বিশেষজ্ঞ চোখে কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিশেষজ্ঞ চোখে কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

শারমিন সুলতানা  avatar   
শারমিন সুলতানা
বিশেষজ্ঞ চোখে কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (BIDS) এর একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর ব্যবস্থাপনার বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোকে নতুন করে...

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (BIDS) এর একটি সমীক্ষা প্রতিবেদন কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর ব্যবস্থাপনার বর্তমান চ্যালেঞ্জগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জনকারীদের প্রায় ৪০% বেকারত্বের শিকার হচ্ছেন, যেখানে একই সময়ে দেশের শিল্প খাতগুলোতে দক্ষ কর্মীর তীব্র সংকট বিদ্যমান। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও কর্পোরেট জগতের মধ্যে এক গভীর ফারাককে নির্দেশ করে, যা প্রচলিত লিডারশিপ ধারণা এবং এইচআর অনুশীলনের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। এই সংকট মোকাবেলায় প্রচলিত মিথগুলো ভেঙে বাস্তবসম্মত কৌশল গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) দেশের প্রায় সকল পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কাঠামো ও পাঠ্যক্রম প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে কর্পোরেট জগত যে গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে, সেই গতিতে UGC-এর নির্দেশিত পাঠ্যক্রমগুলো প্রায়শই হালনাগাদ হতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চাহিদা মেটাতে প্রয়োজনীয় সফট স্কিলস, যেমন - সমস্যা সমাধান, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং ডিজিটাল সাক্ষরতার মতো ক্ষেত্রে পিছিয়ে পড়ছেন। কর্পোরেট লিডারদের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা হলো, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রাপ্ত ডিগ্রিই একজন প্রার্থীর যোগ্যতার চূড়ান্ত মাপকাঠি, যা প্রায়শই ভুল প্রমাণিত হয় যখন একজন ডিগ্রিধারী কর্মী বাস্তব কর্মক্ষেত্রে এসে মৌলিক সমস্যা সমাধানে হিমশিম খান। এইচআর বিভাগগুলোর জন্য এটি একটি বড় চ্যালেঞ্জ, কারণ তারা একদিকে দক্ষ কর্মীর অভাবে ভুগছে, অন্যদিকে বিপুল সংখ্যক আবেদনকারীর মধ্যে থেকে উপযুক্ত প্রার্থী খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে। এই অসামঞ্জস্যতা দূর করতে হলে UGC-এর উচিত শিল্প বিশেষজ্ঞদের সাথে নিয়মিত পরামর্শের মাধ্যমে পাঠ্যক্রমকে আরও কর্মমুখী ও যুগোপযোগী করা, যেখানে কেবল তাত্ত্বিক জ্ঞান নয়, ব্যবহারিক দক্ষতার উপরও জোর দেওয়া হবে।

দক্ষতা উন্নয়ন ও কারিগরি শিক্ষার প্রসারে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। NSDA জাতীয় দক্ষতা নীতির আওতায় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের (TVET) মান নির্ধারণ ও তদারকি করে, যা দেশের তরুণদের কর্মসংস্থানমুখী দক্ষতা অর্জনে সহায়ক। একই সাথে, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর দেশের কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রম পরিচালনা করে। তবে, কর্পোরেট লিডারশিপের মধ্যে দীর্ঘদিনের একটি মিথ প্রচলিত আছে যে, কারিগরি শিক্ষা কেবল 'ব্লু-কলার' চাকরির জন্য উপযুক্ত এবং উচ্চ পর্যায়ের কর্পোরেট পদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি অপরিহার্য। এই ভুল ধারণা বহু সম্ভাবনাময় প্রতিভাকে কর্পোরেট সিঁড়িতে উঠতে বাধা দিচ্ছে, এবং প্রতিষ্ঠানগুলোও অত্যাবশ্যকীয় প্রযুক্তিগত দক্ষতা সম্পন্ন কর্মী নিয়োগে পিছিয়ে পড়ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) এর তথ্য অনুযায়ী, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা নিয়ে পাশ করা শিক্ষার্থীদের বেকারত্বের হার সাধারণ ডিগ্রিধারীদের তুলনায় কম। এই সত্য সত্ত্বেও, অনেক এইচআর বিভাগ এখনো কারিগরি ডিগ্রিধারীদের প্রতি একটি প্রথাগত অনীহা পোষণ করে। অন্যদিকে, স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP) এর মতো প্রকল্পগুলো নির্দিষ্ট শিল্প খাতের চাহিদা অনুযায়ী কর্মীদের দক্ষতা উন্নয়নে কাজ করছে, যার ফলে প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের কর্মসংস্থানের হার তুলনামূলকভাবে সন্তোষজনক। লিডারশিপের উচিত এই প্রকল্পগুলোর সাফল্যকে উদাহরণ হিসেবে নিয়ে তাদের নিয়োগ নীতিতে পরিবর্তন আনা এবং TVET স্নাতকদের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব তৈরি করা।

