বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সাইবার কূটনীতি: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয় | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সাইবার কূটনীতি: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়

তানজিম কবির  avatar   
তানজিম কবির
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সাইবার কূটনীতি: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সাইবার কূটনীতি: সংকট, সম্ভাবনা ও করণীয়
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক সাইবার পরিসরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত সাইবার গুপ্তচরবৃত্তি ও অবকাঠামো আক্রমণের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশকে তার আন্তর্জাতিক সাইবার ক...

সাম্প্রতিক সময়ে বৈশ্বিক সাইবার পরিসরে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় সংঘটিত সাইবার গুপ্তচরবৃত্তি ও অবকাঠামো আক্রমণের ঘটনাপ্রবাহ বাংলাদেশকে তার আন্তর্জাতিক সাইবার কূটনীতি কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে। গত বছর বিশ্বব্যাপী ঘটে যাওয়া একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সাইবার হামলা, যা বিভিন্ন দেশের জাতীয় নিরাপত্তা ও অর্থনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে, তার ঢেউ বাংলাদেশের উপকূলকেও স্পর্শ করেছে। বিশেষ করে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে (Critical Information Infrastructure) লক্ষ্যবস্তু করে চালানো সাইবার হামলার প্রবণতা বৃদ্ধি পাওয়ায়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক আলোচনায় অধিক সক্রিয় হতে দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক সাইবার অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান, দুর্বলতা এবং এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় কূটনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রকট।

বাংলাদেশের জন্য আন্তর্জাতিক সাইবার কূটনীতি কেবল সাইবার হামলার প্রতিরোধ বা প্রতিকারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে ওতপ্রপ্রোতভাবে জড়িত। বৈশ্বিক শক্তিগুলোর মধ্যে ক্রমবর্ধমান সাইবার প্রতিযোগিতা এবং সাইবার অস্ত্রশস্ত্রের বিস্তার উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নতুন এক সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে। এক্ষেত্রে, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক আইন, রীতিনীতি ও চুক্তি প্রণয়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে, যাতে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। একইসাথে, দেশের সাইবার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তিগত নির্ভরতা হ্রাসের জন্য আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা অত্যাবশ্যক। সাইবার সক্ষমতার অভাবে সৃষ্ট ঝুঁকির কারণে বাংলাদেশ প্রায়শই সাইবার হামলাকারীদের সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়, যা দেশের ডিজিটাল রূপান্তর প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং আন্তর্জাতিক পরিসরে দেশের বিশ্বাসযোগ্যতাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে।

আঞ্চলিক সহযোগিতা কাঠামো যেমন BIMSTEC (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) এবং সার্ক (দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা) সাইবার কূটনীতিতে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হতে পারে। এই সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সাইবার হুমকি সংক্রান্ত তথ্য আদান-প্রদান, যৌথ গবেষণা, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক নীতিমালা প্রণয়নে ঐকমত্য তৈরি করা সম্ভব। উদাহরণস্বরূপ, BIMSTEC দেশগুলোর মধ্যে সাইবার নিরাপত্তা মহড়া আয়োজন বা একটি আঞ্চলিক সাইবার থ্রেট ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং হাব প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে, যা সাইবার হামলা প্রতিরোধে সম্মিলিত শক্তি বৃদ্ধি করবে। যদিও সার্কের কার্যকারিতা বর্তমানে কিছুটা স্থবির, তবুও সাইবার নিরাপত্তা এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে সদস্য দেশগুলোর অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে এবং এ বিষয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু করার সুযোগ রয়েছে। এই আঞ্চলিক ফোরামগুলো ব্যবহার করে বাংলাদেশ তার নিজস্ব সাইবার নিরাপত্তা এজেন্ডা তুলে ধরতে পারে এবং অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় নেতৃত্ব দিতে পারে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের কূটনৈতিক প্রভাব বাড়াবে।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশনে (UN Peacekeeping Operations) বাংলাদেশের বিশাল অংশগ্রহণ রয়েছে এবং এই মিশনে সাইবার নিরাপত্তার বিষয়টি ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব পাচ্ছে। শান্তিরক্ষীরা এখন কেবল শারীরিক হুমকির মুখোমুখি নন, বরং তাদের যোগাযোগ ব্যবস্থা, ডেটা এবং অপারেশনাল নিরাপত্তা সাইবার হুমকির মুখে। বাংলাদেশ, UN Peacekeeping-এর অন্যতম প্রধান অংশীদার হিসেবে, এই মিশনে সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবেলায় কূটনৈতিকভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে পারে। জাতিসংঘে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত নীতি ও কৌশল প্রণয়নে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা ও সুপারিশগুলো গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ কেবল তার সামরিক সক্ষমতাই নয়, বরং তার ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ক জ্ঞান ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞা প্রদর্শন করতে পারে, যা বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোতে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করবে। এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি উন্নত করার পাশাপাশি অন্যান্য দেশগুলোর সঙ্গে সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতা বাড়ানোর সুযোগও তৈরি করবে।

