অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স: অদৃশ্য স্বাস্থ্য সংকট ও নিয়ন্ত্রণের পথ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স: অদৃশ্য স্বাস্থ্য সংকট ও নিয়ন্ত্রণের পথ

ডা. তৌহিদ হাসান  avatar   
ডা. তৌহিদ হাসান
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স: অদৃশ্য স্বাস্থ্য সংকট ও নিয়ন্ত্রণের পথ
অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স: অদৃশ্য স্বাস্থ্য সংকট ও নিয়ন্ত্রণের পথ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সর্বশেষ প্রকাশিত উপাত্তে দেখা গেছে, বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও ভুল ব্যবহা...

সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সর্বশেষ প্রকাশিত উপাত্তে দেখা গেছে, বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার ও ভুল ব্যবহারের কারণে সৃষ্ট অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যকে এক অদৃশ্য অথচ ভয়াবহ সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই উপাত্ত অনুযায়ী, সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে ব্যাকটেরিয়ার প্রতিরোধ ক্ষমতা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বহু প্রচলিত সংক্রমণ চিকিৎসায় কার্যকর বিকল্প খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠছে। এই পরিস্থিতি কেবল দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকেই নয়, বরং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও হুমকির মুখে ফেলছে, কারণ রোগ নিরাময়ে ব্যর্থতা উৎপাদনশীলতা হ্রাস করে এবং চিকিৎসা ব্যয় বহু গুণ বাড়িয়ে দেয়।

অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক এবং পরজীবী তাদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ঔষধের কার্যকারিতা হারায়। এর ফলে সাধারণ সংক্রমণ এবং ছোটখাটো আঘাতও মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে, যা আগে সহজেই নিরাময়যোগ্য ছিল। এর মূল কারণগুলির মধ্যে রয়েছে মানুষের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার, চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক সেবন, কৃষিক্ষেত্রে এবং পশুপালনে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যাপক প্রয়োগ, দুর্বল সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, এবং নতুন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ঔষধের গবেষণায় বিনিয়োগের অভাব। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এটিকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্যের জন্য শীর্ষ দশটি হুমকির একটি হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষের মৃত্যুর কারণ হচ্ছে এবং ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধন করছে। এই সংকট মোকাবেলায় 'ওয়ান হেলথ' (One Health) অ্যাপ্রোচ, অর্থাৎ মানুষ, প্রাণী এবং পরিবেশের স্বাস্থ্যকে সমন্বিতভাবে দেখার নীতি গ্রহণ করা অপরিহার্য, কারণ রেজিস্ট্যান্স কেবল মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং প্রাণী ও পরিবেশেও এর বিস্তার ঘটে।

বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলিতে AMR-এর প্রভাব আরও ভয়াবহ। এখানে স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোগত দুর্বলতা, রোগ নির্ণয়ের সীমিত সুযোগ, এবং ঔষধ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার শিথিলতা সংকটকে আরও বাড়িয়ে তোলে। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এর এক গবেষণা অনুযায়ী, AMR বৈশ্বিক জিডিপি’র ১.১% থেকে ৩.৮% পর্যন্ত হ্রাস করতে পারে, যা ২০৩০ সাল নাগাদ নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে প্রায় ২৪ মিলিয়ন মানুষকে চরম দারিদ্র্যের দিকে ঠেলে দিতে পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, হাসপাতালে দীর্ঘ সময় অবস্থান, জটিল রোগের চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি এবং উচ্চ মৃত্যুর হার স্বাস্থ্য খাতে একটি বড় বোঝা সৃষ্টি করছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও দক্ষিণ এশিয়ায় AMR-এর ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে এবং এই অঞ্চলের দেশগুলোকে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা জোরদার করার আহ্বান জানানো হয়েছে। বিশেষ করে, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা স্তরে অ্যান্টিবায়োটিকের অপ্রয়োজনীয় ব্যবহার রোধে প্রশিক্ষিত জনবল এবং উন্নত রোগ নির্ণয় পদ্ধতির অভাব এই সংকটের একটি বড় কারণ।

এই অদৃশ্য স্বাস্থ্য সংকট মোকাবেলায় বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হলেও, এর বাস্তবায়ন এখনও চ্যালেঞ্জের মুখে। বিশেষত, অ্যান্টিবায়োটিকের বিক্রয় ও বিতরণে কঠোর নজরদারির অভাব, এবং জনসচেতনতার অভাবে অ্যান্টিবায়োটিকের অপব্যবহার কমানো যাচ্ছে না।

ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিক ২০১৬ সালের প্রতিরোধ ক্ষমতা (%) ২০২০ সালের প্রতিরোধ ক্ষমতা (%) ২০২২ সালের প্রতিরোধ ক্ষমতা (%)
Escherichia coli Ciprofloxacin ৬২% ৭৮% ৮৫%
Escherichia coli Ceftriaxone ৩৮% ৫২% ৬৭%
Klebsiella pneumoniae Ceftriaxone ৪০% ৫৬% ৭২%
Staphylococcus aureus Methicillin (MRSA) ৩৫% ৪৫% ৫৩%

উৎস: বাংলাদেশ জাতীয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সার্ভেইল্যান্স রিপোর্ট, ডিজিএইচএস (২০১৬-২০২২)

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়কে বাংলাদেশ জাতীয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স প্রতিরোধ কর্মপরিকল্পনা (২০১৭-২০২২) এর পরবর্তী সংস্করণ প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে জরুরি ভিত্তিতে বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করতে হবে এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে (DGDA) শক্তিশালী করে অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি ও প্রেসক্রিপশন পর্যবেক্ষণে কঠোর আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, বিশেষ করে নন-প্রেসক্রিপশন অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে।
  • জাতীয় অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স সার্ভেইল্যান্স প্রোগ্রামের অধীনে সকল সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে একটি সুসংহত এবং অত্যাধুনিক AMR নজরদারি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে হবে, যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গ্লোবাল অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইউজেজ সার্ভেইল্যান্স সিস্টেম (WHO GLASS) নির্দেশিকা মেনে চলবে। এই কার্যক্রমের জন্য বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এর সহায়তায় প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে।
  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একটি ব্যাপকভিত্তিক জনসচেতনতামূলক অভিযান শুরু করতে হবে, যা অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার, ব্যক্তিগত ও পরিবেশগত স্বাস্থ্যবিধি এবং টিকাদানের গুরুত্বের উপর জোর দেবে। এই অভিযানটি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে পরিচালিত হবে এবং সকল স্তরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমকে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত করা হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ডা. তৌহিদ হাসান

ডা. তৌহিদ হাসান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: সংক্রামক ও অসংক্রামক ব্যাধি নিয়ন্ত্রণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

コメントがありません


News Card Generator