শিক্ষা খাতের তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণে বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। BANBEIS শিক্ষা সম্পর্কিত বিভিন্ন পরিসংখ্যান সরবরাহ করলেও, এই তথ্যগুলো প্রায়শই কর্পোরেট এইচআর বিভাগ বা লিডারশিপ কর্তৃক কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হয় না। উদাহরণস্বরূপ, কোন অঞ্চলে কোন শিল্পে কী ধরনের দক্ষতার চাহিদা বাড়ছে, বা কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে পাশ করা শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থানের হার কেমন, এই ধরনের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে। কর্পোরেট লিডারদের একটি সাধারণ মিথ হলো, এইচআর বিভাগ কেবল বেতন-ভাতা ও প্রশাসনিক কাজ সামলানোর জন্য, কিন্তু আধুনিক কর্পোরেট প্রেক্ষাপটে এইচআর একটি কৌশলগত অংশীদার। একজন দক্ষ এইচআর ম্যানেজার BANBEIS, NSDA এবং UGC এর ডেটা ব্যবহার করে ভবিষ্যতের জন্য কর্মীবাহিনী পরিকল্পনা (workforce planning) করতে পারেন, যা প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদী সাফল্যের জন্য অপরিহার্য। দক্ষ নেতৃত্ব এইচআর বিভাগকে কেবল ডেটা বিশ্লেষণে উৎসাহিত করবে না, বরং তাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় ডেটাকে একটি কেন্দ্রীয় ভূমিকা দেবে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রশিক্ষণ ও নিয়োগ কৌশলকে আরও সুনির্দিষ্ট করতে পারবে এবং দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। ডেটা-ভিত্তিক এই বিশ্লেষণই কর্পোরেট লিডারশিপকে প্রচলিত মিথ থেকে বের করে এনে বাস্তবতার নিরিখে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।

খাত/উদ্যোগ ২০২০-২১ অর্থবছর (লক্ষ) ২০২২-২৩ অর্থবছর (লক্ষ) পরিবর্তনের হার (%) প্রাসঙ্গিকতা
UGC অধিভুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রিধারী ৬.৫০ ৭.২০ +১১% উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বৃদ্ধি
NSDA অনুমোদিত TVET প্রশিক্ষণার্থী ৩.৩০ ৪.১০ +২৪% দক্ষতা উন্নয়নে ক্রমবর্ধমান আগ্রহ
BANBEIS এর তথ্য অনুযায়ী মাধ্যমিক পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষা গ্রহণকারী ১২.২০ ১৪.৫০ +১৯% কারিগরি শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের ঝোঁক
কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এর আওতায় ডিপ্লোমা ডিগ্রিধারী ১.১০ ১.৩৫ +২৩% মধ্যম স্তরের দক্ষ জনশক্তির যোগান
SEIP এর মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও কর্মসংস্থান প্রাপ্ত ০.৮৫ ১.১৫ +৩৫% নির্দিষ্ট শিল্পে দক্ষতা ও কর্মসংস্থানের সেতুবন্ধন

উৎস: UGC বার্ষিক প্রতিবেদন, NSDA বার্ষিক প্রতিবেদন, BANBEIS এডুকেশন স্ট্যাটিস্টিকস, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ও SEIP প্রকল্প প্রতিবেদন (২০২০-২৩ সালের আনুমানিক গড়)

সুপারিশ

  • দেশের কর্পোরেট লিডারশিপ এবং এইচআর বিভাগকে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এর সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে হবে। NSDA-এর জাতীয় দক্ষতা নীতি-২০১১ (সংশোধিত) এবং শ্রম আইন-২০০৬ (সংশোধিত) এর অধীনে একটি বাধ্যতামূলক ইন্টার্নশিপ ও অ্যাপ্রেন্টিসশিপ প্রোগ্রাম চালুর জন্য সরকারকে প্রস্তাবনা পেশ করা উচিত, যেখানে সকল বৃহৎ ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানকে তাদের বার্ষিক নিয়োগের একটি নির্দিষ্ট শতাংশ কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) থেকে পাশ করা এবং NSDA অনুমোদিত প্রশিক্ষণপ্রাপ্তদের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে, যা তাদের বাস্তব কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে।
  • UGC-এর উচিত একটি শিল্প-শিক্ষা পার্টনারশিপ সেল গঠন করা, যা প্রতি দুই বছর অন্তর শিল্প বিশেষজ্ঞদের সাথে যৌথভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যক্রম পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করবে। এই সেলের সুপারিশকৃত পরিবর্তনগুলো UGC কর্তৃক বাধ্যতামূলকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এর কার্যকারিতা জাতীয় শিক্ষানীতি-২০১০ ও UGC অ্যাক্ট-১৯৭৩ এর আওতায় নিয়মিত নিরীক্ষা করা হবে, যাতে স্নাতক ডিগ্রিধারীরা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের জন্য প্রয়োজনীয় সফট ও হার্ড স্কিলস অর্জন করতে পারেন।
  • BANBEIS এবং NSDA কে যৌথভাবে একটি জাতীয় কর্মসংস্থান ও দক্ষতা চাহিদা পূর্বাভাস প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে, যা দেশের বিভিন্ন শিল্প খাতের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ দক্ষতার চাহিদা সম্পর্কে বিস্তারিত ডেটা সরবরাহ করবে। এই প্ল্যাটফর্মের ডেটা ব্যবহার করে SEIP (Skills for Employment Investment Program) এর মতো প্রকল্পগুলো তাদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে আরও সুনির্দিষ্টভাবে ডিজাইন করতে পারবে এবং কর্পোরেট এইচআর বিভাগগুলো তাদের নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ কৌশল নির্ধারণে এই ডেটা ব্যবহার করতে বাধ্য থাকবে, যা প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিক সময়ে সঠিক দক্ষতা সম্পন্ন কর্মী খুঁজে পেতে সহায়তা করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: শারমিন সুলতানা

শারমিন সুলতানা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্পোরেট লিডারশিপ ও এইচআর। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator