বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও… | আই নিউজ বিডি

বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

ড. তৌফিক এলাহী  avatar   
ড. তৌফিক এলাহী
বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জনআস্থার সংকট নিরসনে যে গভীর চ্যালেঞ্জগ...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক প্রকাশিত সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদনে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা এবং জনআস্থার সংকট নিরসনে যে গভীর চ্যালেঞ্জগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে, সে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে, গত জাতীয় ও স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে উত্থাপিত অনিয়মের অভিযোগ, নির্বাচনকালীন সহিংসতা এবং নির্বাচনের পূর্বে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থার অভাব একটি বড় উদ্বেগের কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি কেবল নির্বাচনী ব্যবস্থার উপরই নয়, সামগ্রিকভাবে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া ও সুশাসনের উপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্নির্মাণ এবং রাজনৈতিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। এই প্রেক্ষাপটে, নির্বাচনী সংস্কারের পাশাপাশি জবাবদিহিতা ও আইনের শাসনের প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা এবং জনগণের আস্থা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রধান চ্যালেঞ্জগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো নির্বাচন কমিশনের কার্যকারিতা এবং এর স্বাধীনতার প্রশ্ন। সংবিধানে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন সংস্থা হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও, বাস্তবে এর কার্যক্রমে নির্বাহী বিভাগের প্রভাব নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ, নির্বাচন কমিশন আইন, ২০০৯-এর অধীনে কমিশনের ক্ষমতা ও কার্যপরিধি নির্ধারিত হলেও, নিয়োগ প্রক্রিয়া এবং বাজেট বরাদ্দের মতো বিষয়গুলোতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিশেষত আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সমন্বয় একটি জটিল প্রক্রিয়া তৈরি করে। নির্বাচনী আইন ও বিধিমালা, যেমন গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২-এর প্রয়োগে দুর্বলতা এবং নির্বাচনী অপরাধ দমনে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের সীমাবদ্ধতাও আস্থার সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সংলাপ ও ঐকমত্যের অভাব, বিশেষত নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে, প্রায়শই নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে বিতর্কিত করে তোলে। এটি কেবল ভোটারদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে না, বরং গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণকেও নিরুৎসাহিত করে। ফলস্বরূপ, ভোট প্রদানের হার কমে যায় এবং নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, যা সুশাসনের ভিত্তিকে দুর্বল করে।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর মতো সংস্থাগুলো বাংলাদেশের সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা নিয়ে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করে থাকে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক-এর 'ওয়ার্ল্ডওয়াইড গভর্ন্যান্স ইন্ডিকেটর' (WGI) রিপোর্টে 'ভয়েস অ্যান্ড অ্যাকাউন্টিবিলিটি' (Voice and Accountability) এবং 'রুল অফ ল' (Rule of Law) সূচকগুলোতে বাংলাদেশের অবস্থান প্রায়শই উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। এই সূচকগুলো একটি দেশের নাগরিকদের তাদের সরকার নির্বাচনের ক্ষমতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন কতটা কার্যকর, তা পরিমাপ করে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে, এই সূচকগুলোর ক্রমাবনতি ইঙ্গিত দেয় যে, নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ এবং আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনও অনেক ঘাটতি রয়েছে। এডিবিও তাদের বিভিন্ন প্রতিবেদনে নির্বাচনী সংস্কার, দুর্নীতি দমন এবং বিচারিক স্বাধীনতার উপর জোর দিয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য অপরিহার্য। বাংলাদেশ সরকার যদিও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলে থাকে, যেমন ডিজিটাল বাংলাদেশ বিনির্মাণ এবং তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে সেবার মান উন্নয়ন, কিন্তু রাজনৈতিক স্বচ্ছতা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড পূরণে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর পর্যবেক্ষণ এবং সুপারিশগুলো দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার প্রক্রিয়ায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা প্রদান করতে পারে, যদি সেগুলো আন্তরিকভাবে গ্রহণ করা হয়।

রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র এবং তাদের আর্থিক স্বচ্ছতাও জনগণের আস্থা অর্জনে একটি বড় উপাদান। বাংলাদেশের অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের কথা বলা হলেও, বাস্তবে নেতৃত্ব নির্বাচন এবং নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় সাধারণ কর্মীদের অংশগ্রহণ প্রায়শই সীমিত থাকে। রাজনৈতিক দলের তহবিল সংগ্রহ ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব একটি পুরোনো সমস্যা। এই অর্থের উৎস এবং ব্যয় সম্পর্কে জনগণের কাছে সুনির্দিষ্ট তথ্য না থাকায় প্রায়শই দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, যা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার প্রতি জনগণের বিতৃষ্ণা বাড়ায়। যদিও নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দলগুলোকে বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিতে বাধ্য করে, কিন্তু এই প্রতিবেদনগুলোর সত্যতা যাচাই এবং এর উপর ভিত্তি করে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়াটি এখনও দুর্বল। সুশীল সমাজ এবং গণমাধ্যম এই বিষয়ে ক্রমাগত আলোকপাত করে আসলেও, রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে পূর্ণাঙ্গ স্বচ্ছতা প্রদর্শনে অনীহা দেখা যায়। একটি কার্যকর গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর জবাবদিহিতা অপরিহার্য। এর জন্য প্রয়োজন শুধু আইনি কাঠামো শক্তিশালী করা নয়, বরং রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে গুণগত পরিবর্তন আনা, যেখানে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হবে। এই পরিবর্তনগুলো ছাড়া, জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, যা বাংলাদেশ সরকারের একটি অন্যতম অঙ্গীকার হওয়া উচিত।

সূচক/সাল ২০১৪ নির্বাচন (জাতীয়) ২০১৮ নির্বাচন (জাতীয়) ২০২৪ নির্বাচন (জাতীয়)
মোট ভোটার (প্রায়) ৯.১৯ কোটি ১০.৪২ কোটি ১১.৯৬ কোটি
ভোট প্রদানের হার (আনুমানিক) ২২.০০% ৮০.০০% ৪২.০০%
ওয়ার্ল্ড ব্যাংক গভর্ন্যান্স ইনডিকেটর (ভয়েস ও জবাবদিহিতা) (স্কেল: -২.৫ থেকে +২.৫) -১.০৪ -০.৭৩ -০.৮৮ (সর্বশেষ উপলব্ধ)

উৎস: বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (ওয়ার্ল্ডওয়াইড গভর্ন্যান্স ইন্ডিকেটরস, সর্বশেষ আপডেট অনুযায়ী)

সুপারিশ

  • নির্বাচন কমিশনকে কার্যকরভাবে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে নির্বাচন কমিশন আইন, ২০০৯-এর ধারা ৮ এবং ৯ সংশোধন করা হোক, যাতে কমিশনের বাজেট বরাদ্দ সরাসরি জাতীয় সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হয় এবং এর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় বা নির্বাহী বিভাগের প্রভাব সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত হয়।
  • রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO), ১৯৭২-এর ধারা ৯০বি এবং রাজনৈতিক দল নিবন্ধন বিধিমালা, ২০২০-এর ধারা ৯ সংশোধন করে রাজনৈতিক দলগুলোর তহবিল সংগ্রহ, ব্যয় এবং অনুদানের উৎস বাধ্যতামূলকভাবে জনসমক্ষে প্রকাশ করার বিধান প্রবর্তন করা হোক এবং এই তথ্যের সত্যতা যাচাইয়ে নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন নিরীক্ষার ক্ষমতা প্রদান করা হোক।
  • নির্বাচনকালীন সময়ে নির্বাচনী অনিয়ম এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির প্রক্রিয়াকে দ্রুততর ও অধিকতর কার্যকর করতে আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে বিচারিক প্যানেল গঠন করা হোক এবং নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালগুলোকে সুনির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সকল মামলা নিষ্পত্তি করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি ও লজিস্টিক সহায়তা প্রদান করা হোক, যা সুনির্দিষ্টভাবে ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এবং দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮-এর সংশ্লিষ্ট ধারাগুলোর আওতায় পরিচালিত হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. তৌফিক এলাহী

ড. তৌফিক এলাহী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: নির্বাচন, ট্রাস্ট ও রাজনৈতিক স্বচ্ছতা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator