নাগরিকদের আন্তর্জাতিক চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করল বেইজিং: নতুন ভ্রমণ নীতিতে বাড়ছে আইনি ও আদর্শিক শঙ্কা.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নাগরিকদের আন্তর্জাতিক চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করল বেইজিং: নতুন ভ্রমণ নীতিতে বাড়ছে আইনি ও আদর্শিক শঙ্কা..

Roman Rahman avatar   
Roman Rahman
নাগরিকদের আন্তর্জাতিক চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করল বেইজিং: নতুন ভ্রমণ নীতিতে বাড়ছে আইনি ও আদর্শিক শঙ্কা..
নাগরিকদের আন্তর্জাতিক চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ কঠোর করল বেইজিং: নতুন ভ্রমণ নীতিতে বাড়ছে আইনি ও আদর্শিক শঙ্কা..
ছবি: সংগৃহীত

চীন থেকে বা চীনে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নতুন কঠোর নিয়মকানুন কার্যকর হয়েছে, যার ফলে বিদেশে অবস্থানকালে সরকারের স্বার্থ বা নিরাপত্তার পরিপন্থী কাজের অভিযোগে নাগরিকদের দেশত্যাগে দীর্ঘমেয়াদি বাধা দেওয়া হতে পারে..

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নাগরিকদের চলাচলের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরও সুসংহত করার লক্ষ্যে চীন থেকে এবং চীনে ভ্রমণের ক্ষেত্রে নতুন ও কঠোর নিয়মকানুন কার্যকর করা হয়েছে। বেইজিংয়ের এই পদক্ষেপে বিশ্বজুড়ে পর্যবেক্ষক মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে, কারণ এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ওপর রাষ্ট্রীয় নজরদারি এবং আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ আরও একধাপ বাড়িয়ে দেওয়া হলো। নতুন এই বিধান অনুযায়ী, কোনো নাগরিক বিদেশে অবস্থানকালে যদি চীনের জাতীয় নিরাপত্তা বা স্বার্থের পরিপন্থী কোনো কার্যকলাপে যুক্ত থাকেন বলে বিবেচিত হন, তবে দেশে ফেরার পর তাকে দীর্ঘ তিন বছর পর্যন্ত দেশত্যাগে বাধা দেওয়া হতে পারে। একই সঙ্গে দেশটির বিজ্ঞানী এবং কারিগরি খাতের কর্মীদেরও এই কঠোর নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর আওতায় আনা হয়েছে, যা মূলত বৈশ্বিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এক ধরনের অদৃশ্য প্রাচীর নির্মাণের শামিল। চীনা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে যে জাতীয় সার্বভৌমত্ব এবং নিরাপত্তা সুরক্ষার অবশ্যকীয় অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে এবং সাধারণ নাগরিকদের স্বাভাবিক ভ্রমণে কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে না। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা এই দাবির সম্পূর্ণ উল্টো চিত্র দেখছেন এবং তাদের মতে, এই ধরনের অস্পষ্ট বিধান প্রবর্তনের মূল উদ্দেশ্য হলো বিদেশে অবস্থানরত চীনা নাগরিকদের রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও কর্মকাণ্ডের ওপর পরোক্ষ চাপ সৃষ্টি করা এবং যেকোনো ধরনের ভিন্নমত কঠোর হাতে দমন করা। জর্জেটাউন ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর এশিয়ান ল-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক টম কেলগ বিবিসি চাইনিজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, এটি বিদেশে অবস্থানরত চীনা নাগরিকদের বাক্স্বাধীনতা ও কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের একটি সুদূরপ্রসারী হাতিয়ার। তাঁর মতে, বিশেষ করে যারা বিদেশে অবস্থান করে চীনা সরকারের সমালোচনা করেন কিংবা মানবাধিকারের পক্ষে জোরালো অবস্থান নেন, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা হিসেবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ সরাসরি পাসপোর্ট ইস্যু করতে অস্বীকৃতি জানায়। এর আগে গত সপ্তাহে চীনের সরকারি গুজব-খণ্ডনকারী প্ল্যাটফর্ম পিয়াও থেকে প্রকাশিত বিবৃতিতে জানানো হয়েছিল যে, প্রতারণার ফাঁদে পড়ে দেশত্যাগ কিংবা বিদেশে অবৈধ জুয়া ও জালিয়াতির মতো ক্রমবর্ধমান অপরাধমূলক সমস্যাগুলো প্রতিরোধ করতেই এই বিশেষ নীতিমালা করা হয়েছে। বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয় যে এই নিয়মগুলো কেবল উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ গন্তব্য এবং অস্বাভাবিক ভ্রমণ-প্যাটার্ন রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেই কেবল একটি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে এবং সাধারণ নাগরিকদের স্বাভাবিক চলাচলে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। কিন্তু বাস্তবে এই আশ্বাসের উল্টো চিত্রই ফুটে উঠছে এবং বহু সাধারণ নাগরিক দীর্ঘদিন ধরে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়াই অস্পষ্ট ভ্রমণ-বিধিনিষেধের নির্মম শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী নাগরিক জানিয়েছেন যে তারা পাসপোর্ট নবায়ন বা নতুন আবেদনের ক্ষেত্রে রহস্যজনক বাধার মুখে পড়ছেন এবং কোনো ধরনের লিখিত ব্যাখ্যা ছাড়াই তাদের মৌলিক চলাচলের অধিকার কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। ছদ্মনামে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলা পিপি নামের এক তরুণ নাগরিক জানান যে ২০২৩ সালে তাঁর পাসপোর্টের আবেদন সম্পূর্ণ অন্যায্যভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে, কারণ ২০১৯ সালে হংকংয়ে সংঘটিত গণতন্ত্রপন্থী বিক্ষোভে তিনি অংশ নিয়েছিলেন এবং সে সময় স্থানীয় গণমাধ্যমে তাঁর সাক্ষাৎকার প্রচারিত হয়েছিল। চীনে ফিরে আসার পর তাঁকে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পুলিশ সরাসরি তলব করে জিজ্ঞাসাবাদ করে এবং অভিবাসন বিভাগের কর্মকর্তারা কোনো ধরনের লিখিত নথিপত্র প্রদান ছাড়াই মৌখিকভাবে জানিয়ে দেন যে হংকং ইস্যুর সাথে সম্পৃক্ততার কারণে তিনি আর কখনো পাসপোর্ট পাবেন না। এই ধরনের স্বেচ্ছাচারী আচরণের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক পুনর্বিবেচনার জন্য আইনি লড়াই করার সাহসও ভুক্তভোগীরা হারিয়ে ফেলছেন, কারণ রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও কারাবাসের চরম আশঙ্কার কারণে তারা মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন। চীন সরকারের প্রশাসনিক লাইসেন্স আইন অনুযায়ী কোনো লাইসেন্স বা সেবা প্রদানে অস্বীকৃতি জানালে তা লিখিতভাবে কারণসহ জানানোর বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে এই আইনের কোনো তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিক জবাব বা মন্তব্য প্রদানে সম্পূর্ণ বিরত রয়েছে, যা প্রশাসনকে আরও বেশি অস্বচ্ছ ও জবাবদিহিহীন করে তুলছে। বেইজিংয়ের নতুন এই বিধিমালার আওতায় সীমান্ত কর্মকর্তাদের এখন বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন তারা নাগরিকদের উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত দেশ বা অঞ্চলগুলোতে ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। তবে শুধু সাধারণ নাগরিকই নন, বরং বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মী থেকে শুরু করে জাদুঘরের সাধারণ চাকুরিজীবী পর্যন্ত সমাজের একটি বিশাল অংশ দীর্ঘকাল ধরেই পাসপোর্টের ওপর নিষেধাজ্ঞা এবং বিশেষ অনুমতির দীর্ঘমেয়াদি জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছেন। শাও ওয়াং নামের এক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানিয়েছেন যে জাপানের মতো সংবেদনশীল দেশগুলোতে ভ্রমণ করা তাদের কর্মীদের জন্য পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং চাকুরির ধরন অনুযায়ী সরাসরি পাসপোর্ট আবেদন করার কোনো সুযোগই তাদের রাখা হয়নি। আইনি বিশেষজ্ঞ টম কেলগ বর্তমান পরিস্থিতির গভীর বিশ্লেষণ করে একে মাও সে-তুং আমলের চরম আদর্শিক নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্ববিচ্ছিন্নতার পুনরাবৃত্তি হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন, যা নব্বইয়ের দশকের উদার ও উন্মুক্ত সংস্কার নীতিমালার ঠিক বিপরীত। শি জিনপিংয়ের শাসনামলে চীনা নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনে এই ধরনের ক্রমবর্ধমান নজিরবিহীন হস্তক্ষেপ কেবল তাদের মৌলিক নাগরিক অধিকারকেই হরণ করছে না, বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের ভাবমূর্তিকে আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলছে। সামগ্রিকভাবে, এই কঠোর ভ্রমণ নীতিমালার ফলশ্রুতিতে সাধারণ নাগরিকদের বাকস্বাধীনতা, মুক্ত চলাচল এবং আন্তর্জাতিক সংস্কৃতির সাথে মেলবন্ধনের পরিসর দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে, যা দীর্ঘমেয়াদে চীনা সমাজকে এক নতুন ধরনের আত্মিক ও ভৌগোলিক অন্তর্মুখী সঙ্কটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator