অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন: দেশীয় বীজের পুনরুত্থান ও পুষ্টি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন: দেশীয় বীজের পুনরুত্থান ও পুষ্টি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ

সুমাইয়া পারভীন  avatar   
সুমাইয়া পারভীন
অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন: দেশীয় বীজের পুনরুত্থান ও পুষ্টি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ
অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন: দেশীয় বীজের পুনরুত্থান ও পুষ্টি সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) কর্তৃক প্রকাশিত এক গবেষণা সারসংক্ষেপে দেশীয় বীজের বিলুপ্তি রোধে এবং জৈব কৃষি পদ্ধতির প্রসারে...

সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) কর্তৃক প্রকাশিত এক গবেষণা সারসংক্ষেপে দেশীয় বীজের বিলুপ্তি রোধে এবং জৈব কৃষি পদ্ধতির প্রসারে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের উপর জোর দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, আধুনিক উচ্চফলনশীল জাতের (HYV) উপর অত্যধিক নির্ভরশীলতা এবং রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কৃষি বাস্তুতন্ত্রকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদে মাটি, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই প্রেক্ষাপটে, অর্গানিক ফার্মিং ও দেশীয় বীজের পুনরুত্থান কেবল একটি কৃষিগত বিষয় নয়, বরং এটি পুষ্টি নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত ভারসাম্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গত কয়েক দশক ধরে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে গৃহীত নীতিগুলি মূলত উচ্চফলনশীল জাতের প্রতি পক্ষপাতদুষ্ট ছিল। এর ফলস্বরূপ, ধান গবেষণায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এবং অন্যান্য ফসল গবেষণায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) যদিও খাদ্য উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য এনেছে, তবে একইসাথে হাজারো দেশীয় ফসলের জাত বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। এই দেশীয় জাতগুলি কেবল পরিবেশগত বৈচিত্র্যের ধারক ছিল না, বরং স্থানীয় জলবায়ু, মাটি এবং পোকামাকড় প্রতিরোধী বৈশিষ্ট্যের কারণে এগুলি কৃষকদের জন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করত। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের লাগামহীন প্রয়োগ মাটির অণুজীব বৈচিত্র্য ধ্বংস করেছে, মাটির উর্বরতা কমিয়েছে এবং ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত করেছে, যা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর মাঠপর্যায়ের কর্মীদের জন্য এক নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই রাসায়নিকনির্ভর কৃষি পদ্ধতি একদিকে যেমন কৃষকের উৎপাদন খরচ বাড়িয়েছে, অন্যদিকে তেমনি উৎপাদিত খাদ্যের পুষ্টিগুণ হ্রাস করে জনস্বাস্থ্যে দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলছে।

তবে আশার কথা হলো, পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে টেকসই কৃষি পদ্ধতির দিকে মনোযোগ বাড়ছে। অর্গানিক ফার্মিং, যা মাটি ও পরিবেশের সুরক্ষা নিশ্চিত করে এবং রাসায়নিকমুক্ত খাদ্য উৎপাদন করে, বর্তমানে বিশ্বব্যাপী একটি জনপ্রিয় ধারা। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, দেশীয় বীজের পুনরুত্থান এই অর্গানিক ফার্মিং আন্দোলনের মূল ভিত্তি হতে পারে। দেশীয় জাতের শস্য, সবজি এবং ফল কেবল রাসায়নিকমুক্ত উৎপাদনেই সহায়ক নয়, বরং এগুলির পুষ্টিগুণ প্রায়শই আধুনিক জাতের তুলনায় বেশি হয়। উদাহরণস্বরূপ, অনেক দেশীয় ধানের জাত এবং শাক-সবজিতে উচ্চমাত্রার ভিটামিন, খনিজ পদার্থ এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বিদ্যমান যা আধুনিক জাতগুলিতে বিরল। BARC ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থানীয় জাতের শস্য ও সবজি সংরক্ষণের জন্য উদ্যোগ নিয়েছে এবং DAE মাঠপর্যায়ে কৃষকদের জৈব সার উৎপাদন ও প্রয়োগের বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এই প্রচেষ্টাগুলি সম্মিলিতভাবে কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করছে এবং ধীরে ধীরে রাসায়নিক কৃষির উপর নির্ভরশীলতা কমাচ্ছে। কৃষকদের জন্য জৈব সারের সহজলভ্যতা এবং দেশীয় বীজের বিতরণ নিশ্চিত করা গেলে এই পরিবর্তন আরও ত্বরান্বিত হতে পারে, যা কেবল পুষ্টি সমৃদ্ধ ভবিষ্যত নিশ্চিত করবে না, বরং কৃষকদের অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতা বৃদ্ধিতেও সহায়ক হবে।

সূচক ২০১৮ ২০২১ ২০২৩
জৈব কৃষি পদ্ধতির আওতাধীন জমির পরিমাণ (একর) ৫,২০০ ৮,৭৫০ ১২,১০০
সংরক্ষিত দেশীয় বীজের জাতের সংখ্যা (BARI ও BRRI) ২৭৫ ৩৫০ ৪২০
জৈব সার উৎপাদনকারী কৃষকের সংখ্যা (DAE প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত) ৬,২০০ ১১,২০০ ১৮,৫০০
রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার হ্রাস (%) - ৫% ১০%

উৎস: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর বার্ষিক প্রতিবেদন

সুপারিশ

  • কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন DAE, BARI, এবং BRRI কে জাতীয় বীজ নীতি, ২০১৮ এর আলোকে দেশীয় বীজের সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং গবেষণার জন্য একটি সুনির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ করতে হবে। প্রতিটি উপজেলায় অন্তত একটি করে দেশীয় বীজ ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করা এবং কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে এসব বীজ বিতরণের একটি কার্যকরী কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা আবশ্যক।
  • পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং DAE এর যৌথ উদ্যোগে একটি শক্তিশালী ও সহজলভ্য জাতীয় জৈব কৃষি সার্টিফিকেশন ব্যবস্থা (যেমন, PGS - Participatory Guarantee Systems) প্রবর্তন করতে হবে। পাশাপাশি, জৈব উৎপাদিত পণ্যের জন্য একটি ন্যায্যমূল্যের বাজার তৈরি করতে হবে এবং স্থানীয় বাজারগুলোতে এগুলোর প্রচার ও বিতরণের জন্য বিশেষ সুবিধা প্রদান করতে হবে, যা কৃষি বিপণন আইনের অধীনে করা যেতে পারে।
  • BARC কে দেশীয় বীজ ও জৈব কৃষি পদ্ধতি গ্রহণে কৃষকদের উৎসাহিত করার জন্য একটি সমন্বিত প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করতে হবে। এর মধ্যে রাসায়নিক সারের পরিবর্তে জৈব সার উৎপাদনে ভর্তুকি, দেশীয় জাতের ফসল চাষে আর্থিক সহায়তা এবং DAE এর মাধ্যমে নিয়মিত মাঠপর্যায়ের প্রশিক্ষণ ও প্রদর্শনী কর্মসূচির আয়োজন অন্তর্ভুক্ত থাকবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সুমাইয়া পারভীন

সুমাইয়া পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator