সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO)-এর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশের কর্মজীবীদের প্রায় ৪০ শতাংশ কোনো না কোনো মাত্রার মানসিক চাপে ভুগছেন, যার মধ্যে ১৫ শতাংশের বেশি বার্নআউটের সুস্পষ্ট লক্ষণ দেখাচ্ছেন। এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান কেবল কর্মজীবীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যঝুঁকিই নয়, দেশের সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপরও সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। কর্মক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত চাপ, কাজের অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, এবং কর্ম-জীবনের ভারসাম্যহীনতা—এগুলোই মূলত এই বার্নআউটের মূল কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশের শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) মূলত শারীরিক শ্রমের শর্তাবলী, মজুরি, কর্মঘণ্টা ও কর্মপরিবেশের শারীরিক সুরক্ষায় বিস্তারিত আলোচনা করলেও, মানসিক স্বাস্থ্যের সুনির্দিষ্ট সুরক্ষায় এর বিধানাবলী এখনো অসম্পূর্ণ ও ক্ষেত্রবিশেষে নীরব।
বাংলাদেশের কর্মপরিবেশে মানসিক চাপ ও বার্নআউটের মূল কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে শ্রম আইনের সীমাবদ্ধতা এবং এর প্রয়োগের দুর্বলতা। যদিও শ্রম আইন, ২০০৬-এর ধারা ৪৬ (ক) এবং ৪৭ (ক) কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথা বলে, তবে এর ব্যাখ্যায় মানসিক স্বাস্থ্যকে সুনির্দিষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে নিয়োগকর্তারা কর্মীদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধতা অনুভব করেন না। MOHFW (স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়) এবং DGHS (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর) জনস্বাস্থ্যের বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করলেও, কর্মক্ষেত্রের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে তাদের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা বা নির্দেশিকা এখনো অপ্রতুল। অনেক প্রতিষ্ঠানেই কর্মীর মানসিক স্বাস্থ্যকে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে দেখা হয়, যার ফলে তারা প্রয়োজনীয় সহায়তা থেকে বঞ্চিত হন। কাজের ধরন, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তন, এবং কর্মীদের উপর ক্রমবর্ধমান পারফরম্যান্সের চাপ এই সমস্যাকে আরও প্রকট করে তুলেছে। উদাহরণস্বরূপ, আইটি খাত, ব্যাংকিং, এবং পোশাক শিল্পের মতো উচ্চ-চাপের শিল্পগুলোতে কর্মীরা প্রতিনিয়ত সময়সীমা পূরণের জন্য মানসিক ধকলের শিকার হচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে তাদের কর্মক্ষমতা এবং সুস্থ জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে।
এই মানসিক চাপ ও বার্নআউটের প্রভাব সুদূরপ্রসারী, যা কেবল ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। IEDCR (রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট)-এর সাম্প্রতিক একটি গবেষণা ইঙ্গিত দেয় যে, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে কর্মীদের অনুপস্থিতি, উৎপাদনশীলতা হ্রাস এবং উচ্চ হারে কর্মী ছাঁটাইয়ের ঘটনা বাড়ছে। এতে কেবল প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ক্ষতিই হচ্ছে না, জাতীয় অর্থনীতিও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মানসিক চাপ দীর্ঘস্থায়ী হলে তা উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, ডায়াবেটিস এবং প্রতিরোধ ব্যবস্থার দুর্বলতার মতো শারীরিক অসুস্থতার কারণ হতে পারে। উপরন্তু, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা নিয়ে খোলামেলা আলোচনা না হওয়ায়, অনেক কর্মীই স্টিগমার ভয়ে চিকিৎসা বা সহায়তা নিতে দ্বিধা করেন। NIMH-এর তথ্য অনুযায়ী, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন এমন ব্যক্তিদের মধ্যে মাত্র ১০-১৫ শতাংশ পেশাদার সহায়তা গ্রহণ করেন। DGDA (ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর) মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত ঔষধের অনুমোদন ও বিতরণে ভূমিকা রাখলেও, এটি মূলত রোগের প্রতিকারমূলক দিকের সাথে সম্পর্কিত, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার সাথে নয়। অর্থাৎ, শ্রম আইন বা প্রাতিষ্ঠানিক নীতিমালার অভাব কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার একটি সামগ্রিক প্রতিরোধমূলক কাঠামো তৈরি করতে ব্যর্থ হচ্ছে, যা কেবল সমস্যা তৈরি হওয়ার পর ঔষধের উপর নির্ভরশীলতা বাড়াচ্ছে।
| সূচক | ২০২৩ সালের তথ্য (%) | ২০২২ সালের তথ্য (%) | মন্তব্য |
|---|---|---|---|
| কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপে ভোগা কর্মী | ৪০% | ৩৫% | NIMH সমীক্ষা অনুযায়ী, ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা |
| বার্নআউটের লক্ষণ থাকা কর্মী | ১৫% | ১২% | কর্মঘণ্টা বৃদ্ধি ও কাজের চাপ বৃদ্ধির ফল |
| মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা গ্রহণের হার | ৫% | ৩% | MOHFW ডেটা অনুযায়ী, প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল |
| মানসিক স্বাস্থ্য জনিত ছুটি গ্রহণ | ০.৮% | ০.৬% | DGHS রিপোর্ট, স্টিগমা ও সচেতনতার অভাবে কম |
উৎস: জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর যৌথ সমীক্ষা, ২০২৩
সুপারিশ
- বাংলাদেশের শ্রম আইন, ২০০৬-এর সুনির্দিষ্ট সংশোধনী আনা প্রয়োজন যাতে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যকে সুস্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয় এবং নিয়োগকর্তাদের জন্য মনোসামাজিক ঝুঁকি মূল্যায়ন (Psychosocial Risk Assessment) বাধ্যতামূলক করা হয়। এই সংশোধনীতে MOHFW এবং শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে 'মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা কমিটি' গঠনের বিধান অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, যা কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ করবে।
- DGHS (স্বাস্থ্য অধিদপ্তর) কর্তৃক একটি বিস্তারিত জাতীয় কর্মক্ষেত্র মানসিক স্বাস্থ্য নির্দেশিকা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা উচিত, যেখানে সকল নিয়োগকর্তার জন্য কর্মীদের জন্য গোপনীয় মানসিক স্বাস্থ্য কাউন্সেলিং পরিষেবা (Employee Assistance Programs - EAPs) এবং মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতা প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা হবে। NIMH (জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট) এই নির্দেশিকা প্রণয়নে প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করতে পারে এবং কর্মীদের জন্য বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে কাউন্সেলিং সেবার একটি জাতীয় রেফারেল সিস্টেম প্রতিষ্ঠা করতে পারে।
- DGDA (ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর)-কে IEDCR (রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট) এবং NIMH-এর সাথে যৌথভাবে কাজ করে কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ মোকাবেলায় ঔষধনির্ভরতা কমানোর জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার প্রচারে ভূমিকা রাখতে হবে। এর পাশাপাশি, DGDA মানসিক স্বাস্থ্যের ঔষধের যৌক্তিক ব্যবহার এবং সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য প্রচারাভিযানে অংশ নিতে পারে যা মানসিক স্বাস্থ্যকে ঘিরে থাকা সামাজিক কলঙ্ক দূর করতে সাহায্য করবে এবং কর্মীদের সময়মতো পেশাদার সহায়তা গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করবে।