আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের ব্যাংক খেলাপি ও ঋণ পুনরুদ্ধার আইন: তুলনামূলক বিশ্লেষণ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের ব্যাংক খেলাপি ও ঋণ পুনরুদ্ধার আইন: তুলনামূলক বিশ্লেষণ

অ্যাডভোকেট সাব্বির  avatar   
অ্যাডভোকেট সাব্বির
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের ব্যাংক খেলাপি ও ঋণ পুনরুদ্ধার আইন: তুলনামূলক বিশ্লেষণ
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের ব্যাংক খেলাপি ও ঋণ পুনরুদ্ধার আইন: তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত সর্বশেষ আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লা...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ ব্যাংক প্রকাশিত সর্বশেষ আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৬৩৩ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৯.৬৯ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং দেশের অর্থনীতির জন্য এক গভীর উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরে। আন্তর্জাতিক মঞ্চে যখন বিভিন্ন দেশ তাদের ঋণ পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে আরও শক্তিশালী ও গতিশীল করছে, তখন বাংলাদেশের বর্তমান আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এই ক্রমবর্ধমান খেলাপি ঋণের বোঝা সামলাতে কতটা সক্ষম, তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। বিশেষ করে, সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর উচ্চ খেলাপি ঋণের হার সামগ্রিক চিত্রকে আরও জটিল করে তুলেছে।

বাংলাদেশের ব্যাংক খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের প্রধান আইন হলো 'অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩'। এই আইনটি খেলাপি ঋণ আদায়ে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রণীত হলেও, এর কার্যকারিতা নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে বিতর্ক বিদ্যমান। আইনটির অধীনে মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রিতা, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ, এবং ঋণগ্রহীতাদের বিভিন্ন কৌশলগত কারণে অনেক সময়ই ব্যাংকগুলো সময়মতো তাদের পাওনা আদায় করতে পারে না। উদাহরণস্বরূপ, একটি ঋণ মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তিতে বছরের পর বছর লেগে যায়, যা আদায় প্রক্রিয়াকে স্থবির করে তোলে। এছাড়া, জামানত বাজেয়াপ্তকরণ ও বিক্রয় প্রক্রিয়াও প্রায়শই জটিল আইনি মারপ্যাঁচে আটকে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক তার বিভিন্ন সার্কুলারের মাধ্যমে ঋণ শ্রেণিকরণ ও প্রভিশনিংয়ের নীতিমালা কঠোর করার চেষ্টা করলেও, আইনি দুর্বলতা এবং বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জের কারণে প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায় না। বিশেষ করে, বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়াগুলো আরও জটিল আকার ধারণ করে, যেখানে প্রভাবশালী ঋণখেলাপিরা প্রায়শই আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে পার পেয়ে যান। BIBM-এর একাধিক গবেষণাপত্রেও অর্থঋণ আদালত আইনের কার্যকারিতা এবং এর বাস্তবায়নগত চ্যালেঞ্জগুলো বারবার উঠে এসেছে, যা প্রমাণ করে যে বিদ্যমান আইনি কাঠামোতে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে, খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারে ভিন্ন ভিন্ন দেশের আইন ও প্রয়োগ পদ্ধতি বেশ শক্তিশালী। ভারতের 'ইনসলভেন্সি অ্যান্ড ব্যাংকরাপসি কোড, ২০১৬' (IBC) এবং 'সারফেসাই অ্যাক্ট, ২০০২' (SARFAESI Act) খেলাপি ঋণ আদায়ে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। IBC-এর অধীনে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ঋণ পরিশোধে ব্যর্থ কোম্পানিগুলোর জন্য কর্পোরেট ইনসলভেন্সি রেজোলিউশন প্রসেস (CIRP) সম্পন্ন করা হয়, যা দ্রুত নিষ্পত্তি ও সম্পদ পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে। একইভাবে, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতেও দেউলিয়া আইন এবং বিশেষায়িত ঋণ পুনরুদ্ধার ট্রাইব্যুনালগুলো অত্যন্ত কার্যকর। এই দেশগুলোতে ঋণগ্রহীতার দেউলিয়াত্ব ঘোষণা এবং জামানত বাজেয়াপ্তকরণের প্রক্রিয়া তুলনামূলকভাবে দ্রুত ও কার্যকর। বিপরীতে, বাংলাদেশের 'দেউলিয়া আইন, ১৯৯৭' এখনো আধুনিক আন্তর্জাতিক মানের ধারেকাছেও নেই এবং এটি কার্যত অকার্যকর। আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ এই আইনের সংস্কারের জন্য কাজ করলেও, এর বাস্তবায়ন এখনও অনেক দূরে। এর ফলে, ব্যাংকগুলো, বিশেষ করে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো, বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়ে, যা তাদের মূলধন পর্যাপ্ততা এবং তারল্য ব্যবস্থাপনাকে মারাত্মকভাবে প্রভাবিত করে। আইনি জটিলতা এবং দ্রুত নিষ্পত্তির অভাব শুধু ব্যাংকের আর্থিক স্বাস্থ্যের ওপরই প্রভাব ফেলে না, বরং দেশের সামগ্রিক বিনিয়োগ পরিবেশকেও নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে।

সাল মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ (কোটি টাকা) মোট ঋণের শতাংশ সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ (কোটি টাকা) বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ (কোটি টাকা)
২০২১ (ডিসেম্বর) ১,০৩,২৭৪ ৭.৯৩% ৪৫,৬৪৮ ৫৩,৯৬৪
২০২২ (ডিসেম্বর) ১,২০,৬৫৮ ৮.১৬% ৫৭,৯৫৮ ৫৮,৬২২
২০২৩ (সেপ্টেম্বর) ১,৫৫,০৪২ ৯.৯৩% ৭২,৭৬৩ ৭৩,১৫৮
২০২৩ (ডিসেম্বর) ১,৪৫,৬৩৩ ৯.৬৯% ৬৮,১৫৫ ৬৯,৫৬৬

উৎস: বাংলাদেশ ব্যাংক (বিভিন্ন ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন)

সুপারিশ

  • 'অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩'-এর অবিলম্বে ব্যাপক সংস্কার সাধন করতে হবে, যার মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির জন্য কঠোর সময়সীমা নির্ধারণ, উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশের অপব্যবহার রোধে সুনির্দিষ্ট বিধান সংযোজন, এবং জামানত বাজেয়াপ্তকরণ ও বিক্রয়ের প্রক্রিয়াকে আরও সরল ও দ্রুত করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা অপরিহার্য।
  • আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগকে দ্রুত একটি আধুনিক ও কার্যকর 'দেউলিয়া আইন' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে, যা ভারতের IBC-এর মতো একটি সময়বদ্ধ ও স্বচ্ছ কাঠামো অনুসরণ করবে। একইসাথে, বাংলাদেশ ব্যাংককে ঋণ শ্রেণিকরণ এবং প্রভিশনিং নীতিমালা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে সরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকসহ সকল ব্যাংকের জন্য কঠোরভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
  • খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধারের জন্য একটি স্বাধীন 'সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি' (Asset Management Company - AMC) গঠনের বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত, যা ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে খেলাপি ঋণ ক্রয় করে বিশেষায়িত দক্ষতার মাধ্যমে আদায় করবে। BIBM-এর গবেষণা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এই AM C-এর কাঠামো ও কার্যপদ্ধতি নির্ধারণ করা যেতে পারে, যা ব্যাংকগুলোর ব্যালেন্স শীট পরিষ্কার করতে এবং নতুন ঋণ বিতরণে উৎসাহিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট সাব্বির

অ্যাডভোকেট সাব্বির 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্যাংক খেলাপি ও ঋণ পুনরুদ্ধার আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No comments found


News Card Generator