সূচক ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক সাইবার নিরাপত্তা সংলাপে অংশগ্রহণ (বার্ষিক) ৪ ৬ ৮ ১০
BIMSTEC/সার্ক সাইবার নিরাপত্তা কর্মশালায় অংশগ্রহণ (বার্ষিক) ১ ২ ৩ ৪
জাতিসংঘের সাইবার নিরাপত্তা সংক্রান্ত রেজোলিউশনে সমর্থন ১২টি ১৩টি ১৪টি ১৫টি
বিদেশি রাষ্ট্রগুলোর সাথে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক দ্বিপাক্ষিক MOU/চুক্তি ২টি ৩টি ৫টি ৭টি
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামোতে বিদেশি উৎস থেকে সন্দেহজনক সাইবার হামলা (প্রতি ১০০০) ০.৮ ১.২ ১.৫ ১.৮

উৎস: বাংলাদেশ কম্পিউটার ইমার্জেন্সি রেসপন্স টিম (BGD e-Gov CIRT) এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ২০২৩ সালের তথ্য প্রাথমিক অনুমিত।

সুপারিশ

  • পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি সুসংগঠিত 'সাইবার কূটনীতি ও কৌশল ডেস্ক' প্রতিষ্ঠা করা হোক, যা বিজিডি ই-গভ সিআইআরটি (BGD e-Gov CIRT) এবং জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা কাউন্সিলের সাথে সমন্বয় করে আন্তর্জাতিক সাইবার নীতি প্রণয়ন, বিদেশি রাষ্ট্রের সাথে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক চুক্তি সম্পাদন এবং বৈশ্বিক সাইবার সংলাপে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করবে।
  • জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩-এর অধীনে সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রোটোকল এবং তথ্য আদান-প্রদানের জন্য সুনির্দিষ্ট বিধিমালা প্রণয়ন করা হোক, যা সাইবার অপরাধ দমনে আন্তর্জাতিক বিচারিক সহায়তা (Mutual Legal Assistance Treaties - MLATs) প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে।
  • BIMSTEC এবং UN Peacekeeping ফোরামে বাংলাদেশ সক্রিয়ভাবে একটি 'আঞ্চলিক সাইবার নিরাপত্তা সহযোগিতা কাঠামো' এবং 'জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা সাইবার নিরাপত্তা নীতিমালা' প্রতিষ্ঠার জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাক, যেখানে সদস্য দেশগুলোর জন্য যৌথ সাইবার মহড়া, সক্ষমতা বৃদ্ধি কর্মসূচি এবং একটি সমন্বিত সাইবার থ্রেট ইন্টেলিজেন্স প্ল্যাটফর্মের প্রস্তাবনা অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তানজিম কবির

তানজিম কবির 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: আন্তর্জাতিক সাইবার কূটনীতি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Ingen kommentarer fundet


News Card Generator