অপ্রকাশিত সত্য: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অপ্রকাশিত সত্য: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

সাবরিনা চৌধুরী  avatar   
সাবরিনা চৌধুরী
অপ্রকাশিত সত্য: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
অপ্রকাশিত সত্য: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

অপ্রকাশিত সত্য: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

সম্প্রতি প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি)-এর এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বিগত পাঁচ বছরে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের প্রবণতা প্রায় ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে, যা এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেও বৈশ্বিক স্কলারশিপ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে আমাদের অবস্থান এখনও বেশ পিছিয়ে। এই প্রবণতা, একদিকে যেমন উচ্চশিক্ষার প্রতি আগ্রহের পরিচায়ক, অন্যদিকে দেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আমাদের শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতির অভাবকেও প্রকটভাবে তুলে ধরে। এই পরিস্থিতি কেবল মেধা পাচারের ঝুঁকিই বাড়াচ্ছে না, বরং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো এবং ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানকেও প্রভাবিত করছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত পদক্ষেপের অভাবে অনেক সম্ভাবনাময় শিক্ষার্থী তাদের মেধা ও স্বপ্নকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছেন না।

বৈশ্বিক স্কলারশিপ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে থাকার মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো সঠিক তথ্য ও নির্দেশনার অভাব। দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে স্কলারশিপ বিষয়ক সুসংগঠিত তথ্যকেন্দ্রের অনুপস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষা, যেমন GRE, GMAT, IELTS, TOEFL ইত্যাদির প্রস্তুতিমূলক প্রশিক্ষণের অপ্রতুলতা শিক্ষার্থীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া, গবেষণাভিত্তিক প্রকাশনা এবং আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রবন্ধ উপস্থাপনের অভিজ্ঞতা না থাকায় অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছেন। ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) যদিও দেশের কর্মসংস্থান উপযোগী দক্ষতা বৃদ্ধিতে কাজ করছে, কিন্তু উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাভিত্তিক বৈশ্বিক স্কলারশিপ প্রাপ্তির জন্য প্রয়োজনীয় একাডেমিক ও গবেষণা দক্ষতা বৃদ্ধিতে এর সরাসরি ভূমিকা এখনও সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে কারিকুলামে আন্তর্জাতিক মান বজায় রাখতে না পারা এবং গবেষণা প্রকল্পে পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাবও এই প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আধুনিক গবেষণা অবকাঠামোর অভাব এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা জার্নালগুলিতে প্রবেশাধিকার না থাকাও শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক স্কলারশিপের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা প্রোফাইল তৈরিতে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

এই প্রবণতা দেশের জন্য অর্থনৈতিক ও সামাজিক উভয় ক্ষেত্রেই সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলছে। প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী বিদেশে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করতে গিয়ে মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করছেন। যদিও কিছু শিক্ষার্থী স্কলারশিপ নিয়ে যাচ্ছেন, তাদের সংখ্যা মোট শিক্ষার্থীর তুলনায় নগণ্য। বাংলাদেশ ব্যুরো অফ এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্স (BANBEIS)-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ এখনও বৈশ্বিক গড় বিনিয়োগের তুলনায় অনেক কম, যা দেশীয় গবেষণার মানোন্নয়নে বড় বাধা। ফলস্বরূপ, দেশে উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়ন না হওয়ায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন এবং তাদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আর দেশে ফিরে আসছেন না, যা ‘ব্রেইন ড্রেন’ বা মেধা পাচারের সমস্যাকে আরও প্রকট করছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এই সমস্যা সমাধানে বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও, বাস্তবায়ন ধীরগতিতে হচ্ছে এবং সমন্বয়ের অভাব পরিলক্ষিত। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (DTE) যদিও কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় জোর দিচ্ছে, কিন্তু বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার মূলধারার সঙ্গে এর সংযোগ এখনও দুর্বল, যার ফলে কারিগরি শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক স্কলারশিপের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। দেশের শিল্প খাতের সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংযোগের অভাবে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় ইন্টার্নশিপ ও ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগও সীমিত, যা তাদের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরও পিছিয়ে দিচ্ছে।

দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বৃদ্ধিতে ইউজিসিকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা জার্নালগুলিতে প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা, বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সাথে যৌথ গবেষণা প্রকল্প চালু করা এবং শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের ল্যাবরেটরি সুবিধা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এছাড়া, দেশের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করতে কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরকে আধুনিক কারিকুলাম প্রণয়ন এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে ক্রেডিট ট্রান্সফার চুক্তি স্থাপনে কাজ করতে হবে। এর মাধ্যমে কারিগরি শিক্ষার্থীরাও বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাবেন। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ক্যারিয়ার কাউন্সিলিং ও স্কলারশিপ বিষয়ক বিশেষ সেল গঠন করা প্রয়োজন, যা শিক্ষার্থীদের সঠিক তথ্য ও পরামর্শ দেবে এবং তাদের আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুত করবে।

সূচক ২০১৮ ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২
বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য গমনকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা (অনুমানিত) ৪৭,০০০ ৫৫,০০০ ৪২,০০০ (কোভিড-১৯ প্রভাব) ৬২,০০০ ৭৫,০০০
শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রদত্ত সরকারি স্কলারশিপ সংখ্যা ২,৫০০ ২,৭০০ ২,২০০ ২,৮০০ ৩,০০০
উচ্চশিক্ষায় জিডিপি'র শতাংশ হিসেবে সরকারি ব্যয় (BANBEIS) ০.৮৫% ০.৮৭% ০.৮৪% ০.৮৮% ০.৯০%
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় মোট শিক্ষার্থীর হার (কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর) ১৪.৫% ১৫.০% ১৫.২% ১৬.০% ১৭.৫%
ইউজিসি-এর অধীনে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকাশনার সংখ্যা (প্রতি বছর) ৬,২০০ ৬,৫৫০ ৬,৭০০ ৬,৯০০ ৭,২০০

উৎস: শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, BANBEIS, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শিক্ষা সংস্থার বার্ষিক প্রতিবেদন থেকে সংগৃহীত ও বিশ্লেষিত তথ্য।

সুপারিশ

  • ইউজিসি অবিলম্বে প্রতিটি পাবলিক ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি 'গ্লোবাল স্কলারশিপ ও গবেষণা সহায়তা কেন্দ্র' স্থাপন করবে, যা আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষা প্রস্তুতি, আবেদন প্রক্রিয়া এবং গবেষণা প্রস্তাবনা তৈরিতে শিক্ষার্থীদের নিবিড় প্রশিক্ষণ ও মেন্টরশিপ প্রদান করবে। এই কেন্দ্রগুলি শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হবে।
  • ন্যাশনাল স্কিলস ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর একটি সমন্বিত 'আন্তর্জাতিক দক্ষতা ও শিক্ষাগত যোগ্যতা ফ্রেমওয়ার্ক' তৈরি করবে, যা বৈশ্বিক শ্রমবাজার ও উচ্চশিক্ষার চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হবে। এর মাধ্যমে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক ক্রেডিট ট্রান্সফার এবং স্কলারশিপের সুযোগ লাভে সক্ষম হবে, যা বিশ্বব্যাংকের গ্লোবাল স্কিলস পার্টনারশিপ প্রোগ্রামের মডেল অনুসরণ করতে পারে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি-এর সহযোগিতায় একটি 'প্রত্যাবর্তনকারী স্কলারস ইন্টিগ্রেশন প্রোগ্রাম' চালু করবে, যার আওতায় বিদেশে উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করে দেশে ফিরে আসা মেধাবীদের জন্য সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণা অনুদান, ফাস্ট-ট্র্যাক নিয়োগ এবং উচ্চতর পদে পদোন্নতির বিশেষ সুবিধা থাকবে। এর উদ্দেশ্য হবে দেশের গবেষণা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বৃদ্ধি এবং মেধা পাচার রোধ করা।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সাবরিনা চৌধুরী

সাবরিনা চৌধুরী 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গ্লোবাল স্কলারশিপ ও উচ্চশিক্ষা। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

コメントがありません


News Card Generator