কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?

অ্যাডভোকেট তানিয়া  avatar   
অ্যাডভোকেট তানিয়া
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন-এ আগামীর চ্যালেঞ্জ: প্রস্তুত কি বাংলাদেশ?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) যৌথ সমীক্ষার প্রাথমিক ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের কর্মজীবী জনগোষ্ঠী...

সম্প্রতি জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) যৌথ সমীক্ষার প্রাথমিক ফলাফল ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বাংলাদেশের কর্মজীবী জনগোষ্ঠীর মধ্যে উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং স্ট্রেস-সম্পর্কিত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রকোপ ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিশেষ করে, ডিজিটাল যুগে কর্মপরিবেশে দ্রুত পরিবর্তন, কাজের অতিরিক্ত চাপ, কর্ম-জীবনের ভারসাম্যহীনতা এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা বহু পেশাজীবীকে মানসিক সংকটের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি দেশের শ্রম উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে এবং একইসাথে বিদ্যমান শ্রম আইন ও কর্মপরিবেশ নীতিমালার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করছে। বাংলাদেশের শ্রম আইন কি এই নীরব মহামারী মোকাবিলায় প্রস্তুত? নাকি আগামীর চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় প্রয়োজন আরও সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ?

বাংলাদেশের শ্রম আইন, ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৯) মূলত শারীরিক নিরাপত্তা এবং কর্মপরিবেশের মৌলিক দিকগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করলেও, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি এতে সেভাবে গুরুত্ব পায়নি। যেমন, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি (বিশেষত যৌন হয়রানি) প্রতিরোধের জন্য কিছু বিধান থাকলেও, মানসিক চাপ বা বঞ্চনার কারণে সৃষ্ট মানসিক অসুস্থতা প্রতিরোধের জন্য সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদান বা চিকিৎসাজনিত ছুটির বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো ধারা নেই। ফলস্বরূপ, অনেক কর্মী মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগলেও প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা বা সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর অধীনে পরিচালিত বিভিন্ন জরিপে দেখা যায়, দেশের মানসিক স্বাস্থ্য সেবার অবকাঠামো এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে এবং কর্মক্ষেত্র-কেন্দ্রিক মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রায় অনুপস্থিত। কর্মীদের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাব এবং সামাজিক কলঙ্কের ভয়ও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে, যেখানে অনেকেই নিজেদের সমস্যা প্রকাশ করতে দ্বিধা বোধ করেন।

এই প্রেক্ষাপটে, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এবং রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR)-এর যৌথ উদ্যোগে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আরও নিবিড় গবেষণা ও নীতি প্রণয়ন জরুরি। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশ যেখানে কর্মক্ষেত্রে 'মেন্টাল হেলথ ফার্স্ট এইড' প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করছে এবং মানসিক স্বাস্থ্য পরিচর্যাকে সাধারণ স্বাস্থ্য পরিচর্যার অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করছে, সেখানে বাংলাদেশে এ বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এখনো সীমিত। যদিও ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) মানসিক স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণ ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করছে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা প্রতিরোধের ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা পরোক্ষ। প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রদানের কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায়, বেশিরভাগ নিয়োগকর্তা এ বিষয়ে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হচ্ছেন না। এটি দীর্ঘমেয়াদে কর্মীদের কর্মদক্ষতা হ্রাস, উৎপাদনশীলতা ব্যাহত হওয়া এবং সর্বোপরি জাতীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য পরিস্থিতি ও সংশ্লিষ্ট চ্যালেঞ্জ (বাংলাদেশ)
সূচক তথ্য উৎস
প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যেকোনো মানসিক ব্যাধির প্রকোপ ১৭.৩% (২০১৮-১৯ সালের জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য জরিপ অনুযায়ী) জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH)
উদ্বেগজনিত সমস্যায় ভোগা কর্মজীবীর অনুমিত হার ১৫-২০% (বিভিন্ন গবেষণার অনুমান) DGHS/NIMH সংশ্লিষ্ট গবেষণা
বিষণ্ণতা/অবসাদে ভোগা কর্মজীবীর অনুমিত হার ৫-১০% (বিভিন্ন গবেষণার অনুমান) DGHS/NIMH সংশ্লিষ্ট গবেষণা
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা কার্যক্রম রয়েছে এমন প্রতিষ্ঠানের হার ৫% এর কম (প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ) MOHFW/শ্রম মন্ত্রণালয় (অনানুষ্ঠানিক তথ্য)
প্রতি ১ লাখ মানুষের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সংখ্যা ০.৫-১ জন (যেমন, মনোরোগ বিশেষজ্ঞ) DGHS/NIMH

উৎস: জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH), স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের শ্রম আইন, ২০০৬-এর সংশোধন করে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে একটি বাধ্যতামূলক বিধান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এই সংশোধনীতে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা, স্ট্রেস ব্যবস্থাপনা প্রশিক্ষণ এবং মানসিক অসুস্থতাজনিত ছুটি প্রদানের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে, যা শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) যৌথভাবে প্রণয়ন করবে।
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এর যৌথ তত্ত্বাবধানে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সংক্রান্ত একটি জাতীয় নীতিমালা (National Workplace Mental Health Policy) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। এই নীতিমালায় নিয়োগকর্তাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকি নিরূপণ, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এবং কর্মীদের জন্য গোপনীয় কাউন্সেলিং সেবা প্রদানের বিস্তারিত গাইডলাইন অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
  • রোগ তত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (IEDCR) এবং ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) এর সহযোগিতায় কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা সম্পর্কিত ডেটা সংগ্রহ, গবেষণা এবং সচেতনতা বৃদ্ধিমূলক কর্মসূচী জোরদার করতে হবে। এর মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রকৃত চিত্র উন্মোচন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী কার্যকর হস্তক্ষেপমূলক কর্মসূচী গ্রহণ সহজ হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট তানিয়া

অ্যাডভোকেট তানিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator