আফগানিস্তানে একক ভ্রমণের খেসারত: তালেবান হেফাজতে আটক ভারতীয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের মুক্তি ও উদ্ভূত নিরাপত্তা সংকট.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আফগানিস্তানে একক ভ্রমণের খেসারত: তালেবান হেফাজতে আটক ভারতীয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের মুক্তি ও উদ্ভূত নিরাপত্তা সংকট..

Roman Rahman avatar   
Roman Rahman
আফগানিস্তানে একক ভ্রমণের খেসারত: তালেবান হেফাজতে আটক ভারতীয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের মুক্তি ও উদ্ভূত নিরাপত্তা সংকট..
আফগানিস্তানে একক ভ্রমণের খেসারত: তালেবান হেফাজতে আটক ভারতীয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটরের মুক্তি ও উদ্ভূত নিরাপত্তা সংকট..
ছবি: সংগৃহীত
আফগানিস্তানে নারী হয়ে একা ভ্রমণের দায়ে আটক ভারতীয় কন্টেন্ট ক্রিয়েটর অরুণিমা আইপিকে কয়েক ঘণ্টা পর ছেড়ে দিয়েছে তালেবান। যুদ্ধবিধ্বস্ত এই রাষ্ট্রে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও কঠোর বিধিনিষেধ উপেক্ষা করে ভ্রমণ করায় ..

আফগানিস্তানে কট্টরপন্থী তালেবান প্রশাসনের কঠোর বিধিনিষেধ ও ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার কড়াকড়ির মুখে পড়ে চরম অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগের জন্ম দিয়েছেন এক ভারতীয় নারী কন্টেন্ট ক্রিয়েটর। কেরালার পালাক্কাদের বাসিন্দা এবং জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার অরুণিমা আইপি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে এককভাবে ভ্রমণে গিয়ে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে আটক হওয়ার পর সোমবার বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছেন। ইনস্টাগ্রামে ১২ লাখের বেশি এবং ইউটিউবে ৭ লাখের অধিক ফলোয়ার সমৃদ্ধ এই তরুণী গত দুই সপ্তাহ ধরে আফগানিস্তানের বিভিন্ন বাজার, প্রত্যন্ত গ্রাম এবং সংঘাতপূর্ণ জনপদ ঘুরে ভিডিও তৈরি করছিলেন। কিন্তু সোমবার হঠাৎ করেই তার পাঠানো একটি জরুরি বার্তা বা এসওএস এবং পরবর্তীতে ২৪ ঘণ্টার যোগাযোগের বিচ্ছিন্নতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে গভীর উৎকণ্ঠার সৃষ্টি করে। মঙ্গলবার সকালে তিনি নিরাপদে থাকার কথা জানিয়ে ইনস্টাগ্রামে আপডেট দিলেও, তার এই আকস্মিক আটক হওয়া এবং তালেবানের চেকপয়েন্টে দীর্ঘ জেরার মুখে পড়ার ঘটনাটি যুদ্ধবিধ্বস্ত অঞ্চলে একক ভ্রমণের নিরাপত্তা ও এর পেছনের বাস্তবতাকে আবারও কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। তালেবানি শাসনে নারীদের চলাচলের ওপর যে নজিরবিহীন নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তা জেনেও শুধুমাত্র কন্টেন্ট তৈরির উদ্দেশ্যে এমন বিপজ্জনক ভূখণ্ডে প্রবেশ করা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা এই ঘটনার মধ্য দিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত ভিডিও এবং তার পরবর্তী বিবরণে উঠে এসেছে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ আইন এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের নির্মম বাস্তবতার এক ভয়াবহ চিত্র। অরুণিমা জানিয়েছেন, তালেবান শাসিত ওই অঞ্চলে একা নারী ভ্রমণ করায় তাকে প্রতিনিয়ত রাইফেলধারী সশস্ত্র ব্যক্তিদের জেরার মুখে পড়তে হয়েছে, যা তার ভাষায় ছিল মৃত্যুকূপের মতো ভয়ংকর অভিজ্ঞতা। সোমবার তাকে যখন আটক করা হয়, তখন দায়িত্বরত তালেবান সদস্যরা তার ভ্রমণের নথিপত্র পড়তে ব্যর্থ হয় এবং তাকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে আফগানিস্তানে নারীদের একা চলাচলের কোনো আইনি বৈধতা নেই। এমনকি তাকে গ্রেপ্তার করার হুমকি দেওয়া হয় এবং দেশ থেকে ডিপোর্ট করার অনুরোধ জানানোর পরও তাকে দীর্ঘক্ষণ চরম মানসিক চাপের মধ্যে রাখা হয়। বামিয়ানে পৌঁছানোর পর স্থানীয় সাধারণ মানুষের কৌতূহলী দৃষ্টি এবং সশস্ত্র ব্যক্তিদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদ তাকে বুঝিয়ে দেয় যে, এই সমাজ কতটা সংকুচিত এবং সেখানে একজন বিদেশি নারীর স্বাধীনভাবে চলাচল কতটা অসম্ভব। তিনি নিজে প্রশ্ন তুলেছেন যে, তার মতো একজন একা নারীকে যদি ভিসা দেওয়া হয়েই থাকে, তবে প্রবেশের পর কেন তাকে বারবার এমন অবর্ণনীয় হয়রানি ও গ্রেপ্তারের হুমকির মুখে পড়তে হলো? মূলত, নথিপত্রের জটিলতা এবং তালেবান প্রশাসনের খামখেয়ালি আচরণের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা যে কতটা পরাধীন ও শঙ্কাযুক্ত, তা এই ভুক্তভোগী ক্রিয়েটরের অভিজ্ঞতায় পরিষ্কার ফুটে উঠেছে।

