যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য বিভাগ (Commerce Department) ২০২৩ সালের অক্টোবরে চীনের নির্দিষ্ট কিছু উন্নত সেমিকন্ডাক্টর এবং চিপ তৈরির যন্ত্রপাতির উপর নতুন রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ আরোপের ঘোষণা দিয়েছে, যা বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক অবিলম্বে 'অর্থনৈতিক জবরদস্তি' হিসেবে তীব্র নিন্দা কুড়িয়েছে। এই পদক্ষেপটি কেবল প্রযুক্তিগত প্রতিযোগিতার একটি নতুন পর্যায় নয়, বরং এটি বিশ্ব অর্থনীতির উপর গভীর প্রভাব ফেলছে, যা যুক্তরাষ্ট্র-চীন অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের জটিল বাস্তবতা তুলে ধরে।
এই সর্বশেষ বাণিজ্য বিধিনিষেধের মূল লক্ষ্য হলো চীনের সামরিক আধুনিকীকরণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) সক্ষমতাকে সীমিত করা। ওয়াশিংটন যুক্তি দিচ্ছে যে, এই প্রযুক্তিগুলো চীনের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করতে পারে। এই নিষেধাজ্ঞার ফলে চীনের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান যেমন হুয়াওয়ে এবং সেমিকন্ডাক্টর ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্টারন্যাশনাল কর্পোরেশন (SMIC) সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা তাদের উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং উৎপাদন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। এর প্রতিক্রিয়ায়, চীন তার 'দ্বৈত সঞ্চালন' (Dual Circulation) অর্থনৈতিক কৌশলকে আরও জোরদার করেছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা এবং প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরশীলতার উপর অধিক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। 'মেড ইন চায়না ২০২৫' (Made in China 2025) উদ্যোগের মাধ্যমে বেইজিং দেশীয় সেমিকন্ডাক্টর শিল্পে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছে, যার লক্ষ্য হলো ২০২৫ সালের মধ্যে মূল প্রযুক্তিতে ৭০% স্বনির্ভরতা অর্জন করা। এই প্রযুক্তিগত বিচ্ছিন্নতার প্রচেষ্টা বৈশ্বিক সাপ্লাই চেইনে নতুন করে বিভাজন সৃষ্টি করছে এবং প্রতিটি দেশকেই তাদের কৌশল পুনর্বিবেচনা করতে বাধ্য করছে।
এই অর্থনৈতিক স্নায়ুযুদ্ধের প্রভাব শুধু দুই বৃহৎ অর্থনীতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং এর ঢেউ আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উপরও আছড়ে পড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের 'ফ্রেন্ড-শোরিং' (friend-shoring) বা 'ডি-রিস্কিং' (de-risking) নীতি অনুসরণ করতে উৎসাহিত করছে, যার অর্থ হলো চীনের উপর নির্ভরতা কমিয়ে মিত্র দেশগুলো থেকে পণ্য ও পরিষেবা সংগ্রহ করা। এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে, যারা উভয় পরাশক্তির সঙ্গেই অর্থনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে আগ্রহী। উদাহরণস্বরূপ, BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) এর সদস্য দেশগুলো আঞ্চলিক বাণিজ্য এবং সংযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা তাদের এই প্রচেষ্টাকে জটিল করে তুলছে। সদস্য দেশগুলো প্রায়শই অবকাঠামো উন্নয়ন এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরের জন্য বেইজিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) এর দিকে ঝুঁকে পড়ে, অন্যদিকে ওয়াশিংটন তার 'বিল্ড ব্যাক বেটার ওয়ার্ল্ড' (Build Back Better World - B3W) বা পরবর্তীতে 'পার্টনারশিপ ফর গ্লোবাল ইনফ্রাস্ট্রাকচার অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট' (PGII) এর মাধ্যমে বিকল্প প্রস্তাব দিচ্ছে। এই দ্বৈত চাপ BIMSTEC-এর মতো আঞ্চলিক জোটগুলোর মধ্যে ঐক্যমত্য তৈরি এবং একটি সমন্বিত অর্থনৈতিক নীতি গ্রহণকে আরও কঠিন করে তুলেছে। একইভাবে, সার্ক (SAARC) অঞ্চলের দেশগুলোও এই ভূ-রাজনৈতিক টানাপোড়েনের শিকার হচ্ছে, যেখানে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজন এবং দুর্বল আঞ্চলিক সহযোগিতা বহিরাগত অর্থনৈতিক চাপ মোকাবেলায় তাদের সক্ষমতাকে আরও হ্রাস করছে।
ভূ-রাজনৈতিক প্রভাবের দিক থেকে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের অর্থনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা আন্তর্জাতিক ফোরামে তাদের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতায় রূপান্তরিত হয়েছে। উভয় দেশই উন্নয়নশীল দেশগুলোকে অর্থনৈতিক সহায়তা, অবকাঠামো প্রকল্প এবং ঋণ প্রদানের মাধ্যমে নিজেদের শিবিরে টানার চেষ্টা করছে। এর ফলস্বরূপ, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশন (UN Peacekeeping Operations) এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে সদস্য দেশগুলোর ভোটদান এবং নীতি নির্ধারণে এই অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। জাতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (Ministry of Foreign Affairs) গুলোকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এই ভারসাম্য বজায় রাখতে হচ্ছে, যাতে কোনো এক পক্ষের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতা অন্য পক্ষের সঙ্গে সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। অনেক দেশই তাদের পররাষ্ট্রনীতিতে 'মাল্টি-ভেক্টর অ্যাপ্রোচ' (multi-vector approach) অবলম্বন করছে, যেখানে তারা উভয় পরাশক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজেদের জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখতে চাইছে। এই অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি আস্থা, বাণিজ্য নিয়মাবলী এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলেছে, যা বিশ্বব্যাপী স্থিতিশীলতার জন্য একটি নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করছে।
| সাল | যুক্তরাষ্ট্রের চীন থেকে আমদানি (বিলিয়ন USD) | যুক্তরাষ্ট্রের চীনে রপ্তানি (বিলিয়ন USD) | যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি (বিলিয়ন USD) |
|---|---|---|---|
| ২০২০ | ৪৩৪.৭ | ১২৪.৯ | ৩০৯.৮ |
| ২০২১ | ৫২৯.৬ | ১৫১.১ | ৩৭৮.৫ |
| ২০২২ | ৫৩৬.৮ | ১৫৩.৮ | ৩৮৩.০ |
উৎস: ইউ.এস. সেন্সাস ব্যুরো, চায়না জেনারেল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফ কাস্টমস
সুপারিশ
- BIMSTEC (Bay of Bengal Initiative for Multi-Sectoral Technical and Economic Cooperation) কে অবশ্যই তার "BIMSTEC Free Trade Area Framework Agreement" এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করতে হবে এবং একটি আঞ্চলিক সরবরাহ শৃঙ্খল স্থিতিস্থাপকতা তহবিল (Regional Supply Chain Resilience Fund) প্রতিষ্ঠা করতে হবে। এর মাধ্যমে সদস্য দেশগুলো অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বৈচিত্র্যকরণে মনোযোগ দিতে পারবে এবং গুরুত্বপূর্ণ পণ্য ও প্রযুক্তির জন্য বহিরাগত পরাশক্তির উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা হ্রাস করতে পারবে, যা এই জোটের সম্মিলিত দর কষাকষির ক্ষমতাকে বৃদ্ধি করবে।
- বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি সুসংহত "কৌশলগত অর্থনৈতিক কূটনীতি নীতিমালা" (Strategic Economic Diplomacy Doctrine) তৈরি করতে হবে, যা ওয়াশিংটন এবং বেইজিং উভয় পক্ষের সঙ্গেই সক্রিয় ও ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার উপর জোর দেবে। এই নীতিমালায় প্রধান পরাশক্তি এবং আঞ্চলিক জোটগুলোর জন্য নিবেদিত 'অর্থনৈতিক কৌশল ডেস্ক' (Economic Strategy Desks) প্রতিষ্ঠা অন্তর্ভুক্ত থাকবে, যা পরিবর্তিত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সক্ষম হবে।
- সার্ক (SAARC) অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোকে সম্মিলিতভাবে একটি "সার্ক আঞ্চলিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রক্রিয়া" (SAARC Regional Economic Stability Mechanism) প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করতে হবে, যা বহিরাগত অর্থনৈতিক ধাক্কা এবং চাপ মোকাবেলায় সহায়তা করবে। এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন (UN Peacekeeping) সহ আন্তর্জাতিক ফোরামে একটি সমন্বিত অবস্থান গ্রহণ করা সম্ভব হবে, যাতে অর্থনৈতিক দুর্বলতা স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি বা মানবিক অঙ্গীকারকে প্রভাবিত করতে না পারে।