স্মার্ট সিটি, আরবান প্ল্যানিং ও আর্কিটেকচার: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

স্মার্ট সিটি, আরবান প্ল্যানিং ও আর্কিটেকচার: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

স্থপতি তামিম  avatar   
স্থপতি তামিম
স্মার্ট সিটি, আরবান প্ল্যানিং ও আর্কিটেকচার: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
স্মার্ট সিটি, আরবান প্ল্যানিং ও আর্কিটেকচার: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'বাংলাদেশ আরবানাইজেশন রিভিউ' প্রতিবেদনটি আবারও দেশের নগর পরিকল্পনা ও স্মার্ট সিটি উদ্যোগগুলোর দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জগুলোকে সামন...

সম্প্রতি বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত 'বাংলাদেশ আরবানাইজেশন রিভিউ' প্রতিবেদনটি আবারও দেশের নগর পরিকল্পনা ও স্মার্ট সিটি উদ্যোগগুলোর দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জগুলোকে সামনে এনেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপরিকল্পিত নগরায়ন এবং দুর্বল অবকাঠামো ব্যবস্থাপনার কারণে বাংলাদেশের শহরগুলো তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার মান উভয়কেই প্রভাবিত করছে। বিশেষত, রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য প্রধান শহরগুলোতে আধুনিক নগর পরিকল্পনার অভাব প্রকটভাবে দৃশ্যমান, যেখানে স্মার্ট প্রযুক্তির ব্যবহার কেবল প্রাথমিক পর্যায়ে আটকে আছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা কাঙ্ক্ষিত সুফল দিতে পারছে না। এই প্রেক্ষাপটে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা কর্তৃক গৃহীত স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলো কেন ধীরগতিতে চলছে এবং কোথায় সমন্বয়ের অভাব রয়েছে, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা জরুরি।

স্মার্ট সিটি ধারণার মূল ভিত্তি হলো উন্নত প্রযুক্তি, পরিবেশ-বান্ধব ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিকদের জন্য উন্নত জীবনযাত্রা নিশ্চিত করা। কিন্তু বাংলাদেশে এই ধারণার বাস্তবায়ন প্রায়শই খণ্ডিত এবং বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকছে। উদাহরণস্বরূপ, বিভিন্ন সিটি কর্পোরেশন বা রাজউক (RAJUK) কর্তৃক গৃহীত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা একটি বড় সমস্যা। একটি স্মার্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম সফল করতে যেমন আধুনিক সংকেত ব্যবস্থা প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন যানজট নিরসনে সুপরিকল্পিত রাস্তাঘাট এবং গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন। অথচ প্রায়শই দেখা যায়, কেবল প্রযুক্তিগত সমাধান নিয়ে আসা হচ্ছে, কিন্তু তার অন্তর্নিহিত ভৌত অবকাঠামো বা নীতিগত সংস্কারের দিকে নজর দেওয়া হচ্ছে না। এর ফলস্বরূপ, কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগের পরও অনেক প্রকল্পই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে ভূমি ব্যবহার নীতিমালা (Land Use Policy) এবং জোনিং রেগুলেশনের (Zoning Regulation) দুর্বল প্রয়োগ এই ব্যর্থতার অন্যতম কারণ। অপরিকল্পিত ভবন নির্মাণ, উন্মুক্ত স্থানের অভাব এবং জলাভূমি ভরাট করে স্থাপনা তৈরি – এ সবই বিদ্যমান পরিকল্পনার দুর্বল বাস্তবায়নের ইঙ্গিত দেয়। এর ফলে প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং নাগরিক জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে, যা স্মার্ট সিটি ধারণার পরিপন্থী।

স্থাপত্য ও নগর নকশার ক্ষেত্রেও উদ্ভাবনী এবং টেকসই পদ্ধতির অভাব স্পষ্ট। বাংলাদেশের শহরগুলোতে আধুনিক স্থাপত্যের প্রয়োগ থাকলেও, তা প্রায়শই স্থানীয় জলবায়ু, সংস্কৃতি এবং সামাজিক প্রয়োজনকে উপেক্ষা করে গড়ে উঠছে। পর্যাপ্ত সবুজ স্থান, হাঁটার পথ, বাইসাইকেল লেন এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত স্থানের অভাব শহরগুলোকে কেবল ইট-পাথরের জঞ্জালে পরিণত করছে। পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়ন (Environmental Impact Assessment - EIA) এবং সামাজিক প্রভাব মূল্যায়ন (Social Impact Assessment - SIA) প্রক্রিয়াগুলো প্রায়শই দায়সারাভাবে সম্পন্ন হয়, যার ফলে দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত এবং সামাজিক সমস্যা সৃষ্টি হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বহুবার বাংলাদেশের নগর উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে টেকসই নকশা এবং পরিবেশ-বান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহারের ওপর জোর দিয়েছে। কিন্তু স্থানীয় পর্যায়ে জ্ঞান ও প্রশিক্ষণের অভাব, সেই সাথে রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, এই সুপারিশগুলোর বাস্তবায়নে বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। উদাহরণস্বরূপ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার মতো মৌলিক নাগরিক পরিষেবাগুলোতে স্মার্ট প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হলেও, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা পুরনো পদ্ধতিতেই পরিচালিত হচ্ছে, যা নগরীর পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি সৃষ্টি করছে।

এছাড়াও, স্মার্ট সিটি প্রকল্পের সাফল্যের জন্য যে কারিগরি দক্ষতা ও মানবসম্পদ প্রয়োজন, তার অভাবও প্রকট। বিদেশী পরামর্শকদের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা একদিকে যেমন প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি করে, তেমনি স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও বাধা দেয়। বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা এই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। একটি স্মার্ট সিটি কেবল প্রযুক্তিগত অবকাঠামো নয়, এটি এমন একটি বাস্তুতন্ত্র যেখানে নাগরিকরা সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং তাদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হয়। কিন্তু বর্তমানে অধিকাংশ প্রকল্পেই নাগরিকদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, যার ফলে তাদের প্রয়োজন ও আকাঙ্ক্ষাগুলো প্রায়শই উপেক্ষিত থাকছে। সরকারের ‘ভিশন ২০৪১’ বাস্তবায়নে স্মার্ট সিটি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলেও, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় আরও সুসংহত এবং দূরদর্শী পরিকল্পনা অপরিহার্য।

প্রকল্পের ক্ষেত্র লক্ষ্যমাত্রা (২০২০-২০২৪) বাস্তবায়ন হার (২০২৪ পর্যন্ত) চ্যালেঞ্জের ক্ষেত্র
স্মার্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম ১০টি প্রধান শহরে স্থাপন ৩টি শহরে আংশিক আন্তঃসংস্থা সমন্বয়ের অভাব, প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা
ডিজিটাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ৫টি সিটি কর্পোরেশনে বাস্তবায়ন ২টি সিটি কর্পোরেশনে পাইলট প্রকল্প অর্থায়ন সংকট, স্থানীয় সক্ষমতার অভাব
সবুজ স্থান ও পার্কের উন্নয়ন শহরের মোট এলাকার ১৫% সবুজায়ন শহরের মোট এলাকার ৭% ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতা, পরিকল্পনার দুর্বলতা
পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন ১০০% স্মার্ট মিটারিং ও উন্নত নেটওয়ার্ক ৩০% স্মার্ট মিটারিং, ৫০% নেটওয়ার্ক উন্নয়ন অবকাঠামো সংস্কারের ধীরগতি, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব
নাগরিক তথ্য পরিষেবা পোর্টাল সকল সিটি কর্পোরেশনে চালু ৫০% সিটি কর্পোরেশনে আংশিক চালু ডিজিটাল বিভাজন, রক্ষণাবেক্ষণের অভাব

উৎস: বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকার (সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের বার্ষিক প্রতিবেদন, ২০২২-২০২৪ এর তথ্য বিশ্লেষণ করে তৈরি)।

সুপারিশ

  • আইন ও নীতি সংস্কার: বাংলাদেশ সরকার অবিলম্বে 'বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড (BNBC)' এবং 'টাউন ইম্প্রুভমেন্ট অ্যাক্ট, ১৯৫৩' সহ নগর পরিকল্পনা সংক্রান্ত সকল আইন ও নীতিমালার আধুনিকীকরণ ও সমন্বয় সাধন করুক। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এই সংস্কার প্রক্রিয়ায় নেতৃত্ব দেবে, যেখানে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDG) এবং স্মার্ট সিটি ধারণার মূল উপাদানগুলো (যেমন: সবুজ ভবন, মিশ্র ভূমি ব্যবহার, গণপরিবহন-কেন্দ্রিক উন্নয়ন) অন্তর্ভুক্ত করা হবে। World Bank এবং ADB-এর কারিগরি সহায়তা নিয়ে একটি সমন্বিত ও যুগোপযোগী নগর উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে, যা সকল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান (সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা) অনুসরণ করতে বাধ্য থাকবে।

  • আন্তঃসংস্থা সমন্বয় ও সক্ষমতা বৃদ্ধি: প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের অধীনে একটি 'জাতীয় স্মার্ট সিটি স্টিয়ারিং কমিটি' গঠন করা হোক, যেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (যেমন: স্থানীয় সরকার, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত, পরিবেশ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি), রাজউক, সিটি কর্পোরেশন এবং বিশেষজ্ঞদের সমন্বয় থাকবে। এই কমিটি স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোর পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন ও পর্যবেক্ষণের দায়িত্বে থাকবে এবং World Bank ও ADB-এর অর্থায়নে চলমান প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে। একই সাথে, ন্যাশনাল একাডেমি ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (NAPD) এবং বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (BUET)-এর মাধ্যমে নগর পরিকল্পনাবিদ, স্থপতি ও প্রকৌশলীদের জন্য নিয়মিত উচ্চতর প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করা হোক, যাতে স্থানীয় পর্যায়ে কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি পায়।

  • নাগরিক অংশগ্রহণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা: প্রতিটি স্মার্ট সিটি প্রকল্পে স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভা) কর্তৃক বাধ্যতামূলকভাবে নাগরিক অংশগ্রহণ প্রক্রিয়া (যেমন: পাবলিক হেয়ারিং, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে মতামত গ্রহণ) নিশ্চিত করা হোক। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) আইন, ২০০৯-এ এই বিধান অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে। একই সাথে, ডিজিটাল বিভাজন কমাতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ (ICT Division) এবং বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন রেগুলেটরি কমিশন (BTRC) এর তত্ত্বাবধানে শহর ও শহরতলীতে সাশ্রয়ী মূল্যে উচ্চগতির ইন্টারনেট পরিষেবা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের ডিজিটাল সাক্ষরতা বৃদ্ধিতে কর্মসূচি গ্রহণ করা অপরিহার্য। এটি স্মার্ট সিটি প্রকল্পগুলোর সফল বাস্তবায়নে নাগরিকদের সক্রিয় অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করবে এবং তাদের চাহিদা অনুযায়ী পরিষেবা প্রদানের পথ সুগম করবে।


✍️ নিবন্ধ লেখক: স্থপতি তামিম

স্থপতি তামিম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: স্মার্ট সিটি, আরবান প্ল্যানিং ও আর্কিটেকচার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No se encontraron comentarios


News Card Generator