এই আকস্মিক ঘটনার পর এখনো পর্যন্ত তালেবান প্রশাসন কিংবা ভারতীয় দূতাবাসের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া বা বক্তব্য পাওয়া যায়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি রহস্যজনক ও উদ্বেগজনক করে তুলেছে। বিশ্বজুড়ে অধিকাংশ রাষ্ট্রই যখন আফগানিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মানবাধিকারের চরম অবনতির কারণে নিজ নাগরিকদের সেখানে ভ্রমণ না করার কড়া সতর্কতা জারি করে রেখেছে, তখন এই ধরনের নির্দেশনাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ভ্রমণ চালিয়ে যাওয়া দায়িত্বহীনতার পরিচায়ক কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের গ্ল্যামারাস ভিডিও তৈরির মানসিকতা অনেক সময়ই স্থানীয় জনগণের ওপর চলা কাঠামোগত নিপীড়ন ও বৈষম্যকে লঘু করে দেখায় বলে মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘকাল ধরে সমালোচনা করে আসছেন। আফগান নারীদের যেখানে ঘরবন্দী জীবন কাটাতে হয় এবং বোরকার আড়ালে মুখ ঢেকে রাখতে হয়, সেখানে বিদেশি পর্যটকদের আংশিক ছাড় পাওয়ার বিষয়টি এক ধরনের সুবিধাবাদী পর্যটন সংস্কৃতিকে উসকে দিচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে ভ্রমণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলের আরও কড়া নজরদারি এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের নিজস্ব নিরাপত্তার প্রতি দায়িত্বশীল হওয়া অত্যন্ত জরুরি, অন্যথায় যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের প্রাণঘাতী বা আন্তর্জাতিক সংকটের সৃষ্টি হতে পারে।

অরুণিমার এই মুক্তি পাওয়ার ঘটনা সাময়িকভাবে স্বস্তি আনলেও, এটি আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, নারী অধিকার এবং বিদেশিদের নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী কিছু গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। উজবেকিস্তানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার প্রাক্কালে তার মনে যে ভীতিকর সংশয় কাজ করছে, তা প্রমাণ করে যে তালেবান নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে প্রতি মুহূর্তে অনিরাপত্তা মানুষের নিত্যসঙ্গী। বিনোদন বা জনপ্রিয়তার মোহে বিশ্বজুড়ে ভ্রমণপিপাসুদের এই ধরনের আত্মঘাতী প্রবণতা কেবল তাদের নিজেদের জীবনকেই বিপন্ন করে না, বরং আঞ্চলিক কূটনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনার সৃষ্টি করে। আফগানিস্তানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার নির্মম বাস্তবতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের কদর্য রূপকে কেবল ভিউ বা সাবস্ক্রাইবার বাড়ানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার নৈতিকতা নিয়ে বিশ্বজুড়ে যে সমালোচনার ঝড় উঠেছে, এই ঘটনা তা আরও জোরালো করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে এবং কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের অন্ধ জনপ্রিয়তার দৌড় থামাতে আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নীতিমালায় আরও কঠোর সতর্কতা ও নজরদারি আরোপ করা এখন সময়ের দাবি।

No comments found


News Card Generator