কারাগারের অন্ধকার জগৎ: দুর্নীতির জালে বন্দি সংশোধন প্রক্রিয়া | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

🔎 অনুসন্ধানী বিশেষ প্রতিবেদন

কারাগারের অন্ধকার জগৎ: দুর্নীতির জালে বন্দি সংশোধন প্রক্রিয়া

নাফিসা রহমান  avatar   
নাফিসা রহমান
কারাগারের অন্ধকার জগৎ: দুর্নীতির জালে বন্দি সংশোধন প্রক্রিয়া
কারাগারের অন্ধকার জগৎ: দুর্নীতির জালে বন্দি সংশোধন প্রক্রিয়া
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের কারাগারগুলো, যা মূলত অপরাধীদের সংশোধনের মাধ্যমে সমাজে পুনর্বাসনের কেন্দ্র হওয়ার কথা, তা এখন গভীর দুর্নীতি ও অনিয়মের এক অদৃশ্য জালে আবদ্ধ। 'আই নি...

বাংলাদেশের কারাগারগুলো, যা মূলত অপরাধীদের সংশোধনের মাধ্যমে সমাজে পুনর্বাসনের কেন্দ্র হওয়ার কথা, তা এখন গভীর দুর্নীতি ও অনিয়মের এক অদৃশ্য জালে আবদ্ধ। 'আই নিউজ বিডি'-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, কারাগারের ভেতরে একটি শক্তিশালী অসাধু চক্র গড়ে উঠেছে, যেখানে অর্থের বিনিময়ে বন্দিরা পাচ্ছে অবৈধ সুবিধা, আর সাধারণ বন্দিরা বঞ্চিত হচ্ছে মৌলিক অধিকার থেকে। সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনা ও তদন্ত প্রতিবেদন এই খাতের ভঙ্গুর চিত্র তুলে ধরেছে, যা দেশের সামগ্রিক বিচার ও সংশোধন ব্যবস্থার ওপর প্রশ্ন তুলেছে।

কারাগারের অভ্যন্তরে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের একটি বিস্তৃত জাল তৈরি হয়েছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। বন্দিদের স্বজনরা কারারক্ষীদের কাছে টাকা পাঠিয়ে মোবাইল ফোন, মাদকদ্রব্য, এমনকি বাইরের খাবার পাওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছেন। ২০২৩ সালের আগস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগারের এমন অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে কারারক্ষীরা সরাসরি টাকা না নিয়ে স্বজন বা আশপাশের দোকানের মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে অর্থ সংগ্রহ করে। শুধু তাই নয়, সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগারসহ দেশের বিভিন্ন কারাগারে বন্দিদের জন্য বরাদ্দকৃত খাবারেও বড় ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র উঠে এসেছে। তদন্তে দেখা গেছে, মেনুতে আলু উল্লেখ থাকলেও তা কেনা হয়নি, বরং অন্য সবজি দিয়ে কাজ চালানো হয়েছে। এছাড়া, কারাবন্দীদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগও রয়েছে, বিশেষ করে যারা অনিয়মের প্রতিবাদ করেন। ২০২৩ সালের আগস্টে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর কারাবন্দীরা বর্বর নির্যাতনের শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও প্রশ্নবিদ্ধ। ২০২৪ সালের জুন মাসে বগুড়া জেলা কারাগারের কনডেম সেলের ছাদ ফুটো করে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত চার আসামির পলায়নের ঘটনাটি দেশের কারাগারগুলোর দুর্বল নিরাপত্তা ব্যবস্থার এক ভয়াবহ উদাহরণ। এই ঘটনা পুরোনো এবং সংস্কারবিহীন অবকাঠামোকে দায়ী করা হলেও, এটি কারা ব্যবস্থাপনার চরম ব্যর্থতাকেই তুলে ধরে। কথিত ভিআইপি বন্দিদের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদানের প্রবণতাও ব্যাপক। সাবেক মন্ত্রী, এমপি এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা অর্থের বিনিময়ে কারাগারে 'ডিভিশন' সুবিধা পেয়ে থাকেন, যেখানে তারা সাধারণ বন্দিদের তুলনায় উন্নত জীবনযাপন, বই পড়া এবং এমনকি জুম মিটিং করার সুযোগ পান।

