শহরকেন্দ্রিক ক্রীড়া একাডেমি: গ্রামীণ প্রতিভার জন্য বন্ধ দুয়ার ও নষ্ট কোটি সুযোগ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

শহরকেন্দ্রিক ক্রীড়া একাডেমি: গ্রামীণ প্রতিভার জন্য বন্ধ দুয়ার ও নষ্ট কোটি সুযোগ

কামরুল ইসলাম  avatar   
কামরুল ইসলাম
শহরকেন্দ্রিক ক্রীড়া একাডেমি: গ্রামীণ প্রতিভার জন্য বন্ধ দুয়ার ও নষ্ট কোটি সুযোগ
শহরকেন্দ্রিক ক্রীড়া একাডেমি: গ্রামীণ প্রতিভার জন্য বন্ধ দুয়ার ও নষ্ট কোটি সুযোগ
ছবি: সংগৃহীত
গত বছর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক ঘোষিত 'ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২০২৩'-এর অধীনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনার মতো প্রধান শহরগুলোতে নতুন আটটি অত্যাধু...

গত বছর যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয় কর্তৃক ঘোষিত 'ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প-২০২৩'-এর অধীনে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনার মতো প্রধান শহরগুলোতে নতুন আটটি অত্যাধুনিক ক্রীড়া একাডেমি স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যার জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে দেশের ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নের এক গুরুত্বপূর্ণ ধাপ, যা পেশাদার ক্রীড়াবিদ তৈরিতে সহায়ক হবে। তবে, এই শহরকেন্দ্রিক বিনিয়োগের প্রবণতা গ্রামীণ বাংলাদেশের বিশাল প্রতিভার ভান্ডারকে আবারও উপেক্ষিত রাখছে। দেশের প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে যেখানে জন্ম নেয় হাজারো অদম্য প্রাণশক্তি, যাদের শারীরিক সক্ষমতা ও সহজাত ক্রীড়া নৈপুণ্য আন্তর্জাতিক মানদণ্ডেও উত্তীর্ণ হওয়ার সম্ভাবনা রাখে, সেখানে সুযোগের অভাব একটি দুর্ভেদ্য প্রাচীর তৈরি করেছে। এই একাডেমিগুলো শহরের দোরগোড়ায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলেও, গ্রামের তরুণদের জন্য তা যেন বন্ধ দুয়ারের প্রতিচ্ছবি, যা জাতীয় ক্রীড়া অঙ্গনে অসংখ্য উজ্জ্বল নক্ষত্রের জন্ম দেওয়ার কোটি কোটি সুযোগ নষ্ট করছে।

বাংলাদেশের ক্রীড়া উন্নয়নের ইতিহাসে শহরকেন্দ্রিক বিনিয়োগের এই ধারা নতুন নয়। ঐতিহ্যগতভাবে, ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, উন্নত স্টেডিয়াম এবং বিশেষায়িত একাডেমিগুলোর সিংহভাগই রাজধানী বা বিভাগীয় শহরগুলোতে গড়ে উঠেছে। এর ফলস্বরূপ, গ্রামীণ এলাকার একজন প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদের পক্ষে একটি মানসম্মত প্রশিক্ষণের সুযোগ পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। প্রথমত, ভৌগোলিক দূরত্ব একটি বড় বাধা। গ্রামের একজন কিশোর বা কিশোরীকে যদি প্রশিক্ষণের জন্য শহরে যেতে হয়, তবে তাকে কেবল যাতায়াতের ঝক্কিই পোহাতে হয় না, বরং শহরের ব্যয়বহুল জীবনযাত্রার মুখোমুখি হতে হয়। অধিকাংশ গ্রামীণ পরিবারের আর্থিক সঙ্গতি এতটুকু নয় যে তারা তাদের সন্তানদের শহরের কোনো একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের ব্যয়ভার বহন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, গ্রামীণ অঞ্চলে প্রশিক্ষিত কোচ ও প্রশিক্ষকের তীব্র অভাব রয়েছে। যারা প্রশিক্ষণ দিতে সক্ষম, তাদের অধিকাংশই শহরে উন্নত সুযোগ-সুবিধা ও ভালো বেতনের আশায় চলে যান। ফলে, গ্রামের তরুণরা সঠিক দিকনির্দেশনা ও কৌশলগত প্রশিক্ষণের অভাবে তাদের সহজাত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এমনকি, অনেক সময় মৌলিক ক্রীড়া সরঞ্জাম যেমন ফুটবল, ক্রিকেট ব্যাট বা খেলার মাঠের মতো ন্যূনতম অবকাঠামোও তাদের জন্য সহজলভ্য হয় না। এ যেন একটি অন্তহীন চক্র, যেখানে সুযোগের অভাব আরও সুযোগের অভাব তৈরি করে, আর প্রতিভার অঙ্কুরেই বিনাশ ঘটে।

এই শহরকেন্দ্রিক একাডেমি মডেলের কারণে দেশ যে কেবল অগণিত প্রতিভাবান ক্রীড়াবিদ হারাচ্ছে তা নয়, বরং একটি বিশাল সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও নষ্ট হচ্ছে। গ্রামীণ যুবক-যুবতীদের মধ্যে খেলাধুলা একটি শক্তিশালী সামাজিক পরিবর্তন ও অর্থনৈতিক উন্নতির মাধ্যম হতে পারে। যখন একজন গ্রামীণ প্রতিভা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সফল হয়, তখন তা শুধু তার পরিবারকেই নয়, তার পুরো সম্প্রদায়কে অনুপ্রাণিত করে। এটি এলাকার অন্যান্য তরুণদের মধ্যে নতুন আশা জাগায় এবং তাদের বিপথে যাওয়া থেকে বিরত রাখে। খেলাধুলা সংশ্লিষ্ট অর্থনীতি (Sports Economy) আজ বিশ্বজুড়ে বিলিয়ন ডলারের শিল্প। গ্রামীণ ক্রীড়াবিদদের যদি সঠিক প্ল্যাটফর্ম দেওয়া যায়, তবে তারা কেবল দেশের প্রতিনিধিত্বই করবে না, বরং তাদের সাফল্যের মধ্য দিয়ে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, স্থানীয় অর্থনীতিতে গতি আসবে এবং ক্রীড়া পর্যটনের মতো নতুন খাত বিকশিত হতে পারে। 'World Bank' এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে যুবকদের মধ্যে ক্রীড়া অংশগ্রহণ বৃদ্ধি দারিদ্র্য বিমোচন ও মানবসম্পদ উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। অথচ, আমরা সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারছি না। 'বাংলাদেশ সরকার' যদি গ্রামীণ ক্রীড়া উন্নয়নে আরও মনোযোগ না দেয়, তবে দেশের ক্রীড়া অঙ্গন একটি নির্দিষ্ট গন্ডির মধ্যে আবদ্ধ থাকবে এবং বিশ্ব মঞ্চে আমাদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অধরাই থেকে যাবে। গ্রামীণ জনপদে লুকিয়ে থাকা প্রাকৃতিক শক্তি ও অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে যদি সঠিক পরিচর্যা দেওয়া যায়, তবে তা কেবল ক্রীড়াঙ্গন নয়, সমগ্র জাতির জন্য এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।

বিভাগ শহরকেন্দ্রিক ক্রীড়া একাডেমি সংখ্যা (আনুমানিক) গ্রামীণ অঞ্চলের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সংখ্যা (আনুমানিক) মোট প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ক্রীড়াবিদ (২০২২-২৩, আনুমানিক) গ্রামীণ অঞ্চলের প্রতিভার অনুপাত (%)
ঢাকা ২৫ ৫ ১২,০০০ ১০%
চট্টগ্রাম ১২ ৩ ৬,০০০ ১২%
খুলনা ৮ ২ ৩,০০০ ১৫%
রাজশাহী ৭ ৪ ২,৫০০ ২০%
সিলেট ৪ ১ ১,৫০০ ৮%
বরিশাল ৩ ১ ১,০০০ ১০%
রংপুর ৫ ২ ১,৮০০ ১৮%
ময়মনসিংহ ৩ ১ ৯০০ ১৩%

উৎস: যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকার এবং World Bank-এর ক্রীড়া উন্নয়ন প্রতিবেদন (২০২৩-এর প্রথমার্ধ)

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রণীত 'জাতীয় ক্রীড়া নীতি-২০২২' সংশোধন করে গ্রামীণ ক্রীড়া অবকাঠামো উন্নয়নে একটি সুনির্দিষ্ট ও বাধ্যতামূলক বাজেট বরাদ্দ নিশ্চিত করতে হবে। 'ক্রীড়া পরিদপ্তর' এর মাধ্যমে প্রতিটি উপজেলায় ন্যূনতম একটি প্রাথমিক ক্রীড়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য 'World Bank'-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা গ্রহণ করে একটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করা আবশ্যক। এই কেন্দ্রগুলোতে স্থানীয় প্রতিভাদের জন্য বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কে 'ADB'-এর সহায়তায় একটি দেশব্যাপী 'গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিভা অন্বেষণ ও উন্নয়ন প্রকল্প' চালু করতে হবে। এই প্রকল্পের আওতায় স্থানীয় স্কুল, কলেজ ও ইউনিয়ন পরিষদের সাথে সমন্বয় করে নিয়মিত প্রতিভা স্কাউটিং ক্যাম্প আয়োজন করতে হবে। নির্বাচিত প্রতিভাবানদের জন্য 'জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ' কর্তৃক পরিচালিত আবাসিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচির ব্যবস্থা করতে হবে, যেখানে তাদের শিক্ষা ও ক্রীড়া উভয় ক্ষেত্রেই সহায়তা প্রদান করা হবে।
  • সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে 'ক্রীড়া আইন-২০১৮'-এর অধীনে একটি নতুন উপধারা সংযোজন করতে হবে, যা গ্রামীণ অঞ্চলে ক্রীড়া একাডেমি স্থাপনে আগ্রহী বেসরকারি সংস্থা এবং উদ্যোক্তাদের জন্য উল্লেখযোগ্য কর ছাড় ও বিশেষ ভর্তুকি প্রদান করবে। এর মাধ্যমে 'বাংলাদেশ সরকার' এবং স্থানীয় সরকারের মধ্যে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে একটি টেকসই মডেল তৈরি হবে, যা বেসরকারি বিনিয়োগকে গ্রামীণ ক্রীড়া উন্নয়নে উৎসাহিত করবে এবং দীর্ঘমেয়াদী প্রশিক্ষণের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কামরুল ইসলাম

কামরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ঘরোয়া স্পোর্টস অবকাঠামো ও একাডেমি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator