রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ সংলগ্ন জাতীয় সংসদ ভবন এলাকায় গত ২৯ আগস্ট শিক্ষিকা রনজিলা পারভীন নিহতের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তে চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) বিভাগের অতিরিক্ত কমিশনার মোড় শফিকুল ইসলাম জানান, এই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে এর আগে র্যাবের গ্রেপ্তার করা তিন ব্যক্তির কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। গত ৩০ আগস্ট র্যাব-২ সন্দেহভাজন হিসেবে তিনজনকে গ্রেপ্তার করে একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করেছিল। তবে ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সিসিটিভি ক্যামেরায় দৃশ্যমান মোটরসাইকেলের রঙের সঙ্গে র্যাবের উদ্ধারকৃত মোটরসাইকেলের রঙের মিল নেই। এছাড়া র্যাবের হাতে আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং তাদের দেওয়া তথ্যের সত্যতা যাচাই করে ডিবির অনুসন্ধানে প্রমাণিত হয় যে তারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নন। এই প্রেক্ষাপটে গোয়েন্দা পুলিশ দ্বিতীয় পর্যায়ের নিবিড় তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ শুরু করে এবং প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করতে সক্ষম হয়। ফলশ্রুতিতে নতুন করে মো. খোকন ও রাজীব মাতুব্বর নামের দুই ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়, যারা প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে সরাসরি এই ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন। সংঘটিত এই অপরাধের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটনে ডিবির এই পদক্ষেপে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্ত প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও পেশাদারিত্বের বিষয়টি আবারও সামনে চলে এসেছে। তদন্তের প্রথম ধাপে কিছু বিভ্রান্তি তৈরি হলেও শেষ পর্যন্ত আধুনিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে অপরাধীদের চিহ্নিত করার এই প্রক্রিয়া নগরবাসীর মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরিয়ে এনেছে।
এই লোমহর্ষক ঘটনার পর থেকেই ভুক্তভোগী পরিবার এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে গভীর নিরাপত্তাহীনতা ও ক্ষোভ বিরাজ করছিল। গত ২৯ আগস্ট রাতে রিকশায় করে যাওয়ার সময় জাতীয় সংসদ ভবনের ১২ নম্বর গেটের পর খেজুরবাগানের মুখে ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন রনজিলা পারভীন। অপরাধীরা তার ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে হ্যাঁচকা টান দিলে তিনি রিকশা থেকে সড়কে ছিটকে পড়ে মারাত্মকভাবে আহত হন এবং পরবর্তীতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এই ঘটনায় নিহতের স্বামী মোহাম্মদ আবদুল মতিন শেরেবাংলা নগর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন। অথচ ঘটনার পরপরই র্যাব তিনজনকে গ্রেপ্তার করে তাদের দাবি অনুযায়ী মূল অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করায় বিচার প্রক্রিয়ায় এক ধরনের জটিলতা ও ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছিল। এমনকি র্যাবের হাতে আটক ব্যক্তিদের একজন দাবি করা হলেও নিহতের স্বামী ঘটনার দিন অত্যন্ত সাহসিকতার সঙ্গে ছিনতাইকারীদের একজন খোকনকে চিনতে পেরেছিলেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে ছিনতাইয়ের সময় ব্যাগ ধরে টান দেওয়ার মুহূর্তে অপরাধী তাদের দিকে মাথা ঘুরিয়েছিল এবং তিনি তাকে ও পেছনে থাকা অপর সহযোগীকে এক নজরে দেখেছেন। পরবর্তীতে ডিবির জিজ্ঞাসাবাদে খোকন ও রাজীবের স্বীকারোক্তিতেও এই ঘটনার নিখুঁত মিল পাওয়া যায়। ডিবি জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের মধ্যে খোকন ঘটনার সময় মোটরসাইকেলের পেছনে বসে ভুক্তভোগীর ব্যাগটি ছিনিয়ে নিয়েছিল এবং তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই মিরপুরের বড়বাগ এলাকা থেকে নিহতের ব্যাগ, ব্যবহৃত পোশাক, চশমার খাপ ও ওষুধপত্র উদ্ধার করা হয়। পাশাপাশি অপর আসামি রাজীব মাতুব্বর ঘটনার সময় মোটরসাইকেল চালক হিসেবে যুক্ত ছিলেন এবং তার দেওয়া তথ্যের মাধ্যমেই দিয়াবাড়ি এলাকা থেকে মূল অপরাধে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। অপরাধীদের বিরুদ্ধে পূর্বেও একাধিক মামলা থাকার বিষয়টি তাদের দীর্ঘমেয়াদী অপরাধ চক্রের সঙ্গে সম্পৃক্ততার প্রমাণ বহন করে, যা ভুক্তভোগী পরিবারের দীর্ঘদিনের কষ্ট ও আইনি লড়াইয়ের বিষয়টিকে আরও বেশি সংবেদনশীল করে তুলেছে।
তদন্ত প্রক্রিয়ায় দুই ভিন্ন সংস্থার ভিন্ন অবস্থানের বিষয়টি নিয়ে জনমনে নানামুখী প্রশ্নের উদ্রেক হলেও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এটিকে স্বাভাবিক তদন্তের একটি গতিপ্রকৃতি হিসেবে ব্যাখ্যা করেছে। বিলুপ্ত র্যাব-২ এর তৎকালীন অধিনায়ক নয়মুল হাসান এ বিষয়ে স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে তারা শুরু থেকেই গ্রেপ্তারকৃতদের সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করেছিলেন এবং তদন্ত সাপেক্ষে তাদের সংশ্লিষ্টতা যাচাইয়ের কথা বলেছিলেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে র্যাবের হাতে আটক পনির সঙ্গে নতুন গ্রেপ্তারকৃত একজনের চেহারার মিল থাকায় তাদের দল সঠিক পথেই এগোচ্ছিল এবং এই প্রাথমিক আটকের বিষয়টি পরবর্তীতে নতুন ও আসল অপরাধীদের খুঁজে বের করতে ডিবির জন্য সহায়ক ভূমিকা পালন করেছে। এদিকে ডিবির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, র্যাবের হাতে যারা আটক হয়েছিলেন তাদের যদি এই হত্যাকাণ্ডে কোনো সংশ্লিষ্টতা না থাকে, তবে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাদেরকে এই নির্দিষ্ট হত্যা মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হবে। তবে তাদের বিরুদ্ধে যদি অন্য কোনো পুরনো বা অন্য থানায় মামলা চলমান থাকে, তবে তারা সেগুলোর আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হবেন। পুলিশ ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর এই পারস্পরিক সমন্বয়হীনতা ও ভুল ধারণার অবসান ঘটিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে আসল অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচন করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। নতুন গ্রেপ্তারকৃত রাজীবের কাছ থেকে ইয়াবাসহ অস্ত্র, দস্যুতা, চুরি এবং দ্রুত বিচার আইনের মোট আটটি মামলা এবং খোকনের বিরুদ্ধে মাদকের তিনটি মামলা থাকার তথ্য প্রমাণ করে যে তারা রাজধানীর বুকে সক্রিয় একটি দুর্ধর্ষ অপরাধ চক্রের অংশ। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর এই তৎপরতা শুধুমাত্র একটি মামলার রহস্য উদ্ঘাটনই করেনি, বরং রাজধানীতে সক্রিয় ছিনতাই ও রাহাজানি চক্রের অন্যান্য সদস্যদের কাছেও একটি শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।
রাজধানীর অতি সংবেদনশীল এলাকা হিসেবে পরিচিত সংসদ ভবন ও এর আশেপাশের জোনগুলোতে এ ধরনের নৃশংস ছিনতাই ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতির চিত্র ফুটিয়ে তোলে। রনজিলা পারভীনের মতো একজন শিক্ষিকার এভাবে প্রাণ হারানোর ঘটনা আমাদের সমাজের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ভঙ্গুর দশা এবং সড়কে চলাচলের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের চরম অসহায়ত্বকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আন্তরিক প্রচেষ্টায় শেষ পর্যন্ত প্রকৃত অপরাধীরা জালে বন্দি হলেও, এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কেবল অপরাধী গ্রেপ্তারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা যথেষ্ট নয়। বরং রাজধানীর প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়, সড়ক ও উপ-সড়কে পুলিশি টহল জোরদার করার পাশাপাশি সিসিটিভি নেটওয়ার্কের কার্যকারিতা আরও বাড়িয়ে তুলতে হবে যাতে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তা শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এছাড়া ছিনতাই চক্রের মূল হোতা এবং তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের সমূলে উৎপাটন না করলে নাগরিকদের সাধারণ যাতায়াত প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়তেই থাকবে। এই ঘটনার পর বিচার প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রিতা পরিহার করে দ্রুত আসামিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের ধৃষ্টতা দেখাতে কেউ সাহস না পায়। একটি জনবহুল মেগাসিটিতে সাধারণ মানুষের মৌলিক নিরাপত্তা এবং চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুরোপুরি রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর বর্তায়, এবং এই হত্যাকাণ্ডের সুনির্দিষ্ট বিচারই সেই আস্থার জায়গাটি পুনর্গঠন করতে পারে।