আফগানিস্তানে তালেবানের কঠোর দমনপীড়ন: রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ২০ নারী ও কিশোরীকে মারধর.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আফগানিস্তানে তালেবানের কঠোর দমনপীড়ন: রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ২০ নারী ও কিশোরীকে মারধর..

Roman Rahman avatar   
Roman Rahman
আফগানিস্তানে তালেবানের কঠোর দমনপীড়ন: রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ২০ নারী ও কিশোরীকে মারধর..
আফগানিস্তানে তালেবানের কঠোর দমনপীড়ন: রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে ২০ নারী ও কিশোরীকে মারধর..
ছবি: সংগৃহীত
আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে তালেবানের ‘নৈতিকতা পুলিশ’-এর সাম্প্রতিক অভিযানে অন্তত ২০ জন নারী ও কিশোরীকে রাস্তা থেকে জোরপূর্বক আটক করে কারাগারে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়েছে।..

আফগানিস্তানে তালেবানের কঠোর ও দমনমূলক শাসনব্যবস্থার অংশ হিসেবে রাজধানী কাবুলে নতুন করে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার কাবুলের বিভিন্ন সড়কে তালেবানের ‘নৈতিকতা পুলিশ’ ও সশস্ত্র রক্ষীরা নারী সদস্যদের উপস্থিতিতে আকস্মিক অভিযান চালিয়ে অন্তত ২০ জন নারী ও কিশোরীকে জোরপূর্বক গাড়িতে তুলে নিয়ে যায় এবং পরবর্তীতে কারাগারে নিয়ে তাদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালায়। মূলত ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা দখলের পর থেকে আফগান নারীদের মৌলিক স্বাধীনতা, চলাফেরা এবং পোশাক-পরিচ্ছদের ওপর যে ধারাবাহিক ও কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে আসছে, এই সাম্প্রতিক অভিযান সেই দমনপীড়ন নীতিরই একটি ভয়ংকর ও বর্বরোচিত বিস্তার। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সূত্রে জানা গেছে, হিজাব পরিহিত থাকা সত্ত্বেও কেবল তালেবানের মনগড়া পোশাকবিধি ও কঠোর শরিয়া আইনের অজুহাতে প্রকাশ্য রাজপথ থেকে এই নারীদের বলপূর্বক তুলে নেওয়া হয়, যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড এবং নাগরিক স্বাধীনতার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। ঘটনাস্থলে উপস্থিত সাধারণ মানুষের বাধা ও আকুতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সশস্ত্র তালেবান সদস্যরা এই তাণ্ডব চালায়, যা যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে আইনের শাসন ও ন্যূনতম মানবিক মর্যাদার অনুপস্থিতি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে।

এই বর্বর অভিযানের সময় ভুক্তভোগী নারী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ানে উঠে এসেছে এক লোমহর্ষক ও মর্মান্তিক চিত্র। আটককৃতদের মধ্যে দুই বা তিন মাসের একজন অন্তঃসত্ত্বা নারীও ছিলেন, যাকে তালেবান রক্ষীরা নির্মমভাবে আঘাত করে ও টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যায়। ওই নারীর স্বামী তার অসুস্থতার কথা বলে ও কান্নাকাটি করে ছাড়ানোর আকুতি জানালেও তালেবান সদস্যরা তাতে কর্ণপাত করেনি। এছাড়া অপর এক ভুক্তভোগী নারী জানান, কর্মকর্তারা তার জামার কলার ধরে টানাটানি করেন এবং ধস্তাধস্তির একপর্যায়ে তার পোশাক ছিঁড়ে ফেলেন। মাস্ক পরতে বাধ্য করার সময় ওই নারী তার ওপর হওয়া অন্যায়ের তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং সাহসিকতার সঙ্গে পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। দীর্ঘ সময় ধরে চলা এই শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনে শুধু ওই নারীরাই নয়, বরং সমগ্র আফগান সমাজে এক গভীর আতঙ্ক ও হাতাশার সৃষ্টি হয়েছে। হিরাত ও কাবুলের সাধারণ বাসিন্দারা জানিয়েছেন, তালেবানের সদাচার প্রচার ও অসদাচার প্রতিরোধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এই ধরনের হিংসাত্মক পদক্ষেপে নারীরা এখন ঘর থেকে বের হতেও চরমভাবে ভয় পাচ্ছেন। এমনকি পাঞ্জশির প্রদেশে নারী চিকিৎসকদের বোরকা পরার জন্য আল্টিমেটাম দেওয়া এবং হিরাতে পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অজুহাতে নির্বিচারে আটকের ঘটনা প্রমাণ করে যে, সাধারণ নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনে রাষ্ট্রের এই অযাচিত ও নিপীড়নমূলক হস্তক্ষেপ এখন চরম রূপ ধারণ করেছে।

এদিকে নারীদের ওপর এই অব্যাহত দমন-পীড়নের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভে ফেটে পড়লেও তালেবান প্রশাসন বলপ্রয়োগ করে তা নির্মমভাবে দমন করেছে। হিরাতে পোশাকবিধি লঙ্ঘনের দায়ে নারী আটকের প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নির্বিচারে গুলি চালায় এবং লাঠিচার্জ করে সাধারণ মানুষকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। হিরাত পুলিশের মুখপাত্র এই শান্তিপূর্ণ জমায়েতকে 'উত্তেজনা সৃষ্টিকারী' ও ইসলামি হিজাবের বিরোধিতা হিসেবে অভিহিত করে নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে উল্টো জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার অজুহাত দাঁড় করিয়েছে। পরিবারের জিম্মাদারিত্ব বা স্থানীয় সম্প্রদায়ের কড়া নিশ্চয়তার পর আটককৃত নারীদের ছেড়ে দেওয়া হলেও তাদের ওপর চালানো মানসিক ও শারীরিক ট্রমা সহজে মুছে যাওয়ার নয়। তালেবানের এই ধরনের উগ্র ও বৈষম্যমূলক নীতির কোনো আইনি বা নৈতিক ভিত্তি না থাকলেও প্রশাসন সম্পূর্ণ একরোখাভাবে তাদের এই দমনমূলক এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে চলেছে। মানবাধিকার সংগঠন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বারবার সতর্কতা সত্ত্বেও তালেবান সরকার তাদের নারী-বিরোধী অবস্থান থেকে বিন্দুমাত্র সরে আসেনি, যা আফগানিস্তানকে আজ মানবাধিকারের একটি প্রকৃত সমাধিক্ষেত্রে পরিণত করেছে।

আফগানিস্তানে তালেবানের এই কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক নারী নিপীড়ন কেবল ব্যক্তিগত অধিকার হরণেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি গোটা দেশের ভবিষ্যৎ ও সামাজিক নিরাপত্তাকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার প্রধান ভলকার তুর্কের ভাষ্য অনুযায়ী, বর্তমান কর্তৃপক্ষের জারি করা প্রতিটি আদেশ ও আইন জনজীবনে নারী ও মেয়েদের উপস্থিতিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করছে, যার ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ থেকে তারা সম্পূর্ণ বঞ্চিত হচ্ছে। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা ও মেডিকেল পেশায় নারীদের অংশগ্রহণের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং গণপরিবহন ও বাজার থেকে তাদের নামিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, আফগান সমাজ থেকে নারীদের অস্তিত্বকে সুপরিকল্পিতভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। আন্তর্জাতিক চাপের মুখেও তালেবান প্রশাসনের এই ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ চলতে থাকলে দেশটির অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাঠামো চিরতরে ভেঙে পড়ার উপক্রম হবে। সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা এবং নারী সমাজের ওপর চলা এই বর্বরোচিত নির্যাতন অবিলম্বে বন্ধ করতে বিশ্ব সম্প্রদায়কে কেবল নিন্দা জ্ঞাপনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে কার্যকর ও কঠোর কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে, অন্যথায় আফগানিস্তান দীর্ঘমেয়াদে এক অন্ধকার মানববিপর্যয়ের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে।

Комментариев нет


News Card Generator