মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে চরম উত্তেজনার মধ্যেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালীতে ইরানের একটি বাণিজ্যিক জাহাজে মারাত্মক হামলার ঘটনা ঘটেছে। গত শনিবার গভীর রাতে ইরানের কেশম দ্বীপের নিকটবর্তী এই জলসীমায় সংঘটিত এই আকস্মিক হামলায় একজন নাবিক নিহত এবং আরও চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম নিশ্চিত করেছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের এই ধমনী হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে চলমান ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতের প্রত্যক্ষ পরিণতি হিসেবেই এই সামরিক উত্তেজনাকে দেখছেন বিশ্লেষকরা। বিশেষ করে, হরমুজ প্রণালীর প্রবেশদ্বারে অবস্থিত বন্দর আব্বাস থেকে মাত্র চৌদ্দ মাইল দূরের এই অঞ্চলে বাণিজ্যিক জাহাজে আঘাত হানার বিষয়টি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং বৈশ্বিক বাণিজ্য রুটে চলমান দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক ও নতুন মোড়। এই ঘটনার মাত্র একদিন পরেই ওমানের মধ্যস্থতায় আঞ্চলিক নেতাদের সাথে তেহরানের একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক পূর্বনির্ধারিত থাকায়, হামলাটির টাইমিং এবং এর পেছনে থাকা কূটনৈতিক ও সামরিক সমীকরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার সূত্রে কেশম দ্বীপের গভর্নর এই সন্ত্রাসী হামলার জন্য সরাসরি বাহ্যিক শত্রুকে দায়ী করলেও, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা তাদের সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য পাওয়া যায়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও বেশি রহস্যময় ও জটিল করে তুলেছে। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের স্থিতিশীলতা রক্ষায় হরমুজ প্রণালীর ভূমিকা অনস্বীকার্য হলেও, সাম্প্রতিক সংঘাতের জেরে এই পথ দিয়ে নৌ-চলাচল সংঘাত-পূর্ববর্তী সময়ের তুলনায় প্রায় নব্বই শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা সামগ্রিক বিশ্ব অর্থনীতিতে এক দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এই সংঘাতের রেশ কাটতে না কাটতেই ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি বিদ্রোহীরা শারুরাহ অঞ্চলে একটি সৌদি সামরিক ঘাঁটিতে ধ্বংসাত্মক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়ে পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল ও রক্তক্ষয়ী করে তুলেছে। হুতিদের মুখপাত্রের দাবি অনুযায়ী, সৌদি ঘাঁটির অস্ত্রভান্ডার এবং কমান্ড ও কন্ট্রোল রুম লক্ষ্য করে চালানো এই সমন্বিত আক্রমণ লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত কৌশলগতভাবে অতি গুরুত্বপূর্ণ পেরিম দ্বীপ দখলের ধারাবাহিকতা মাত্র। এর ফলে বিশ্বের অন্যতম ব্যস্ত এই সামুদ্রিক রুটটির ওপর তেহরান সমর্থিত মিলিশিয়াদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নিয়ন্ত্রণ আরও বেশি শক্তিশালী হয়েছে, যা এশিয়া ও ইউরোপের মধ্যকার বাণিজ্য সংযোগকে চরম হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে। হুতি নিয়ন্ত্রিত এলাকাগুলোতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের তীব্র বিমান হামলার পাল্টা জবাব হিসেবেই এই ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করা হলেও, এর আসল ভুক্তভোগী হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য হয়ে চলাচলকারী সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজ ও নাবিকেরা। যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস সেন্টার জানিয়েছে যে, একই রাতে হরমুজ প্রণালীর জলসীমায় অজ্ঞাত বস্তুর আঘাতে আরেকটি বাণিজ্যিক জাহাজে ভয়াবহ আগুন ধরে যাওয়ার পর স্থানীয় উদ্ধারকারী দলগুলোর তৎপরতায় নাবিকদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ওই জাহাজটির সুনির্দিষ্ট নিবন্ধন বা পরিচয় প্রকাশ না করায় আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে কর্মরত সংস্থাগুলোর মধ্যে গভীর উদ্বেগ ও সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। মার্কিন অবরোধ এবং আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলোর পারস্পরিক দ্বন্দ্বের যাঁতাকলে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যের এই প্রধান জলপথগুলো এখন সাধারণ বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য কার্যত একটি মৃত্যুকূপে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি পদক্ষেপে জীবন হারানোর চরম ঝুঁকি বিরাজ করছে।
এদিকে হরমুজ প্রণালীতে নৌ-চলাচল ব্যবস্থাপনা এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতের নামে তেহরান ও আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কূটনৈতিক তৎপরতাও চরম অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে এগোচ্ছে। ওমানের রাজধানী ওমানে উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর শীর্ষ কূটনীতিকদের সাথে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পূর্বনির্ধারিত বৈঠক অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও বাহরাইনের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র এতে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পুরো উদ্যোগটি এক প্রকার অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। ইরান পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্র যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের ওপর থেকে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক অবরোধ সম্পূর্ণ প্রত্যাহার না করছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এই জলপথ উন্মুক্ত করার বা কোনো ধরনের স্থায়ী সমঝোতায় পৌঁছানোর কোনো প্রশ্নই আসে না। খোদ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মার্কিন অবরোধ অপসারণের এই কঠোর শর্ত পুনর্ব্যক্ত করেছেন, যা স্পষ্ট করে দেয় যে তেহরান কৌশলগত এই প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ ছাড়তে বিন্দুমাত্র নারাজ। এর পাশাপাশি, সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় পাইপলাইনে ড্রোন হামলার জেরে রিয়াদ কর্তৃপক্ষ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে তাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়েছে, যা তাদের তেল রপ্তানি ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ধাক্কা দিয়েছে। ইরাক থেকে পরিচালিত এই মিলিশিয়া হামলার পেছনে ইরানের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠলেও, মার্কিন প্রশাসন থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো এই সংকট নিরসনে কার্যকর কোনো কূটনৈতিক বা সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার বদলে কেবল দায়সারা মন্তব্য করে পরিস্থিতিকে ঝুলিয়ে রাখছে। আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার এই ভঙ্গুর পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর অনমনীয় অবস্থান এবং আধিপত্য বিস্তারের লড়াই আন্তর্জাতিক কূটনীতিকে চরম ব্যর্থতার মুখে ঠেলে দিয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের এই বহুমুখী সংঘাত এবং জলপথগুলোতে অব্যাহত হামলার কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সাপ্লাই চেইন দীর্ঘমেয়াদী ও অপূরণীয় ক্ষতির মুখে পড়ছে। হরমুজ প্রণালী এবং লোহিত সাগরের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল সামুদ্রিক রুটগুলো রণক্ষেত্রে পরিণত হওয়ায় তেলের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্য আকাশচুম্বী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যার চূড়ান্ত মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। ভূ-রাজনৈতিক এই অস্থিরতা যদি দ্রুত কূটনৈতিক উপায়ে সমাধান করা না হয়, তবে কেবল মধ্যপ্রাচ্যই নয়, বরং গোটা বিশ্ব অর্থনীতি এক ভয়াবহের চেয়েও মারাত্মক অর্থনৈতিক মন্দা ও জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব এবং ইরানের ত্রিমুখী এই শক্তি প্রদর্শনের লড়াইয়ে আন্তর্জাতিক জলসীমার নিরাপত্তা আজ সম্পূর্ণ বিপন্ন, যা বৈশ্বিক বাণিজ্যের নিরাপত্তাকে স্থায়ীভাবে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নীরবতা এবং আঞ্চলিক শক্তির উগ্রবাদী নীতি পরিহার না করলে হরমুজ প্রণালীর এই সংকট অদূর ভবিষ্যতে এক সর্বগ্রাসী আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে, যার ধ্বংসলীলা থেকে কোনো দেশই রক্ষা পাবে না। অতএব, অবিলম্বে সব পক্ষের সামরিক আগ্রাসন বন্ধ করে নিরপেক্ষ সংলাপের মাধ্যমে এই জলপথগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে বিশ্ব অর্থনীতি এক অনিবার্য বিপর্যয়ের অতল গহ্বরে তলিয়ে যাবে।