অপ্রকাশিত সত্য: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অপ্রকাশিত সত্য: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

জাবীর হোসেন  avatar   
জাবীর হোসেন
অপ্রকাশিত সত্য: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
অপ্রকাশিত সত্য: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
অপ্রকাশিত সত্য: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

অপ্রকাশিত সত্য: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ নিয়ে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন

সম্প্রতি পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের ‘বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য কৌশল ও কর্মপরিকল্পনা ২০৩০’ এর খসড়া পর্যালোচনায় উঠে এসেছে যে, গত এক দশকে বাংলাদেশের বনভূমি ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বেশ কিছু নীতি ও আইনের প্রণয়ন ঘটলেও মাঠ পর্যায়ে তার বাস্তবায়ন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। বিশেষ করে, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের আশেপাশের কৃষি জমির সম্প্রসারণ এবং শিল্পায়নের চাপ জীববৈচিত্র্যের উপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। উদাহরণস্বরূপ, সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী এলাকায় লবণাক্ততা সহনশীল ধানের জাত প্রবর্তনে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর সাফল্য একদিকে কৃষকদের জীবনযাত্রায় স্বস্তি আনলেও, অন্যদিকে এর ব্যাপক প্রচলন স্থানীয় জলাভূমি ও ম্যানগ্রোভ বনের প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব ফেলছে, যা পরিবেশবিদদের মধ্যে নতুন উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।

বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ের অভাব একটি প্রকট সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) প্রায়শই উচ্চফলনশীল একজাতীয় ফসলের চাষাবাদে কৃষকদের উৎসাহিত করে, যা স্থানীয় বনজ উদ্ভিদের বৈচিত্র্য এবং বন্যপ্রাণীর খাদ্য শৃঙ্খলকে ব্যাহত করে। শস্যের রোগবালাই দমনে রাসায়নিক কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার পার্শ্ববর্তী বনাঞ্চলের মাটি ও পানির গুণগত মানকে প্রভাবিত করছে, যার ফলে বহু ক্ষুদ্র অণুজীব, পতঙ্গ এবং পরাগায়নকারী প্রজাতির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং BRRI যদিও পরিবেশবান্ধব কৃষি পদ্ধতির উপর গবেষণা চালাচ্ছে, কিন্তু তাদের উদ্ভাবিত জৈব কৃষি পদ্ধতি বা দেশীয় প্রজাতির সংরক্ষণ কৌশল DAE-এর মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকদের কাছে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে দৃশ্যমান ঘাটতি রয়েছে। ফলস্বরূপ, বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশের উপর কৃষিকাজের বিরূপ প্রভাব কমানো যাচ্ছে না, যা দীর্ঘমেয়াদী জীববৈচিত্র্য ক্ষয়কে ত্বরান্বিত করছে।

অন্যদিকে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) বিভিন্ন কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয় সাধনের দায়িত্বে থাকলেও, বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কৃষি খাতের ভূমিকা নিয়ে তাদের কৌশলগত পরিকল্পনা এখনো যথেষ্ট শক্তিশালী নয়। সংরক্ষিত বনাঞ্চলের পার্শ্ববর্তী এলাকার ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনায় কৃষি মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সংলাপ ও সমন্বয়ের অভাব স্পষ্ট। এর ফলে, এক দিকে পরিবেশ মন্ত্রণালয় বনাঞ্চল রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নিলেও, অন্য দিকে কৃষি সম্প্রসারণের নামে বনের প্রান্তিক ভূমি ও জলাভূমিগুলো কৃষিকাজে রূপান্তরিত হচ্ছে। এটি কেবল জীববৈচিত্র্য হ্রাস করছে না, বরং বন্যপ্রাণী ও মানুষের মধ্যে সংঘাতের ঘটনাও বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় বিরূপ প্রভাব ফেলছে এবং বন সংরক্ষণের সামগ্রিক প্রচেষ্টাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

সংরক্ষণ ক্ষেত্র ২০১৫ সালের বন আচ্ছাদন (%) ২০২৩ সালের বন আচ্ছাদন (%) জীববৈচিত্র্য হটস্পট ক্ষয় (%) DAE-এর পরিবেশবান্ধব কৃষি প্রকল্পের আওতা (%)
সুন্দরবন ৪৪.৫ ৪২.৮ ২.২ ০.৮
সিলেট অঞ্চলের বন ২৯.২ ২৬.৫ ৪.১ ০.৫
চট্টগ্রাম পাহাড়ি বন ৩৮.১ ৩৫.৯ ৩.৬ ০.৬
মধুপুর গড় ১২.৩ ১০.৭ ৬.৫ ০.৩

উৎস: পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও DAE-এর যৌথ সমীক্ষা প্রতিবেদন, ২০২৪ (প্রাথমিক তথ্য)

সুপারিশ

  • পরিবেশ মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে ‘বাংলাদেশ বন আইন, ২০১৯’ (প্রস্তাবিত/সংশোধিত) এর আওতায় একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যেখানে DAE, BARI, BRRI এবং BARC এর প্রতিনিধিরা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। এই টাস্কফোর্সের প্রধান কাজ হবে সংরক্ষিত বনাঞ্চল ও এর পার্শ্ববর্তী কৃষি এলাকার জন্য সমন্বিত ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং কৃষি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের নীতিমালা কঠোরভাবে প্রয়োগ করা।
  • BARC-কে তার গবেষণা অগ্রাধিকার তালিকায় বন ও কৃষি বাস্তুতন্ত্রের আন্তঃসম্পর্ক এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে কৃষি খাতের ইতিবাচক ভূমিকা নিয়ে সুনির্দিষ্ট গবেষণা প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। BARI ও BRRI এর মাধ্যমে স্থানীয় কৃষি-বনজ (Agroforestry) প্রজাতির উন্নয়ন এবং দেশীয় ফসলের জাত সংরক্ষণে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে, যা DAE এর মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে ‘জাতীয় কৃষি নীতি, ২০১৮’ এর জীববৈচিত্র্য সম্পর্কিত ধারাগুলো অনুসরণ করে।
  • DAE-কে ‘জাতীয় কৃষি সম্প্রসারণ নীতি, ২০১৫’ এর আলোকে একটি বিশেষ ‘জীববৈচিত্র্য-বান্ধব কৃষি সম্প্রসারণ কর্মসূচি’ চালু করতে হবে, যা বনাঞ্চলের নিকটবর্তী কৃষকদের রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে জৈব কৃষি এবং স্থানীয় প্রজাতির ফসল চাষে উৎসাহিত করবে। এই কর্মসূচির আওতায় পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় স্থানীয় বন্যপ্রাণী ও উদ্ভিদের গুরুত্ব সম্পর্কে কৃষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাবীর হোসেন

জাবীর হোসেন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: বন ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

לא נמצאו הערות


News Card Generator