মার্কিন চাপ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির জেরে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন, নয়াদিল্লিতে বসছে ব্রিকস জোটের কৌশলগত শীর্ষ সম্মেলন.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মার্কিন চাপ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির জেরে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন, নয়াদিল্লিতে বসছে ব্রিকস জোটের কৌশলগত শীর্ষ সম্মেলন..

Roman Rahman avatar   
Roman Rahman
মার্কিন চাপ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির জেরে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন, নয়াদিল্লিতে বসছে ব্রিকস জোটের কৌশলগত শীর্ষ সম্মেলন..
মার্কিন চাপ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের বাণিজ্য নীতির জেরে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে বড় পরিবর্তন, নয়াদিল্লিতে বসছে ব্রিকস জোটের কৌশলগত শীর্ষ সম্মেলন..
ছবি: সংগৃহীত
ডোনাল্ড ট্রাম্পের আক্রমণাত্মক শুল্ক নীতি এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে নিজেদের অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান সুরক্ষিত করতে নয়াদিল্লিতে জড়ো হচ্ছেন বিশ্বনেতারা।..

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কঠোর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতি এবং বৈশ্বিক বাণিজ্যে একের পর এক শুল্ক আরোপের জেরে বিশ্ব রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা বিগত কয়েক দশক ধরে চলে আসা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের সমীকরণগুলোকে ওলটপালট করে দিচ্ছে। চলতি সপ্তাহে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর প্রভাবশালী জোট ব্রিকস-এর শীর্ষ সম্মেলন শুরু হয়েছে, যেখানে যোগ দিয়েছেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের মতো শীর্ষ বিশ্বনেতারা। পশ্চিমা শক্তির নেতৃত্বাধীন বৈশ্বিক ব্যবস্থার বাইরে নিজেদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত করার অভিন্ন তাগিদেই এই নেতারা একে অপরের মুখোমুখি হয়েছেন। বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের চলমান যুদ্ধ, ইউক্রেন সংকট নিরসনে রাশিয়ার ওপর ওয়াশিংটনের ধারাবাহিক চাপ এবং ট্রাম্প প্রশাসনের আকস্মিক বাণিজ্য নিষেধাজ্ঞা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতিতে ব্রিকস জোটের সদস্য দেশগুলো বাণিজ্য, জ্বালানি এবং অর্থপ্রদানের বিকল্প ব্যবস্থা গড়ে তোলার নতুন পথ খুঁজছে, যা বৈশ্বিক কূটনীতিতে ওয়াশিংটনের একাধিপত্যকে চ্যালেঞ্জ করার একটি সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে এই দেশগুলোর মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা ওঠানামা থাকলেও ট্রাম্প প্রশাসনের বর্তমান অর্থনৈতিক চাপ তাদের পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রটিকে আরও বেশি প্রসারিত করতে বাধ্য করছে বলেই আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

মার্কিন বাণিজ্য নীতি এবং পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার খড়্গ থেকে নিজেদের অর্থনীতিকে রক্ষা করতে ব্রিকস জোটের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে নতুন ধরনের হিসাব-নিকাশ শুরু হলেও, অভ্যন্তরীণ স্বার্থের সংঘাত ও গভীর বিভাজন এই জোটের সার্বিক অগ্রযাত্রাকে এখনও সীমিত করে রেখেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা ভূ-রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং সীমান্ত বিরোধের কারণে ভারত ও চীনের মধ্যকার সম্পর্ক সবসময়ই অত্যন্ত সংবেদনশীল ছিল, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন বাণিজ্য উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে সেই বরফ কিছুটা গলতে শুরু করেছে। ২০১৯ সালের পর চীনা প্রেসিডেন্টের প্রথম ভারত সফর এবং দুই দেশের মধ্যে স্থগিত থাকা বিমান চলাচল ও ভিসা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ সম্পর্কের বরফ গলার লক্ষণ হলেও, বিশাল বাণিজ্য ঘাটতি এবং কৌশলগত প্রতিযোগিতার রেশ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। এর পাশাপাশি, ইউক্রেন সংকটের জেরে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়া রাশিয়ার জন্য চীন ও ভারত এখন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদার হয়ে উঠেছে, যেখানে ভারত নিয়মিতভাবে রাশিয়ার জ্বালানি তেল আমদানির মাধ্যমে মস্কোর অর্থনীতিকে সচল রাখতে বড় ভূমিকা পালন করছে। চ্যাথাম হাউসের গবেষক চিয়েতিগ বাজপেয়ীসহ আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন যে, ওয়াশিংটনের সঙ্গে ভারতের সাম্প্রতিক টানাপোড়েন নয়াদিল্লিকে তার অন্যান্য কৌশলগত অংশীদারিত্বের জায়গাগুলোতে নতুন করে বিনিয়োগ করতে বাধ্য করেছে। তবে মার্কিন ডলারের ওপর বৈশ্বিক নির্ভরতা কমানো কিংবা স্থানীয় মুদ্রায় দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিধি বাড়ানোর মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয়গুলোতে সদস্য দেশগুলোর নিজস্ব ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক স্বার্থ থাকায় জোরালো ঐক্য গড়ে তোলা বেশ কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ডলারের আধিপত্য খর্ব করা এবং বিকল্প আন্তঃসীমান্ত অর্থপ্রদান ব্যবস্থা গড়ে তোলার বিষয়ে ব্রিকস ভুক্ত দেশগুলোর দীর্ঘদিনের আলোচনা থাকলেও, এই বিষয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য হুমকি ও কঠোর প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন যে ব্রিকস জোট যদি মার্কিন মুদ্রার বিকল্প কোনো ব্যবস্থা দাঁড় করানোর চেষ্টা করে বা ডলারের ওপর আক্রমণ চালায়, তবে সদস্য দেশগুলোকে চড়া শুল্কের মুখে পড়তে হবে। ক্রেমলিন সম্প্রতি সরাসরি ডলার-বর্জনের কোনো পরিকল্পনা নেই বলে অবস্থান পরিষ্কার করলেও, রাশিয়া ও অন্যান্য দেশগুলো বিকল্প মুদ্রায় বাণিজ্য পরিচালনার ওপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে, ভারত শুরু থেকেই ব্রিকস জোটকে উগ্র ডলার-বর্জনের রাজনৈতিক কৌশল থেকে দূরে সরিয়ে রেখে পারস্পরিক বাণিজ্যের খরচ কমানোর লক্ষ্যে জাতীয় মুদ্রা ও ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার ব্যবহারের ওপর বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছে। কুইন্সি ইনস্টিটিউটের গবেষক সারাং শিডোরে এই পরিস্থিতিকে বিশ্লেষণ করে ব্রিকসকে একটি 'অকার্যকর পরিবার' বা সীমিত উদ্দেশ্যের বাস্তববাদী ক্লাব হিসেবে অভিহিত করেছেন, কারণ মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে বিপরীত মেরুতে অবস্থান করা ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশগুলোও এই একই জোটের অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। অর্থাৎ, ভূ-রাজনৈতিক এবং নিরাপত্তা সংক্রান্ত মৌলিক বিষয়গুলোতে বড় ধরনের মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও কেবল অর্থনৈতিক টিকে থাকার লড়াই এবং মার্কিন চাপের মুখেই এই বৈচিত্র্যময় দেশগুলো একটি যৌথ মঞ্চে একত্রিত হতে বাধ্য হচ্ছে।

ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনীতি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গতিপ্রকৃতির ওপর ব্রিকস জোটের এই বর্তমান শীর্ষ সম্মেলনের সুদূরপ্রসারী ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রয়েছে, যা একক পরাশক্তির আধিপত্যভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থাকে চিরতরে বদলে দিতে পারে। ট্রাম্প প্রশাসনের একতরফা শুল্ক নীতি এবং অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার কৌশল যদি বৈশ্বিক দক্ষিণ গোলার্ধের (গ্লোবাল সাউথ) দেশগুলোকে বিকল্প অর্থনৈতিক ব্লক গঠনে আরও বেশি উৎসাহিত করে, তবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে ডলারের ঐতিহ্যগত আধিপত্য মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে, আঞ্চলিক বৈরিতা ভুলে চীন, রাশিয়া এবং ভারতের মতো বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর কাছাকাছি আসা মার্কিন পররাষ্ট্র নীতির জন্য একটি বড় ভূ-রাজনৈতিক ধাক্কা হিসেবে দেখা দিতে পারে। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈসাদৃশ্য, পারস্পরিক আস্থার সংকট এবং স্বার্থের সংঘাত পেরিয়ে এই জোট কতটা দীর্ঘস্থায়ী ও কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়। শেষ পর্যন্ত, মার্কিন অর্থনৈতিক চাপের বিরুদ্ধে ব্রিকস জোট বিকল্প কোনো টেকসই ও ঐক্যবদ্ধ অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেম গড়ে তুলতে সক্ষম হয় নাকি কেবল মতপার্থক্যের বেড়াজালে আবদ্ধ একটি আলগা মঞ্চ হিসেবেই টিকে থাকে, তা নির্ধারিত হবে বিশ্ব রাজনীতির আগামী দিনের গতি-প্রকৃতির ওপর ভিত্তি করেই।

Không có bình luận nào được tìm thấy


News Card Generator