বিচার ও আইনশৃঙ্খলা: দুর্নীতির অভিযোগ, সংস্কারের তাগিদ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিচার ও আইনশৃঙ্খলা: দুর্নীতির অভিযোগ, সংস্কারের তাগিদ

আলফাত হোসেন  avatar   
আলফাত হোসেন
বিচার ও আইনশৃঙ্খলা: দুর্নীতির অভিযোগ, সংস্কারের তাগিদ
বিচার ও আইনশৃঙ্খলা: দুর্নীতির অভিযোগ, সংস্কারের তাগিদ
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের বিচার বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মূল স্তম্ভ, তারাই এখন গভীর দুর্নীতি ও অনি...

বাংলাদেশের বিচার বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, যারা আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জনগণের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মূল স্তম্ভ, তারাই এখন গভীর দুর্নীতি ও অনিয়মের জালে আবদ্ধ। সাম্প্রতিক প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণে এই খাতের কাঠামোগত দুর্বলতা এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের চিত্র প্রকটভাবে উঠে এসেছে, যা সাধারণ মানুষের আস্থা ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকারকে প্রতিনিয়ত ক্ষুণ্ণ করছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে শুরু করে দেশের শীর্ষস্থানীয় আইনজ্ঞরাও এই পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং জরুরি সংস্কারের তাগিদ দিয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশের বিরুদ্ধে ঘুষ, হয়রানি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ২০২৩ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পুলিশ ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতিতে জড়িত এবং এসব অভিযোগ নিয়ে গণমাধ্যমে রিপোর্ট হলেও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে তদন্ত, বিচার ও শাস্তির নজির খুবই কম। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এবং বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপ অনুযায়ী, পুলিশি সেবা পেতে গিয়ে ৬২% থেকে ৭৪.৫% ভুক্তভোগীকে ঘুষ দিতে হয়েছে, যা প্রমাণ করে পুলিশি সেবা একপ্রকার 'মূল্য দিয়ে কেনা সুবিধা' হয়ে উঠেছে। একটি সংস্কার কমিশন পুলিশের দুর্নীতির ৯টি প্রধান খাত চিহ্নিত করেছে, যার মধ্যে রয়েছে জিডি গ্রহণ, মামলা দায়ের, গ্রেপ্তার-বাণিজ্য, অভিযোগপত্র দাখিল, আদালতে হাজিরা এবং রিমান্ডে নির্যাতন করে অর্থ আদায়। এছাড়া, মাদক ব্যবসা, মানব পাচার ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবসার মতো গুরুতর অপরাধে পুলিশের একাংশের জড়িত থাকার অভিযোগও প্রায়শই উঠে আসে। এই অনিয়মগুলো কেবল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

বিচার বিভাগেও দুর্নীতির কালো ছায়া বিস্তৃত হচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন সম্প্রতি বিচারাঙ্গনে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরেছেন। তার মতে, মামলার তদবির থেকে শুরু করে শুনানির তালিকাভুক্তকরণ (কজলিস্ট) পর্যন্ত প্রতিটি ধাপেই দুর্নীতি ঘটছে এবং কিছু বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এর সাথে জড়িত। তিনি হাইকোর্ট ও আপিল উভয় স্তরে তালিকা তৈরির প্রক্রিয়ায় অনিয়মের কথা উল্লেখ করেছেন। আইনমন্ত্রীও সম্প্রতি স্বীকার করেছেন যে, অতীতে কিছু বিচারপতির 'বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্নীতি' আইনের শাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা, যা ন্যায়বিচার প্রাপ্তির পথে বড় বাধা। মামলার জট এবং বিচারের দীর্ঘসূত্রতার কারণে অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে বলে পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নিজেই মন্তব্য করেছেন। উচ্চ আদালতে বিচারক নিয়োগের নীতিমালা না থাকা, অধস্তন আদালতের বিচারকদের বদলি ও পদোন্নতিতে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ এবং পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব এই দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের অন্যতম কারণ হিসেবেও বিচারের দীর্ঘসূত্রতাকে উল্লেখ করা হয়েছে।

এই সংকট নিরসনে সম্প্রতি কিছু গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ও সুপারিশ এসেছে। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার তুর্ক ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহি ও কার্যক্রম তদারকি করতে একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলোর প্রেক্ষিতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের দপ্তর (ওএইচসিএইচআর) ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি বিশদ তথ্যানুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে, যেখানে বাংলাদেশের সামগ্রিক মানবাধিকার পরিস্থিতির টেকসই উন্নয়নে ৪৪টি সুনির্দিষ্ট সুপারিশ করা হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার বিচার বিভাগ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে এবং বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশন প্রধান উপদেষ্টার কাছে ২৮ দফা সুপারিশ পেশ করেছে (ফেব্রুয়ারি ২০২৫)। এসব সুপারিশের মধ্যে রয়েছে সুপ্রিম কোর্ট ও অধস্তন আদালতের বিচারকদের জন্য দুর্নীতিবিরোধী সুস্পষ্ট আচরণবিধি প্রণয়ন, প্রতি তিন বছর পর পর তাদের সম্পত্তির বিবরণ সুপ্রিম কোর্টে প্রেরণ ও ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা। এছাড়া, ই-পারিবারিক আদালত এবং ই-বেইলবন্ডের মতো ই-জুডিশিয়ারি প্রকল্পগুলো বিচারিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও গতি আনতে সহায়ক হচ্ছে।

সুপারিশ: বিচার বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। প্রথমত, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সুপারিশ অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকাণ্ড তদারকির জন্য একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন জাতীয় প্রতিষ্ঠান গঠন করতে হবে, যার তদন্ত ও শাস্তির সুপারিশ করার ক্ষমতা থাকবে। দ্বিতীয়ত, বিচার বিভাগ সংস্কার কমিশনের ২৮ দফা সুপারিশ দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে, বিশেষ করে বিচারকদের জন্য সুস্পষ্ট আচরণবিধি প্রণয়ন এবং নিয়মিত সম্পত্তি বিবরণী জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা করা জরুরি। তৃতীয়ত, বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা কমাতে উচ্চ ও অধস্তন আদালতে পর্যাপ্ত সংখ্যক বিচারক নিয়োগ দিতে হবে এবং বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ ও দলীয় প্রভাবমুক্ত নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে। চতুর্থত, পুলিশের সকল স্তরে ঘুষ ও হয়রানি বন্ধে কঠোর নজরদারি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পরিশেষে, বিচার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন ও ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল করতে হবে এবং গ্রাম আদালত ও অনানুষ্ঠানিক বিচারিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে স্থানীয় পর্যায়ে বিবাদ নিষ্পত্তির সুযোগ বাড়াতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: আলফাত হোসেন

আলফাত হোসেন, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: বিচার বিভাগ, আইন-শৃঙ্খলা ও পুলিশি হয়রানি।

نظری یافت نشد


News Card Generator