরকষাকষির অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে। আগামী দিনে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের শীর্ষ বৈঠকে এই জ্বালানি নিরাপত্তা এবং মধ্যপ্রাচ্য সংকট নিরসনের বিষয়টি কীভাবে মীমাংসা হয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বৈশ্বিক অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি। তবে এটি স্পষ্ট যে, বর্তমান বিশ্বব্যবস্থায় জ্বালানি খাতের নিয়ন্ত্রণ এবং বিকল্প শক্তির ব্যবহার বাড়াতে না পারলে যেকোনো আঞ্চলিক সংঘাতই সমগ্র বিশ্বকে গভীর অর্থনৈতিক সংকটের মুখে ঠেলে দিতে বাধ্য।