জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের… | আই নিউজ বিডি

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

তানিয়া সুলতানা  avatar   
তানিয়া সুলতানা
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক নিষ্ক্রিয়তা, বিশেষ করে গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাত নিরসনে একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি বা মানবিক ত্রাণ সরবরাহের জন্য সুনির্দি...

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সাম্প্রতিক নিষ্ক্রিয়তা, বিশেষ করে গাজা উপত্যকায় চলমান সংঘাত নিরসনে একটি কার্যকর যুদ্ধবিরতি বা মানবিক ত্রাণ সরবরাহের জন্য সুনির্দিষ্ট রেজুলেশন বাস্তবায়নে বারবার ব্যর্থতা আন্তর্জাতিক আইনের কার্যকারিতা এবং বৈশ্বিক শাসন ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর প্রশ্ন তুলেছে। যখন মানবিক বিপর্যয় চরমে পৌঁছায় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কেবল নীরব দর্শক হয়ে থাকে, তখন প্রশ্ন জাগে: এটি কি নীতি প্রণেতাদের রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব, নাকি জাতিসংঘ কাঠামোর অন্তর্নিহিত দুর্বলতা, যা বৈশ্বিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা রক্ষায় এর সক্ষমতাকে সীমিত করে রেখেছে?

জাতিসংঘ সনদ, যা আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তি স্থাপন করেছে, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে রক্ষা করা। কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা, যা পাঁচটি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের হাতে ন্যস্ত, প্রায়শই এই উদ্দেশ্য পূরণে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধ থেকে শুরু করে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ, ইউক্রেন সংঘাত এবং সর্বশেষ ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংকটে দেখা গেছে, কীভাবে একটি একক দেশের জাতীয় স্বার্থ বৈশ্বিক ঐক্যমত এবং মানবিক নীতির ঊর্ধ্বে স্থান পায়। এই ক্ষমতা সামরিক আগ্রাসন বা মানবতাবিরোধী অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণে পরিষদকে পঙ্গু করে দেয়, যা সম্মিলিত নিরাপত্তার ধারণাকে দুর্বল করে তোলে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বিচার ব্যবস্থাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) বা আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) এর রায়গুলো প্রভাবশালী রাষ্ট্রগুলোর দ্বারা উপেক্ষা করা হয়, যা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে গভীর হতাশার জন্ম দেয়।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন (UN Peacekeeping) একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হলেও, এর কার্যকারিতা প্রায়শই সীমাবদ্ধ থাকে। জটিল ও বিপজ্জনক পরিবেশে কাজ করার সময় শান্তিরক্ষীরা পর্যাপ্ত সম্পদ, সুস্পষ্ট ম্যান্ডেট এবং রাজনৈতিক সমর্থন পায় না। মালি, কঙ্গো বা মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের মতো অঞ্চলে শান্তিরক্ষীদের ভূমিকা প্রায়শই স্থানীয় সংঘাতের মূল কারণ সমাধান করতে ব্যর্থ হয়, কারণ তাদের কেবল সীমিত পরিসরে শান্তি বজায় রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়, সংঘাতের গভীরে প্রবেশ করে স্থায়ী সমাধান খোঁজার ক্ষমতা থাকে না। উপরন্তু, সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছ থেকে পর্যাপ্ত ও সময়োচিত অর্থায়ন না পাওয়াও এই মিশনগুলোর সক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। অন্যদিকে, আঞ্চলিক সংস্থা যেমন BIMSTEC এবং সার্ক (SAARC) তাদের নিজ নিজ ভৌগোলিক সীমানায় আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং স্থিতিশীলতা বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হলেও, তাদেরও নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আন্তঃরাষ্ট্রীয় বিরোধ, সদস্য দেশগুলোর মধ্যে রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব এবং পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর অনুপস্থিতি প্রায়শই তাদের কার্যকারিতাকে সীমিত করে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই জটিল বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক প্রেক্ষাপটে তার ভূমিকা পালন করে, একদিকে যেমন জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে বৈশ্বিক শান্তি রক্ষায় অবদান রাখে, অন্যদিকে তেমনি BIMSTEC ও সার্কের মতো আঞ্চলিক প্ল্যাটফর্মে আঞ্চলিক সহযোগিতা জোরদারে কাজ করে। তবে, আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতা এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর প্রভাব এই সকল প্রচেষ্টাকে প্রায়শই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দেয়।

জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে শীর্ষ অবদানকারী দেশ (সামরিক ও পুলিশ সদস্য, এপ্রিল ২০২৪) অবদানকারী সদস্য সংখ্যা উল্লেখযোগ্য মিশন
বাংলাদেশ ৭,৭০০+ MINUSCA (মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র), MONUSCO (গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র), UNMISS (দক্ষিণ সুদান)
নেপাল ৬,২৫০+ MINUSCA, UNMISS, UNDOF (গোলান হাইটস)
ভারত ৬,০০০+ MONUSCO, UNMISS, UNIFIL (লেবানন)
পাকিস্তান ৪,১০০+ MONUSCO, UNMISS, MINUSCA
মিশর ৩,০০০+ MINUSMA (মালি), MONUSCO, UNISFA (আবেই)
ইন্দোনেশিয়া ২,৭০০+ MONUSCO, UNIFIL, MINUSCA

উৎস: UN Peacekeeping official data, এপ্রিল ২০২৪।

সুপারিশ

  • জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা সংস্কারের জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট সময়সীমা ভিত্তিক আলোচনা শুরু করা, যেখানে ভেটো প্রয়োগের ক্ষমতাকে আরও স্বচ্ছ এবং জবাবদিহিমূলক করা হবে, অথবা এর ব্যবহারকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ করা হবে। এই সংস্কারের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে একটি রেজুলেশন উত্থাপন করে আলোচনাকে ত্বরান্বিত করা যেতে পারে।
  • আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এবং আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) এর রায় ও সিদ্ধান্তগুলো কার্যকর করার জন্য জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি বাধ্যতামূলক প্রক্রিয়া তৈরি করা। এক্ষেত্রে, জাতিসংঘের সনদ (UN Charter) এর অধ্যায় VII এর অধীনে নিরাপত্তা পরিষদের মাধ্যমে রায় বাস্তবায়নে বাধ্যবাধকতা আরোপের জন্য একটি নতুন কাঠামো তৈরি করা যেতে পারে, যা ভেটো ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করবে।
  • আঞ্চলিক সংস্থা যেমন BIMSTEC এবং সার্ক (SAARC) এর সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তাদের ম্যান্ডেটকে আরও সুনির্দিষ্ট করা, যাতে তারা তাদের নিজ নিজ অঞ্চলে প্রাথমিক সংঘাত প্রতিরোধ ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় আরও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। এর জন্য জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা বিভাগের সাথে এই আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর একটি আনুষ্ঠানিক সহযোগিতা চুক্তি (Cooperation Agreement) স্থাপন করা যেতে পারে, যা প্রয়োজনে যৌথ মিশন পরিচালনা এবং সম্পদ বিনিময়ের পথ সুগম করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানিয়া সুলতানা

তানিয়া সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator