আবাসন খাতের অন্ধকার জগৎ: দুর্নীতি ও প্রতারণার জালে ক্রেতা-সরকার | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আবাসন খাতের অন্ধকার জগৎ: দুর্নীতি ও প্রতারণার জালে ক্রেতা-সরকার

নাঈমুর রহমান  avatar   
নাঈমুর রহমান
আবাসন খাতের অন্ধকার জগৎ: দুর্নীতি ও প্রতারণার জালে ক্রেতা-সরকার
আবাসন খাতের অন্ধকার জগৎ: দুর্নীতি ও প্রতারণার জালে ক্রেতা-সরকার
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের আবাসন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলেও এটি দীর্ঘকাল ধরে দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রতারণার এক অন্ধকার জগতে নিমজ্জিত। সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু ...

বাংলাদেশের আবাসন খাত দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলেও এটি দীর্ঘকাল ধরে দুর্নীতি, অনিয়ম ও প্রতারণার এক অন্ধকার জগতে নিমজ্জিত। সাধারণ ক্রেতা থেকে শুরু করে সরকার পর্যন্ত সবাই এই খাতের অসাধু চক্রের শিকার। সাম্প্রতিক সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং অন্যান্য সংস্থার অভিযানে আবাসন খাতের গভীরে প্রোথিত দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, যা এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। বিশেষ করে রাজউক, ভূমি অফিস এবং কিছু অসাধু ডেভেলপার কোম্পানির যোগসাজশে প্লট জালিয়াতি, অনুমোদনহীন প্রকল্প, এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে।

রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) আবাসন খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলেও, এর ভেতরের দুর্নীতি ও অনিয়ম এখন ওপেন সিক্রেট। গত জুলাই ২০২৫-এ রাজউকের ইমারত পরিদর্শক তারিফুর রহমানের সীমাহীন দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হয়, যেখানে তার বিরুদ্ধে অর্থ-সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ আনা হয়। তিনি রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নামে-বেনামে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট কিনেছেন বলে জানা গেছে। এরও আগে, মে ২০২৫-এ দুদক রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমানসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে পাঁচ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার এবং পূর্বাচল কনভেনশন লিমিটেডে প্লট বরাদ্দে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে অনুসন্ধান শুরু করে। পূর্বাচল কনভেনশন লিমিটেডের নামে বরাদ্দকৃত প্লট নিয়মবহির্ভূত ও অবৈধভাবে নাম পরিবর্তন করে 'পূর্বাচল নীলা কনভেনশন লিমিটেড' করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। নভেম্বর ২০২৫-এ আদালতের পর্যবেক্ষণে বলা হয় যে, রাজউক সরকারি ভূমি বরাদ্দের ক্ষেত্রে বিধিবদ্ধ বিধান ও প্রক্রিয়া ক্রমাগত এবং ইচ্ছাকৃতভাবে লঙ্ঘন করেছে এবং বিশেষ সুবিধাভোগী ব্যক্তিদের পক্ষে কাজ করেছে। এসব প্লট প্রধানমন্ত্রী ও তার পরিবারের সদস্য, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, ক্ষমতাসীন দলের জ্যেষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা, আমলা এবং অন্যান্য প্রভাবশালী ব্যক্তির পক্ষে বরাদ্দ হয়েছে। এছাড়া, টিআইবির এক গবেষণা প্রতিবেদনে নকশা অনুমোদনে রাজউক কর্মকর্তাদের ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ তথ্য হলো, ১৯৮৭ সালের পর হাউজিং কোম্পানিগুলো অন্তত ৭০টি প্রকল্পের লে-আউট জমা দিলেও রাজউক মাত্র ৫টি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছে, বাকি সব প্রকল্পই অনুমোদন ছাড়াই চলছে এবং অনেক ক্ষেত্রে খাল, বিল, পুকুর, চাষের জমি ইত্যাদি গ্রাস করেছে।

ভূমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াতেও দুর্নীতির ব্যাপকতা লক্ষণীয়। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ রাজধানীর তেজগাঁও সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দুদকের এনফোর্সমেন্ট টিম অভিযান চালিয়ে কোটি টাকার কর ফাঁকি দেওয়ার প্রাথমিক সত্যতা পায়। চুক্তি বা বায়না দলিলে জমির মূল্য ৩ কোটি টাকার বেশি উল্লেখ করা হলেও, চূড়ান্ত রেজিস্ট্রির সময় তা কমিয়ে মাত্র ১ কোটি ৬০ লাখ টাকার কাছাকাছি দেখানো হয় এবং ভিটে জমিকে 'নাল জমি' হিসেবে শ্রেণি পরিবর্তন দেখিয়ে মোটা অঙ্কের সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়। ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর হেলাল মার্চ ২০২৬-এ ভূমি অফিসের দুর্নীতি 'ওয়ান ডিজিটে' নামিয়ে আনার ঘোষণা দিলেও, বাস্তবতা ভিন্ন। ভূমি অফিসের দুর্নীতি রোধে অনলাইন ভূমি উন্নয়ন কর ব্যবস্থা চালু করা হলেও, মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নিয়মিত উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং দালালদের দৌরাত্ম্য কমানো এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। নভেম্বর ২০২৫-এ আইন কমিশনের চেয়ারম্যান বিচারপতি জিনাত আরা জমির শ্রেণি প্রতারণামূলকভাবে পরিবর্তন করে কর ফাঁকি দিলে শাস্তির বিধান রাখার প্রস্তাব করেছেন। এছাড়া, ভূমি অফিসের দুর্নীতিতে দালালদের সিন্ডিকেট একটি বড় ভূমিকা রাখে, যা ঢাকা রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানেও বিদ্যমান।

প্লট ও ফ্ল্যাট জালিয়াতি এবং আবাসন কোম্পানির প্রতারণা ক্রেতাদের জন্য এক বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতা। আগস্ট ২০২৫-এ সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ও রাজউকের সাবেক চেয়ারম্যানসহ ৮ জনের বিরুদ্ধে প্লট জালিয়াতির অভিযোগে মামলার সিদ্ধান্ত নেয় দুদক। রাজধানীতে ৬তলা বাড়ি থাকা সত্ত্বেও মিথ্যা হলফনামা দাখিল করে পূর্বাচল আবাসন প্রকল্পে প্লট নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। জুলাই ২০২৫-এ 'ভাইয়া গ্রুপ'-এর বিরুদ্ধে জমি না কিনেই প্রায় ৩ হাজার ২০০ প্লট বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। তারা পাইন সিটি (পূর্বাচল), টিউলিপ ভ্যালি (পূর্বাচল), বীরতারা সিটি (কেরানীগঞ্জ) সহ বিভিন্ন প্রকল্পের নামে অন্যের জমি নিজের দেখিয়ে বিক্রি করছে। জুলাই ২০২৬-এ সিআইডি প্লট বরাদ্দের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে ১৭ রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করে। অনেক হাউজিং কোম্পানি লোভনীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে গ্রাহকদের অধিক মুনাফা দেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে। জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ (জাগৃক)-এর ফ্ল্যাট বরাদ্দেও অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে, যেমন চট্টগ্রামের হালিশহর হাউজিং এস্টেটে জাগৃকের সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী শামসুল আলম এবং বরাদ্দ গ্রহীতা সগীর আহমেদ পরস্পর যোগসাজশে ২১ লাখ ৬৮ হাজার টাকা আত্মসাৎ করেছেন। সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ নিমতলা হাউজিং লিমিটেডের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করেছে। এছাড়াও, সরকারি কর্মীদের জন্য নির্মিত আবাসন প্রকল্পেও মানহীন নির্মাণ উপকরণ ব্যবহার এবং ঠিকাদারের দায়সারা কাজের কারণে ফ্ল্যাটগুলো বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে, যেমন মিরপুরের ৬০১ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ৫ বছর না পেরোতেই বেহাল হয়ে পড়েছে।

আবাসন খাতের এই সামগ্রিক দুর্নীতি ও অনিয়ম দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং জনগণের মৌলিক অধিকারকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ (Real Estate Development and Management Act, 2010) থাকা সত্ত্বেও এর সঠিক প্রয়োগের অভাবে অসাধু চক্র পার পেয়ে যাচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী জুলাই ২০২৬-এ আবাসন খাতকে দুর্নীতিমুক্ত করতে কাজ করার কথা বললেও, এই খাতের বর্তমান পরিস্থিতি সরকারের অঙ্গীকারের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। প্রস্তাবিত বাজেটে জমি বা ফ্ল্যাট মালিকের ওপর ১৫ শতাংশ মূলধনি কর আরোপের মতো সিদ্ধান্তে আবাসন খাত ধ্বংসের মুখে পড়ছে বলেও রিহ্যাব উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ভূমি ব্যবস্থাপনায় ডিজিটাল নজরদারি বাড়ানো হলেও, মাঠ পর্যায়ে এখনো ঘুষ, দুর্নীতি ও হয়রানির অভিযোগ বিদ্যমান।

সুপারিশ: আবাসন খাতের দুর্নীতি ও অনিয়ম রোধে অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা উচিত: ১. রাজউকসহ সকল নিয়ন্ত্রক সংস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং দুর্নীতির সাথে জড়িত কর্মকর্তাদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। ২. ভূমি রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করতে হবে, যাতে মানুষের সরাসরি অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন কমে এবং দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়। ৩. রিয়েল এস্টেট উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনা আইন, ২০১০ এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং অনুমোদনহীন প্রকল্পের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। ৪. আবাসন প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে হবে এবং সকল তথ্য জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করতে হবে। ৫. ক্রেতাদের সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং বিনিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন, জমির মালিকানা, প্রকল্পের অনুমোদন ও অর্থ লেনদেনের বৈধতা যাচাই করার জন্য একটি সহজলভ্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে হবে। ৬. সরকারি আবাসন প্রকল্পগুলোতে মানসম্মত নির্মাণ নিশ্চিত করতে কঠোর তদারকি ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং ঠিকাদারদের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। ৭. ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগের জন্য জেলা প্রশাসকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও ক্ষমতা প্রদান করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: নাঈমুর রহমান

নাঈমুর রহমান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: আবাসন খাত ও রিয়েল এস্টেট ক্রাইম।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator