ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ঘটে যাওয়া অগ্নিকাণ্ডের আকস্মিক ঘটনা এবং তৎপরবর্তী পদদলনে চারজন মানুষের প্রাণহানির মর্মান্তিক ঘটনা পুরো স্বাস্থ্যখাতের নাজুক অবস্থাকেই পুনরায় উন্মোচন করেছে। গত কয়েকদিন আগে ময়মনসিংহ অঞ্চলে অবস্থিত এই প্রধান চিকিৎসাকেন্দ্রে হঠাৎ আগুন লাগার পর রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে যে চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, তার যথাযথ কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা বা তাৎক্ষণিক নিয়ন্ত্রণ ছিল না। হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, ভবনটিতে আগুনের উৎসস্থল ও এর তীব্রতা নিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে নানা ধোঁয়াশা তৈরি হলেও এর চেয়েও বড় বিপর্যয় ঘটে যখন হুড়োহুড়ি করে ভবন ত্যাগ করার চেষ্টা করা হয়। ভবনটির নতুন অংশে দুটি নির্ধারিত সিঁড়ির মধ্যে একটি রহস্যজনক কারণে বন্ধ থাকায় সব রোগী ও তাদের সাথে থাকা অসহায় স্বজনরা একমাত্র সচল সিঁড়িটি ব্যবহার করতে বাধ্য হন, যা এই পদদলনের পরিস্থিতিকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে। এই অনাকাঙ্ক্ষিত হুড়োহুড়িতে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর পাশাপাশি পরবর্তীতে মৃতের তালিকা প্রকাশেও চরম বিশৃঙ্খলা ও দায়িত্বহীনতার প্রমাণ পাওয়া গেছে, যেখানে জীবিত ব্যক্তির নাম পর্যন্ত মৃত তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার মতো ঘটনা ঘটে। বৃহত্তর এই চিকিৎসাকেন্দ্রে আগুনের মতো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য যে ধরনের দক্ষ জনবল, পূর্বপ্রস্তুতি বা সমন্বিত প্রটোকল থাকা আবশ্যক ছিল, তার সম্পূর্ণ অনুপস্থিতি এই পুরো দুর্ঘটনার মূল চিত্রকে আরও বেশি কলুষিত করেছে এবং সাধারণ মানুষের জীবন রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিয়ে গভীর সংকটের জন্ম দিয়েছে।
ভুক্তভোগী পরিবার ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরা୍দ দিয়ে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত রোগীর চাপ এই ধরনের বড় ধরনের বিপর্যয় ডেকে আনার ক্ষেত্রে অন্যতম অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ডে তিল ধারণের ঠাঁই না থাকায় মেঝে, করিডোর কিংবা ট্রলিতে গাদাগাদি করে রোগীদের চিকিৎসা নিতে হয়, যা মূলত স্বাভাবিক সময়েই একটি মানবিক বিপর্যয়। অগ্নিকাণ্ডের রাতে তারাকান্দার বালিখা গ্রাম থেকে আসা কুলসুম আক্তার তার জন্ডিসে আক্রান্ত বারো বছর বয়সী সন্তানকে বাঁচাতে গিয়ে নিজেই এই পদদলনের ভয়াবহ শিকার হন, যদিও তিনি শেষ পর্যন্ত তার সন্তানকে নিরাপদে বের করে আনতে পেরেছিলেন কিন্তু তাকে নিজেও চরম শারীরিক ও মানসিক ট্রমায় পড়তে হয়। এছাড়া হাসপাতালের অপর্যাপ্ত জায়গার কারণে অনেক জটিল রোগীকেও দীর্ঘ সময় ট্রলিতে ফেলে রাখার অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে, যার ফলে জরুরি মুহূর্তে রোগী স্থানান্তর করা বা তাদের জীবন বাঁচানো চিকিৎসকদের জন্যও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ভুক্তভোগী স্বজন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, হাসপাতালে যখন অগ্নিকাণ্ডের সাইরেন বেজে ওঠে, তখন আতঙ্কিত লোকজনকে শান্ত করার বা সঠিক দিকনির্দেশনা দেওয়ার মতো কোনো নিরাপত্তা কর্মী বা প্রশাসনিক প্রতিনিধি সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। প্রতিটি ওয়ার্ডে যেখানে রোগীরা শয্যা সংকটের কারণে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন, সেখানে একটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা কতটা ভয়ংকর রূপ নিতে পারে, তার নির্মম বাস্তব প্রমাণ হলো এই পদদলনের ঘটনা, যা স্বাস্থ্য প্রশাসনের চরম উদাসীনতা ও তদারকির অভাবকে স্পষ্ট করে তোলে।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট পক্ষ ও হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদের বক্তব্যে দায়িত্ব এড়ানোর প্রবণতা লক্ষ্য করা গেলেও সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহলের পক্ষ থেকে তীব্র ক্ষোভ ও নিরপেক্ষ তদন্তের জোরালো দাবি উঠেছে। কেন জরুরি মুহূর্তে একটি প্রধান বহির্গমন সিঁড়ি বন্ধ রাখা হয়েছিল, কে বা কারা এই নিরাপত্তার সাথে আপস করেছে এবং অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত কীভাবে হলো—এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট উত্তর এখনো মেলেনি। ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি অনুযায়ী, অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এই হত্যাকাণ্ডের সমতুল্য অবহেলার সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করতে হবে এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। একই সাথে যারা এই অগ্নিকাণ্ড ও পদদলনের ঘটনায় মারা গেছেন, তাদের শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর জন্য রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে যথাযথ ক্ষতিপূরণ এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। হাসপাতাল পরিচালনা পর্ষদ ও সংশ্লিষ্ট স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যদি এখন থেকেই তাদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা প্রটোকল আধুনিকায়ন না করে এবং অতিরিক্ত রোগীর চাপ সামলানোর কার্যকর কোনো দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ না করে, তবে এই ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, শুধুমাত্র দায়সারা তদন্ত কমিটি গঠনের মাধ্যমেই দায়িত্ব শেষ না করে, প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে ফায়ার সেফটি ও ইমার্জেন্সি এভাকুয়েশন বা জরুরি নিষ্কাশন পরিকল্পনা বাধ্যতামূলক করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালটি কেবল ময়মনসিংহ জেলা নয়, বরং পার্শ্ববর্তী শেরপুর, নেত্রকোনা, জামালপুরসহ বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের কোটি মানুষের চিকিৎসাসেবার একমাত্র ভরসাস্থল হওয়ায় এখানে প্রতিদিন লাখো মানুষের সমাগম ঘটে, যার ফলশ্রুতিতে সামান্য অব্যবস্থাপনাও বড় ধরনের জাতীয় ট্রাজেডিতে রূপ নিতে পারে। সাম্প্রতিক এই অগ্নিকাণ্ড ও পদদলনের ঘটনাটি কেবল একটি সাধারণ দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি আমাদের সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার নিরাপত্তা ঘাটতির একটি স্পষ্ট সতর্কবার্তা, যা উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ নেই। অবিলম্বে যদি এই হাসপাতালের পরিকাঠামোগত ত্রুটি দূর করা না হয়, বিকল্প সিঁড়ি ও জরুরি বহির্গমন পথ সার্বক্ষণিকভাবে উন্মুক্ত রাখার ব্যবস্থা না করা হয় এবং রোগীর ধারণক্ষমতা অনুযায়ী শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি করা না হয়, তবে আগামী দিনে আরও বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটার আশঙ্কা থেকেই যায়। তাই সাধারণ মানুষের করের টাকায় চলা এই গুরুত্বপূর্ণ জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে চিকিৎসা নিতে এসে যেন কাউকেই আর জীবন হারাতে না হয়, তার স্থায়ী ও টেকসই সমাধান নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও সরকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।