ঐতিহাসিক শত্রুতার বরফ গলছে: হুথি সংকট মোকাবিলায় ইসরায়েলের পরোক্ষ দ্বারস্থ সৌদি আরব.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

ঐতিহাসিক শত্রুতার বরফ গলছে: হুথি সংকট মোকাবিলায় ইসরায়েলের পরোক্ষ দ্বারস্থ সৌদি আরব..

Roman Rahman avatar   
Roman Rahman
ঐতিহাসিক শত্রুতার বরফ গলছে: হুথি সংকট মোকাবিলায় ইসরায়েলের পরোক্ষ দ্বারস্থ সৌদি আরব..
ঐতিহাসিক শত্রুতার বরফ গলছে: হুথি সংকট মোকাবিলায় ইসরায়েলের পরোক্ষ দ্বারস্থ সৌদি আরব..
ছবি: সংগৃহীত
পাকিস্তানের সামরিক অস্বীকৃতি ও পশ্চিমা মিত্রদের শীতলতায় ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের আগ্রাসন ঠেকাতে মার্কিন সেন্টকমের মধ্যস্থতায় ইসরায়েলের গোয়েন্দা সহায়তার শরণাপন্ন হয়েছে সৌদি আরব।..

ইয়েমেনের লোহিত সাগরের উপকূল এবং কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালীর বড় একটি অংশ হুথি বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়ার পর থেকেই গভীর সামরিক ও ভূরাজনৈতিক সংকটের মুখে পড়েছে তেলসমৃদ্ধ উপসাগরীয় দেশ সৌদি আরব। গত সপ্তাহে হুথিদের এই আকস্মিক ও শক্তিশালী আঞ্চলিক অগ্রাভিযান রিয়াদের জাতীয় নিরাপত্তাকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে, যার ফলে দেশটির নীতিনির্ধারকরা মরিয়া হয়ে বিকল্প সুরক্ষার পথ খুঁজতে বাধ্য হয়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান ক্ষমতার ভারসাম্যে দীর্ঘদিনের বৈরী সম্পর্ক এবং তেল আবিবকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ার নীতিগত অবস্থানকে পাশ কাটিয়ে সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান এই নজিরবিহীন পরিস্থিতিতে মার্কিন সেন্টকমের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে ইসরায়েলের সহায়তা কামনা করেছেন। ইসরায়েলি গণমাধ্যম দ্য জেরুজালেম পোস্ট এবং ইসরায়েল হায়োম-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদগুলোতে উঠে এসেছে যে, লোহিত সাগরের সামুদ্রিক বাণিজ্য পথ এবং নিজেদের তেল ক্ষেত্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে রিয়াদ অত্যন্ত গোপনীয় ও অস্বাভাবিক এই কূটনৈতিক ও গোয়েন্দা যোগাযোগের পথ বেছে নিয়েছে। ঐতিহ্যগত মিত্রদের কাছ থেকে কাঙ্ক্ষিত সামরিক সাড়া না পেয়ে সৌদি আরবের এই কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে এক নতুন ও জটিল সমীকরণের ইঙ্গিত দিচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে বলে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

এই নজিরবিহীন কূটনৈতিক তৎপরতার পেছনে কাজ করছে রিয়াদের দীর্ঘদিনের প্রথাগত মিত্রদের কাছ থেকে সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপের অস্বীকৃতি ও চরম হতাশা। সংকট ঘনীভূত হওয়ার পর সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান প্রথমে মিসরসহ অন্যান্য উপসাগরীয় আরব রাষ্ট্রগুলোর কাছে সামরিক সহায়তার আবেদন জানিয়ে ব্যর্থ হন, যা রিয়াদের আঞ্চলিক একক নেতৃত্বকে বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। এর পাশাপাশি, মক্কা চুক্তি ও যৌথ আত্মরক্ষা চুক্তির দীর্ঘদিনের অংশীদার হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান ইয়েমেনের মাটিতে হুথিদের বিরুদ্ধে সরাসরি যুদ্ধ-অভিযানে সেনা বা সামরিক সম্পদ মোতায়েন করার প্রস্তাব দ্ব্যর্থহীনভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে। ইসলামাবাদ কেবল সৌদি ভূখণ্ডের অভ্যন্তরীণ প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে নিজেদের উপস্থিতি সীমাবদ্ধ রাখার ঘোষণা দিয়ে বিদেশের মাটিতে সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর ব্যাপারে কঠোর সীমারেখা টেনে দিয়েছে। অন্যদিকে, ঐতিহ্যগত পশ্চিমা মিত্র যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যও আনসারুল্লাহ বা হুথি যোদ্ধাদের ওপর কোনো ধরনের সরাসরি ও পূর্ণাঙ্গ সামরিক হামলা চালানোর সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে এবং এর বদলে কেবল সীমিত পরিসরে গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ও সামরিক উপদেষ্টা পাঠানোর মৃদু প্রস্তাব দিয়েছে। মিত্রদের এমন রক্ষণশীল ও নিষ্ক্রিয় অবস্থান সৌদি আরবকে এমন এক কোণঠাসা পরিস্থিতিতে ফেলেছে যেখানে নিজেদের অস্তিত্ব ও বাণিজ্যিক রুট রক্ষার স্বার্থে তারা তাদের দীর্ঘদিনের অনমনীয় বৈদেশিক নীতিতে আপস করতে বাধ্য হচ্ছে।

সৌদি আরব ও ইসরায়েলের মধ্যে এই ধরনের পরোক্ষ যোগাযোগ এবং গোয়েন্দা সহায়তার লেনদেন মধ্যপ্রাচ্যের চলমান কূটনীতিতে এক অস্বস্তিকর ও ব্যতিক্রমী বাস্তবতার জন্ম দিয়েছে, যেখানে পারস্পরিক প্রকাশ্য শত্রুতা সত্ত্বেও যৌথ নিরাপত্তার তাগিদে পর্দার আড়ালে যোগাযোগ স্থাপন করা হচ্ছে। তেল আবিব ও রিয়াদের মধ্যে সরাসরি কোনো কূটনৈতিক সম্পর্ক না থাকলেও, মার্কিন সেন্টকমের মধ্যস্থতা এই দুই শক্তির মাঝে একটি কার্যকরী সেতু হিসেবে কাজ করছে, যা হুথি হুমকি মোকাবিলায় গোয়েন্দা তথ্য শেয়ার করার ক্ষেত্রে পথ প্রশস্ত করেছে। তবে এই পন্থায় সমস্যার স্থায়ী কোনো সামরিক সমাধান আসবে কি না, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই আন্তর্জাতিক সামরিক বিশ্লেষকদের মধ্যে গভীর সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। হুথি বিদ্রোহীরা যেভাবে লোহিত সাগরের সামুদ্রিক জলসীমায় নিজেদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে, তাতে কেবল পরোক্ষ গোয়েন্দা সহায়তা দিয়ে তাদের অগ্রগতি রোধ করা অত্যন্ত দুরূহ একটি ব্যাপার হবে। এই প্রেক্ষাপটে সৌদি কর্তৃপক্ষের সামনে এখন দুটি পথ খোলা রয়েছে—হয় নিজেদের সামরিক কৌশলকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে সাজাতে হবে, অথবা আঞ্চলিক শক্তিগুলোর সাথে আরও বড় পরিসরে বৃহত্তর কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে, যা কেবল রিয়াদ নয়, বরং গোটা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে।

লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে হুথি বিদ্রোহীদের এই ক্রমবর্ধমান আধিপত্য এবং তা দমনে সৌদি আরবের ইসরায়েলি গোয়েন্দা সহায়তার ওপর নির্ভরতা ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে এক দীর্ঘমেয়াদী অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। ঐতিহ্যগত মিত্রদের অনীহা এবং পাকিস্তানের মতো শক্তির সামরিক নিরপেক্ষতা বজায় রাখার নীতি পরিষ্কার করে দেয় যে, সৌদি আরবকে এখন থেকে নিজেদের আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংকট একা হাতেই মোকাবিলা করতে হবে অথবা নতুন ও বিতর্কিত মিত্রদের সাথে সম্পর্ক গভীর করতে হবে। এই ঘটনা কেবল রিয়াদের বৈদেশিক নীতির দুর্বলতাকেই প্রকাশ করছে না, বরং এটি মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘস্থায়ী জোটগুলোকে ভেঙে নতুন মেরুকরণের পথ উন্মুক্ত করে দিচ্ছে। যদি এই সংকট সঠিকভাবে ও দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তবে বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সামুদ্রিক করিডোরে দীর্ঘমেয়াদী অস্থিরতা তৈরি হবে, যার বিরূপ প্রভাব পড়বে কেবল সৌদি অর্থনীতি বা উপসাগরীয় অঞ্চলে নয়, বরং সমগ্র বিশ্ব অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের ওপর।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator