সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রাথমিক শিক্ষাস্তরের 'শিক্ষাক্রম বিতরণ ও বাস্তবায়ন' সংক্রান্ত ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) এর সর্বশেষ বার্ষিক সমীক্ষায় যে চিত্র উঠে এসেছে, তা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষাজীবন এবং সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০২৩-এর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে প্রয়োগের ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের চ্যালেঞ্জ, শিক্ষকদের অপ্রতুল প্রশিক্ষণ এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতাগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, শুধু একটি নতুন কাঠামো প্রণয়ন করলেই শিক্ষার মানোন্নয়ন সম্ভব নয়। এই প্রতিবেদনগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, আমরা কি নীতি প্রণেতাদের দূরদৃষ্টির অভাব অথবা তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতার সম্মুখীন হচ্ছি, নাকি দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত সিস্টেমের দুর্বলতাগুলোই আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অগ্রগতিতে প্রধান অন্তরায়?
নতুন শিক্ষাক্রমের মূল লক্ষ্য ছিল মুখস্থনির্ভরতা কমিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে যোগ্যতাভিত্তিক জ্ঞান ও দক্ষতা বৃদ্ধি করা, যা তাদের বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য করে তুলবে। কিন্তু শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন শিক্ষাবিদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এই মহৎ উদ্দেশ্য পূরণে নীতিগত পর্যায়ে বেশ কিছু ফাঁক রয়ে গেছে। উদাহরণস্বরূপ, নতুন কারিকুলামে 'শিক্ষার্থী মূল্যায়ন পদ্ধতি'তে ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে, যেখানে প্রথাগত পরীক্ষার পরিবর্তে ধারাবাহিক মূল্যায়নের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই ধারাবাহিক মূল্যায়ন পদ্ধতির জন্য শিক্ষকদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং শ্রেণিকক্ষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর যে অনুপাত প্রয়োজন, তা অধিকাংশ প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়েই অনুপস্থিত। এমনকি জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) কর্তৃক প্রণীত নতুন পাঠ্যপুস্তকগুলো শিক্ষকদের কাছে সঠিকভাবে পৌঁছানো এবং সেগুলোর ব্যবহারবিধি নিয়ে পর্যাপ্ত কর্মশালা আয়োজনেও সমন্বয়হীনতা দেখা গেছে। ফলস্বরূপ, শিক্ষকদের একটি বড় অংশই নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাননি, যা শ্রেণিকক্ষে এর সঠিক প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করছে। এটি শুধু শিক্ষকদের পেশাগত অসন্তোষই বাড়াচ্ছে না, বরং শিক্ষার্থীদের শিখনফলকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে, যা নীতি প্রণয়নের সময়কার দূরদৃষ্টির অভাবকেই নির্দেশ করে।
অন্যদিকে, শিক্ষাব্যবস্থার গভীরে প্রোথিত দুর্বলতাগুলোও এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) এর সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করা শিক্ষার্থীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের মধ্যে মৌলিক জ্ঞান ও সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনার অভাব রয়েছে, যা সরাসরি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের দুর্বল ভিত্তি নির্দেশ করে। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর তাদের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে প্রায়শই এমন শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি হয় যাদের সাধারণ শিক্ষায় ন্যূনতম দক্ষতা নেই, ফলে তাদের জন্য কারিগরি দক্ষতা আয়ত্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। যদিও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে, প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যদি মৌলিক দক্ষতা নিয়ে শিক্ষার্থীরা বের না হয়, তবে NSDA-এর পক্ষে তাদের উচ্চতর দক্ষতা প্রশিক্ষণ দেওয়া অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়ায়। এটি স্পষ্ট করে যে, নীতিগতভাবে দক্ষতা উন্নয়নের কথা বলা হলেও, তৃণমূল পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন স্তরের শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাব একটি সিস্টেমিক দুর্বলতা হিসেবে কাজ করছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে পর্যাপ্ত ডিজিটাল অবকাঠামো এবং আধুনিক শিক্ষণ উপকরণের অভাবও নতুন কারিকুলামের ডিজিটাল দক্ষতা অর্জনের লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করছে, যা দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগ ও পরিকল্পনার অভাবকেই তুলে ধরে।
শিক্ষাব্যবস্থার এই সামগ্রিক চিত্র শুধুমাত্র শিক্ষাগত সাফল্যের হার দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। BANBEIS এর তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার এখনও উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে, যদিও বিগত কয়েক বছরে তা কিছুটা কমেছে। এটি একদিকে যেমন আর্থ-সামাজিক কারণগুলোর প্রভাব নির্দেশ করে, তেমনি অপর্যাপ্ত শিক্ষণ পদ্ধতি এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে বলেও মনে করা হয়। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, পদোন্নতি এবং পেশাগত উন্নয়নের সুযোগের অভাবও তাদের মানসম্মত শিক্ষাদানে নিরুৎসাহিত করছে। নতুন শিক্ষাক্রমের সফল বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষকদের মানসিক প্রস্তুতি এবং তাদের মধ্যে মালিকানাবোধ তৈরি করা অপরিহার্য। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, নীতি প্রণয়ন এবং বাস্তবায়নের মধ্যে একটি বিশাল ফারাক রয়ে যায়, যেখানে শিক্ষকদের মতামত বা মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা খুব কমই বিবেচিত হয়। এটি একটি বড় ধরনের সিস্টেমিক ত্রুটি, যা কেবলমাত্র নতুন শিক্ষাক্রম প্রবর্তনের মাধ্যমেই সমাধান করা সম্ভব নয়, বরং এর জন্য প্রয়োজন শিক্ষা মন্ত্রণালয়, NCTB, BANBEIS, UGC, NSDA এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টা।
| সূচক | ২০২০ | ২০২১ | ২০২২ | ২০২৩ (প্রাথমিক উপাত্ত) |
|---|---|---|---|---|
| প্রাথমিক শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী (মিলিয়ন) | ১৮.৩ | ১৮.২ | ১৮.১ | ১৭.৯ |
| মাধ্যমিক শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী (মিলিয়ন) | ১০.৫ | ১০.৮ | ১১.১ | ১১.৪ |
| প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর হার (%) | ৯৮.৫ | ৯৭.৯ | ৯৭.২ | ৯৬.৫ |
| মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার (%) | ৩৩.৫ | ৩১.২ | ২৮.৭ | ২৭.১ |
| প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হার (প্রাথমিক) (%) | ৯৩.৮ | ৯৪.১ | ৯৫.০ | ৯৫.২ |
| প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হার (মাধ্যমিক) (%) | ৮০.৫ | ৮২.৩ | ৮৪.০ | ৮৫.৫ |
| কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থী (লক্ষ) | ১৩.২ | ১৪.৫ | ১৫.৮ | ১৭.১ |
উৎস: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, BANBEIS এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিবেদন
সুপারিশ
- শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (NCTB) কর্তৃক প্রণীত নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে শিক্ষকদের জন্য বাধ্যতামূলক, ধারাবাহিক ও প্রযুক্তি-সমন্বিত পেশাগত উন্নয়ন কর্মসূচি (CPD) প্রবর্তন করা, যা প্রতি শিক্ষাবর্ষে কমপক্ষে দুটি ধাপে সকল শিক্ষককে অন্তর্ভুক্ত করবে এবং এর কার্যকারিতা BANBEIS কর্তৃক নিয়মিত মূল্যায়ন করা হবে।
- জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে সম্পৃক্ত করে মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমের নিয়মিত পর্যালোচনার মাধ্যমে শিল্প ও শ্রমবাজারের চাহিদাভিত্তিক দক্ষতা সংযুক্তি নিশ্চিত করা, বিশেষ করে নবম ও দশম শ্রেণিতে প্রায়োগিক ও বৃত্তিমূলক বিষয়বস্তুর সংখ্যা বৃদ্ধি করে শিক্ষার্থীদের মধ্যে প্রাথমিক স্তরের কারিগরি জ্ঞান ও আগ্রহ তৈরি করা।
- বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করে শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন এবং শিক্ষার্থীদের শিখনফল মূল্যায়নে নিয়মিত, স্বাধীন ও ত্রৈমাসিক নিরীক্ষা পদ্ধতি প্রবর্তন করা, এবং এই নিরীক্ষা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে দ্রুত নীতিগত সংশোধন ও বাস্তবায়ন কৌশল পুনর্গঠনের জন্য বাধ্যতামূলক একটি আইনি কাঠামো প্রণয়ন করা।