মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি করিডোর দখলের তীব্র লড়াই: বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক উত্তাপ ও সংকট.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি করিডোর দখলের তীব্র লড়াই: বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক উত্তাপ ও সংকট..

Roman Rahman avatar   
Roman Rahman
মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি করিডোর দখলের তীব্র লড়াই: বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক উত্তাপ ও সংকট..
মধ্যপ্রাচ্যে জ্বালানি করিডোর দখলের তীব্র লড়াই: বিশ্ব অর্থনীতিতে মারাত্মক উত্তাপ ও সংকট..
ছবি: সংগৃহীত
মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক সংঘাতে হরমুজ প্রণালী, বাব আল-মান্দেব ও সুয়েজ খালের মতো তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ চোকপয়েন্টগুলো চরম হুমকির মুখে পড়েছে। এর ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড পরিমাণ বৃদ্ধ..

গত ৮ এপ্রিল ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাময়িক যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর আরব উপদ্বীপজুড়ে তীব্র সংঘাতের নতুন ঢেউ শুরু হয়েছে, যার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে বিশ্ব তেল সরবরাহের মূল ধমনীগুলো। হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন সামরিক বাহিনী ও ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের (আইআরজিসি) মধ্যে চলা পাল্টাপাল্টি হামলায় ইতোমধ্যে ওমান উপসাগরে পাঁচটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার ধ্বংস হয়েছে এবং জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। এই সংঘাতের সবচেয়ে বিপজ্জনক মোড় নিয়েছে ইয়েমেনের সমুদ্র উপকূল ও কৌশলগত দ্বীপগুলোতে ইরান-সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীদের হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। ২৬ কিলোমিটার প্রশস্ত এই জলপথের ওপর পূর্ণ আধিপত্য বিস্তার করে হুথিরা এখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক ও তেলবাহী জাহাজগুলোকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূরাজনীতিকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। ওমান সরকার পরিস্থিতি অবনতিশীল হওয়ায় ১৪ সেপ্টেম্বরের নির্ধারিত জিসিসি-ইরান বৈঠক স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছে, যা প্রমাণ করে যে কূটনৈতিক আলোচনার পথ বর্তমানে প্রায় সংকুচিত হয়ে পড়েছে। এই ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনার ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহের ২০ শতাংশ জোগানদাতা এই অঞ্চলটি এখন এক ভয়াবহ তৃতীয় দফার সর্বাত্মক যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে অবস্থান করছে।

এই সংঘাতের প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম রেকর্ড ভেঙে প্রতি ব্যারেল ১০৮ ডলারে গিয়ে ঠেকেছে, যা গত ফেব্রুয়ারি মাসের তুলনায় প্রায় ৫৪ শতাংশ বেশি। ভারতের মতো উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর জন্য এই মূল্যবৃদ্ধি বৈদেশিক মুদ্রার ওপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করেছে, কারণ তেলের দাম প্রতি ১ ডলার বাড়লেই তাদের অতিরিক্ত প্রায় ১৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। এদিকে, সৌদি আরবের লোহিত সাগরীয় ইয়ানবু বন্দর এবং ১ হাজার ২০১ কিলোমিটার দীর্ঘ 'পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইন' ড্রোন হামলার মুখে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তেল রপ্তানি প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। গত আগস্ট মাসে সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল সরবরাহের পরিমাণ কমে দৈনিক ৬০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে, যা গত তিন দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্নের রেকর্ড। হুথিদের এই অপ্রত্যাশিত আক্রমণ এবং সৌদি তেল অবকাঠামোতে মিলিশিয়াদের ধারাবাহিক নাশকতা প্রমাণ করে যে তেহরান অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে 'যুদ্ধক্ষেত্র নিজের অনুকূলে সাজানোর' কৌশল বাস্তবায়ন করছে। মোহসেন রেজাইয়ের হুঁশিয়ারি এবং মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক আগে এই সংঘাত দীর্ঘায়িত করার কৌশল মূলত প্রতিপক্ষের অর্থনৈতিক ভিত্তি গুঁড়িয়ে দেওয়ার এবং ভূরাজনৈতিক সুবিধা আদায়ের একটি সুদূরপ্রসারী ভূকৌশলগত ফাঁদ ছাড়া আর কিছুই নয়।

সংকটের এই চরম মুহূর্তেও আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কার্যকর ভূমিকা পালনে অনীহা পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। সৌদি আরব ও তাদের মিত্রদের ওপর হুথিদের লাগাতার আক্রমণ সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সৌদি যুবরাজের সরাসরি সামরিক হস্তক্ষপেণর অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং দাবি করেছেন যে হুথিরা তাদের সাথে লড়াই করতে চায় না। অন্যদিকে, 'মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি'র স্বাক্ষরকারী দেশ হওয়া সত্ত্বেও পাকিস্তান ও তুরস্ক এই সংঘাতে সেনা পাঠাতে সম্পূর্ণ বিরত রয়েছে, যা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের ভেতরে গভীর আস্থার সংকট ও কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা স্পষ্ট করে তোলে। মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ট্রাম্প প্রশাসনের নিম্নমুখী জনপ্রিয়তা এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের জটিল সমীকরণের কারণে ওয়াশিংটন সরাসরি বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে জড়ানো থেকে সচেতনভাবে দূরে থাকছে। ইরান এই ভূরাজনৈতিক দুর্বলতা এবং মার্কিন রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাকে পুরোপুরি কাজে লাগিয়ে সময়ক্ষেপণ করছে, যার ফলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজপথ থেকে শুরু করে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার পর্যন্ত সর্বত্র এক গভীর অনিশ্চয়তা ও ক্ষমতার লড়াই অব্যাহত রয়েছে।

জ্বালানি সরবরাহের এই জীবনরেখাগুলো অরক্ষিত হয়ে পড়ার কারণে দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ মন্দার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। হরমুজ প্রণালী ও বাব আল-মান্দেবের মতো সংকীর্ণ জলপথগুলো বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য এতটাই সংবেদনশীল যে সামান্য সামরিক সংঘাতেই পুরো পৃথিবীর সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়তে পারে। তেলের ঊর্ধ্বমুখী দামের কারণে কেবল এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলোই নয়, বরং গোটা বিশ্বের উৎপাদন খাত, পরিবহন এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে চলেছে। চলমান এই যুদ্ধ পরিস্থিতি যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না যায় এবং কূটনৈতিক উপায়ে কৌশলগত চোকপয়েন্টগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তবে বিশ্ব অর্থনীতি অচিরেই এক অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হবে। মূলত, মধ্যপ্রাচ্যের এই সংঘাত এখন আর কেবল আঞ্চলিক সীমানার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তিকে জিম্মি করে ভূরাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের এক বিপজ্জনক বৈশ্বিক খেলায় পরিণত হয়েছে।

コメントがありません


News Card Generator