এই অনিয়ম ও দুর্নীতির পেছনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আশ্রয়-প্রশ্রয় একটি অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। সরকারের বিভিন্ন তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কারা অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শকরা (ডিআইজি) গতানুগতিকভাবে কারাগার পরিদর্শন করেন এবং অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়গুলো কখনোই খতিয়ে দেখেন না, বরং উল্টো অন্যায় সুবিধা গ্রহণ করেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে কারা কর্তৃপক্ষের গৃহীত পদক্ষেপও অনেক ক্ষেত্রে প্রশ্নবিদ্ধ। যদিও কারা অধিদপ্তর গত সাত মাসে ১২ জনকে চাকরিচ্যুত, ৬ জনকে বাধ্যতামূলক অবসর, ৮৪ জনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং ২৭০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি দিয়েছে, তবে অনেক ক্ষেত্রে দায়ীদের কেবল 'সতর্ক' করা বা 'বদলি' করার মতো লঘু শাস্তি দেওয়া হয়েছে, যা টিআইবি-এর মতো সংস্থাগুলোর মতে অগ্রহণযোগ্য। এমনকি, কর্মী সংকটের অজুহাতে তদন্তাধীন ২৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে দায়িত্বে পুনর্বহাল করার মতো বিতর্কিত সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে ভুল বার্তা দিচ্ছে। দেশের কারাগারগুলোর অবকাঠামোগত সমস্যাও অনিয়মের একটি বড় কারণ। ১৮৮৩ সালে নির্মিত বগুড়া কারাগারের মতো অনেক পুরোনো ও দুর্বল ভবন রয়েছে, যা নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ায়। এছাড়া, কারাগারে বসানো ৮৮টি জ্যামারের মধ্যে ৭৮টিই বিকল থাকায় বন্দিরা অবাধে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে পারছে, যা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সুযোগ করে দিচ্ছে। ১৮৬৪ সালের পুরোনো জেলকোড এবং ১৯৭৮ সালের কারা সংস্কার কমিশনের সুপারিশমালা বাস্তবায়ন না হওয়াও এই খাতের কাঠামোগত দুর্বলতাকে প্রকট করেছে।

এই সামগ্রিক পরিস্থিতি বন্দিদের মানবাধিকার লঙ্ঘন করছে এবং কারাগারকে সংশোধনাগার হিসেবে তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত করছে। সাধারণ বন্দিরা যেখানে অমানবিক পরিবেশে দিন কাটাচ্ছে, সেখানে অর্থ ও ক্ষমতার জোরে ভিআইপি বন্দিরা বিশেষ সুবিধা ভোগ করছে। এটি শুধু কারাগারের ভেতরের শৃঙ্খলাকেই নষ্ট করছে না, বরং সমাজে অপরাধ দমনের প্রচেষ্টাকেও দুর্বল করে দিচ্ছে। কারাগার থেকে আসামি পালানো, মাদক ও মোবাইল ফোনের অবাধ ব্যবহার এবং বন্দিদের ওপর নির্যাতনের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, এই খাতটি একটি গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি রাখে।

সুপারিশ: বাংলাদেশের কারাগার ও প্রিজন ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করতে অবিলম্বে নিম্নলিখিত সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা অপরিহার্য। প্রথমত, কারাগারের ভেতরে সংঘটিত সকল দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগের দ্রুত, নিরপেক্ষ ও দৃষ্টান্তমূলক তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে এবং দোষী সাব্যস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যেখানে কেবল বদলি বা সতর্কীকরণ নয়, বরং চাকরিচ্যুতি ও আইনানুগ বিচার নিশ্চিত করা হবে। দ্বিতীয়ত, কারাগারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আধুনিকায়ন করতে হবে, যার মধ্যে কার্যকর জ্যামার স্থাপন, উন্নত প্রযুক্তির সিসিটিভি নজরদারি এবং বায়োমেট্রিক প্রবেশ ও প্রস্থান ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যাতে মোবাইল ফোন ও মাদকদ্রব্যের অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ হয়। তৃতীয়ত, দেশের পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ কারাগারগুলোর অবকাঠামো জরুরি ভিত্তিতে সংস্কার ও আধুনিকায়ন করতে হবে এবং নতুন আধুনিক সংশোধনাগার নির্মাণে অগ্রাধিকার দিতে হবে, যা বন্দিদের জন্য স্বাস্থ্যকর ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করবে। চতুর্থত, ১৮৬৪ সালের পুরোনো জেলকোডকে আধুনিক বিশ্বের সংশোধনমূলক বিচার ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে নতুন কারা আইন প্রণয়ন করতে হবে এবং ১৯৭৮ সালের কারা সংস্কার কমিশনের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পঞ্চমত, কারা কর্মকর্তাদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং নৈতিকতার মান উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে, যাতে তারা পেশাদারিত্ব ও মানবিকতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। পরিশেষে, বন্দিদের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি স্বাধীন ও সুরক্ষিত ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে তারা কোনো ভয় ছাড়াই অনিয়ম ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে কথা বলতে পারে এবং তাদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা যায়।


🔎 অনুসন্ধানে: নাফিসা রহমান

নাফিসা রহমান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: কারাগার ও প্রিজন ম্যানেজমেন্ট।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator