রাশিয়ান ই-কমার্স জায়ান্ট ওয়াইল্ডবেরিজের কারখানায় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় বিপদে উত্তর কোরীয় শ্রমিকরা.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

রাশিয়ান ই-কমার্স জায়ান্ট ওয়াইল্ডবেরিজের কারখানায় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় বিপদে উত্তর কোরীয় শ্রমিকরা..

Roman Rahman avatar   
Roman Rahman
রাশিয়ান ই-কমার্স জায়ান্ট ওয়াইল্ডবেরিজের কারখানায় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় বিপদে উত্তর কোরীয় শ্রমিকরা..
রাশিয়ান ই-কমার্স জায়ান্ট ওয়াইল্ডবেরিজের কারখানায় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় বিপদে উত্তর কোরীয় শ্রমিকরা..
ছবি: সংগৃহীত
রাশিয়ার বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ওয়াইল্ডবেরিজের কারখানায় ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের হতাহতের ঘটনা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘন ও ক্রমবর্ধমান মস্কো-পিয়ংইয়ং সামরিক মৈত্রী এবং শ্রম শ..

চলতি বছরের গ্রীষ্মকালে রাশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক প্ল্যাটফর্ম 'ওয়াইল্ডবেরিজ'-এর প্রায় দুই ডজন কারখানার একটিতে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটে, যেখানে কর্মরত অবস্থায় উত্তর কোরিয়ার নাগরিকরা সরাসরি বিপদের মুখে পড়েন এবং অন্তত নয়জন প্রাণ হারান। রাশিয়ায় তীব্র শ্রমিক সংকট মোকাবেলার অজুহাতে পিয়ংইয়ং প্রশাসন দেশটির সম্মুখসারির বিভিন্ন বাণিজ্যিক কারখানা ও ড্রোন উৎপাদন লাইনে এই কর্মীদের সরবরাহ করছে, যা পরবর্তীতে একটি চাকরির ওয়েবসাইটে কোরীয় ভাষা-অনুবাদক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও মাল্টিল্যাটারাল স্যাংশনস মনিটরিং টিমের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ভ্লাদিমির পুতিনের যুদ্ধপ্রচেষ্টায় কিম জং-উনের নিরঙ্কুশ সমর্থনের অংশ হিসেবে কেবল সামরিক সরঞ্জাম বা সেনা মোতায়েনই নয়, বরং বেসামরিক ও সামরিক উৎপাদনেও এই শ্রমিকদের ব্যবহার করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তির পর থেকেই এই দ্বিপক্ষীয় অংশীদারিত্ব এক নতুন মাত্রা লাভ করেছে, যা রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের গভীরতাই কেবল নির্দেশ করে না বরং বৈশ্বিক নিষেধাজ্ঞাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শনের একটি নগ্ন বহিঃপ্রকাশ হিসেবেও আন্তর্জাতিক মহলে তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।

এই শ্রমিকদের বাস্তব পরিস্থিতি এবং কর্মপরিবেশ এতটাই ভয়াবহ ও অমানবিক যে, রাশিয়া থেকে পালিয়ে আসা দলত্যাগী কর্মীরা সংবাদমাধ্যমের কাছে এটিকে আধুনিক যুগের দাসত্ব হিসেবে অভিহিত করেছেন। ভুক্তভোগী শ্রমিকদের সরাসরি তথ্য অনুযায়ী, তাদের দৈনিক প্রায় কুড়ি ঘণ্টা অর্থাৎ সকাল ছয়টা থেকে শুরু করে রাত দুইটা পর্যন্ত একটানা কঠোর পরিশ্রমে বাধ্য করা হতো এবং পুরো বছরে মাত্র দুই দিন ছুটির সুযোগ রাখা হতো। অতিরিক্ত পরিশ্রমে কেউ যদি দিনের বেলায় একটু ঘুমানোর চেষ্টা করতেন কিংবা ক্লান্তিতে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই ঘুমিয়ে পড়তেন, তবে সুপারভাইজাররা তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালাতেন, যা তাদের এক অবর্ণনীয় মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছিল। ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির সাম্প্রতিক তথ্যমতে, যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ান বাহিনীর সহায়তা ও শূন্যস্থান পূরণের জন্য উত্তর কোরিয়া প্রায় পঞ্চাশ হাজার সেনা ও কর্মী রাশিয়ায় পাঠিয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কর্মপরিবেশে অমানবিক নির্যাতন ও ন্যূনতম মানবাধিকার লঙ্ঘন করে কাজ করানোর মাধ্যমে রাশিয়া মূলত নিজেদের অভ্যন্তরীণ জনবল সংকট কাটানোর পাশাপাশি যুদ্ধক্ষেত্রের চাহিদা পূরণ করছে, যা বিশ্ববাসীর সামনে এক চরম অমানবিক শ্রম শোষণের চিত্র তুলে ধরেছে।

রাশিয়ার যুদ্ধ অর্থনীতি টিকিয়ে রাখতে এবং ফ্রন্টলাইনের জনবল ঘাটতি মেটাতে উত্তর কোরিয়ার এই কর্মী ও সেনা প্রেরণের ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের কঠোর নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পিয়ংইয়ং ও মস্কো যেভাবে তাদের সামরিক ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা দিন দিন জোরদার করে চলেছে, তা বিশ্ব নিরাপত্তার জন্য এক মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা দিচ্ছে। সম্প্রতি উত্তর কোরিয়ার সর্বোচ্চ নেতা কিম জং-উন রাশিয়ার সাথে যৌথ কার্যক্রমের পরিধি ও গভীরতা আরও বৃদ্ধি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, যা দুই দেশের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতার স্পষ্ট বার্তা বহন করে। একদিকে রাশিয়ার যুদ্ধাস্ত্র ও ড্রোন কারখানায় উত্তর কোরীয়দের বাধ্যতামূলক ও দাসতুল্য শ্রমের ব্যবহার এবং অন্যদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে হাজার হাজার সৈন্য মোতায়েনের এই যৌথ কৌশল আন্তর্জাতিক আইনের প্রকাশ্য লঙ্ঘন হলেও দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব একে অপরকে 'ঘনিষ্ঠ বন্ধু' হিসেবে অভিহিত করে এই আগ্রাসী নীতি অব্যাহত রেখেছেন। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে চলমান এই দ্বিপক্ষীয় মৈত্রী কেবল ইউক্রেন যুদ্ধের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে না, বরং বৈশ্বিক শ্রমবাজার ও মানবাধিকারের মানদণ্ডকেও মারাত্মকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

রাশিয়া ও উত্তর কোরিয়ার এই অশুভ মৈত্রী এবং বেসামরিক কারখানায় শ্রমিকদের জীবন বাজি রেখে যুদ্ধপণ্য উৎপাদনের পরিণতি বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদী ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যুদ্ধের উত্তাপ যতই বাড়ছে, ততই রাশিয়ার অর্থনীতিতে উত্তর কোরিয়ার জনশক্তির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে সাধারণ শ্রমিকরা এক ভয়াবহ ভূরাজনৈতিক খেলার বলীরূপে প্রতিনিয়ত জীবন হারাচ্ছেন। এই ধরনের গোপন ও অবমাননাকর শ্রম চুক্তি এবং নিষেধাজ্ঞার বেপরোয়া লঙ্ঘন বিশ্ব সম্প্রদায়ের কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও মনিটরিং টিমগুলোর কড়া নজরদারি সত্ত্বেও যেভাবে যুদ্ধাহত ও জনবল সংকটে জর্জরিত রাশিয়া উত্তর কোরিয়ার ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে চলেছে, তাতে ভবিষ্যতে এই অঞ্চলে সংঘাতের মাত্রা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করার আশঙ্কা থেকেই যায়। পরিশেষে, বৈশ্বিক আইনের শাসন ও মানবাধিকারের সার্বজনীন স্বীকৃতিকে পাশ কাটিয়ে এই দুই রাষ্ট্রের পারস্পরিক হাতধরাধরি আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য এক গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী সংকটের অশনি সংকেত বহন করছে।

No se encontraron comentarios


News Card Generator