আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার: তুলনামূলক বিশ্লেষণ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার: তুলনামূলক বিশ্লেষণ

ড. জহিরুল ইসলাম  avatar   
ড. জহিরুল ইসলাম
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার: তুলনামূলক বিশ্লেষণ
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার: তুলনামূলক বিশ্লেষণ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF) এবং একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার যৌথ প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগ...

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (WEF) এবং একটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থার যৌথ প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে বাংলাদেশ থেকে উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতা অর্জনের পর বিদেশে স্থায়ী হওয়া প্রতিভাবানদের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে, যা দেশের মানবসম্পদ বিকাশের ক্ষেত্রে এক গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে উচ্চতর ডিগ্রিধারী ও অভিজ্ঞ পেশাজীবীদের ক্রমবর্ধমান বহির্গমন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও উদ্ভাবনী সক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। এই প্রবণতা কেবল শ্রমশক্তির ঘাটতি তৈরি করছে না, বরং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গবেষণা ও উন্নয়নের সুযোগ সীমিত করে দিচ্ছে, যা বাংলাদেশের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করছে। এই চিত্র দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা, কর্মসংস্থান নীতি এবং মেধা ধরে রাখার সক্ষমতার ক্ষেত্রে একটি কাঠামোগত পর্যালোচনার প্রয়োজনীয়তা নির্দেশ করে, যেখানে মেধাবীরা কেন স্বদেশে ফিরতে বা থাকতে উৎসাহিত হচ্ছেন না, সেই মৌলিক প্রশ্নটিই মূল আলোচ্য বিষয়।

বাংলাদেশের মেধা পাচারের মূল কারণগুলো বহুস্তরীয় এবং পরস্পর সংযুক্ত। প্রথমত, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং সুযোগের অভাব একটি বড় কারণ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও, গবেষণা অনুদান, আধুনিক ল্যাবরেটরি সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা সুযোগের সীমাবদ্ধতা মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিদেশে পাড়ি দিতে উৎসাহিত করে। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা-বান্ধব পরিবেশের অভাব এবং শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগের দুর্বলতা শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে পূর্ণতা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলস্বরূপ, শিক্ষার্থীরা উন্নততর গবেষণা পরিবেশ, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি এবং বিশ্বমানের শিক্ষকের সান্নিধ্য লাভের আশায় পশ্চিমা দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছে। এই প্রবণতা কেবল নতুন জ্ঞান সৃষ্টিতে বাধা দিচ্ছে না, বরং দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে বৈশ্বিক র‍্যাঙ্কিংয়ে পিছিয়ে রাখছে, যা আরও বেশি মেধাবীকে বিদেশমুখী করছে। এছাড়া, শিক্ষকদের জন্য উন্নত প্রশিক্ষণের অভাব এবং গবেষণাভিত্তিক ক্যারিয়ার পাথওয়ে সুস্পষ্ট না থাকাও মেধা পাচারের একটি অন্তর্নিহিত কারণ হিসেবে কাজ করছে। অনেক শিক্ষকও উন্নত গবেষণা এবং পেশাগত উন্নতির জন্য বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থায়ী হচ্ছেন।

দ্বিতীয়ত, দেশে মানসম্মত কর্মসংস্থান ও ক্যারিয়ার অগ্রগতির সুযোগের সীমাবদ্ধতা মেধা পাচারের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলেও, সেগুলো প্রায়শই বাজারের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে অথবা উচ্চশিক্ষিত পেশাদারদের জন্য কাঙ্ক্ষিত সুযোগ তৈরি করতে পারছে না। বিশেষ করে, প্রকৌশল, চিকিৎসা, তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান-ভিত্তিক গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে উচ্চ বেতনের এবং মর্যাদাপূর্ণ কাজের অভাব প্রকট। সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতেই মেধার সঠিক মূল্যায়ন এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতার অভাব অনেক মেধাবীকে হতাশাগ্রস্ত করে তুলছে। উন্নত বেতন-ভাতা, কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং পেশাগত বিকাশের সুস্পষ্ট পথ না থাকায় মেধাবীরা উন্নত দেশগুলোতে স্থায়ী হতে আগ্রহী হচ্ছেন। এমনকি, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রোগ্রাম, যেমন স্কিলস ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (SEIP), যার লক্ষ্য ছিল দক্ষতা বৃদ্ধি করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা, তার আওতায় প্রশিক্ষিত অনেকেই দেশের অভ্যন্তরে কাঙ্ক্ষিত কাজ না পেয়ে বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এটি প্রমাণ করে যে, কেবল দক্ষতা তৈরি করাই যথেষ্ট নয়, বরং সেই দক্ষতার সঠিক ব্যবহার এবং মূল্যায়ন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এই পরিস্থিতি দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং সামাজিক অগ্রগতির পথে বড় বাধা সৃষ্টি করছে, কারণ দেশের সবচেয়ে উদ্ভাবনী ও গতিশীল মস্তিষ্কের একটি বড় অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে।

তৃতীয়ত, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অভাব এবং সুশাসনের দুর্বলতাও মেধা পাচারের একটি পরোক্ষ কিন্তু শক্তিশালী কারণ। অনেক মেধাবী পেশাজীবী এবং তাদের পরিবার উন্নত জীবনযাত্রার মান, নিরাপদ পরিবেশ এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বিদেশে পাড়ি জমানোকে অধিক নিরাপদ মনে করেন। দেশে মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের পথে প্রতিবন্ধকতা, স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির বিস্তার মেধাবীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করে। দেশের শিক্ষা ও গবেষণার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত বিনিয়োগের অভাব এবং মেধাবীদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি না হওয়ায়, তারা উন্নত জীবনযাপন, উচ্চতর আয় এবং পেশাগত নিরাপত্তার জন্য বিদেশকে বেছে নিচ্ছেন। এই প্রবণতা দেশের দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন এবং সামাজিক উন্নয়নের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে, দেশের স্বাস্থ্যখাত, প্রকৌশল খাত এবং শিক্ষাখাত থেকে মেধাবী চিকিৎসকদের, প্রকৌশলীদের এবং গবেষকদের বহির্গমন দেশের সেবা খাতগুলোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। পাশের দেশ ভারত ও চীন তাদের মেধাবীদের দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য বিভিন্ন প্রণোদনা ও সুযোগ সৃষ্টি করলেও, বাংলাদেশে এ ধরনের কার্যকর নীতিমালার অভাব পরিলক্ষিত হয়। এই তুলনামূলক প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশের জন্য মেধা পাচার রোধে একটি সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী কৌশল গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক, যা কেবল অর্থনৈতিক সুযোগ নয়, বরং সামাজিক নিরাপত্তা ও মেধার সঠিক মূল্যায়নের বিষয়গুলিও অন্তর্ভুক্ত করবে।

খাত/সময়কাল বিদেশে পাড়ি জমানো পেশাজীবীর সংখ্যা (আনুমানিক) প্রধান গন্তব্য দেশ মূল কারণ
২০১৮-২০২৩ (উচ্চশিক্ষিত) ১,৫০,০০০+ (শিক্ষার্থী ও গবেষক) যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি উন্নত গবেষণা ও শিক্ষার সুযোগ, জীবনযাত্রার মান
২০১৮-২০২৩ (চিকিৎসক) ১৫,০০০+ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্য, কানাডা উচ্চ বেতন, উন্নত কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা
২০১৮-২০২৩ (প্রকৌশলী ও আইটি পেশাজীবী) ৪০,০০০+ যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনের সুযোগ, উচ্চ আয়, পেশাগত বিকাশ
২০১৮-২০২৩ (দক্ষ কর্মী, কারিগরি) ৩,০০,০০০+ মধ্যপ্রাচ্য, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর উচ্চ মজুরি, কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাব

উৎস: জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (BMET), বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা এবং বাংলাদেশ ব্যাংক-এর রেমিটেন্স প্রবাহ সংক্রান্ত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ।

সুপারিশ

  • প্রথমত, দেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং একটি শক্তিশালী 'জাতীয় গবেষণা ও উদ্ভাবন তহবিল' (National Research and Innovation Fund) গঠন করা উচিত। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC)-কে এই তহবিলের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অত্যাধুনিক গবেষণাগার স্থাপন, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রকল্প পরিচালনা এবং পিএইচডি ও পোস্ট-ডক্টরাল ফেলোশিপের সংখ্যা ও আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সাথে, 'জাতীয় শিক্ষা আইন'-এর অধীনে গবেষণা প্রকাশনার জন্য শিক্ষকদের প্রণোদনা বাড়ানো এবং শিল্প-একাডেমিয়া সহযোগিতামূলক গবেষণা মডেলকে বাধ্যতামূলক করা উচিত, যাতে গবেষণার ফলাফল সরাসরি দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে।
  • দ্বিতীয়ত, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর-কে সম্মিলিতভাবে 'জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতিমালার' অধীনে একটি 'মেধা আকর্ষণ ও ধরে রাখা কর্মসূচি' (Talent Attraction and Retention Program) চালু করতে হবে। এই কর্মসূচির আওতায়, উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীদের জন্য গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) ভিত্তিক শিল্পে আকর্ষণীয় বেতনে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমে উচ্চ প্রযুক্তির শিল্প পার্ক স্থাপন করে মেধাবীদের জন্য আন্তর্জাতিক মানের কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। SEIP-এর মতো প্রকল্পগুলোর প্রশিক্ষিত জনবলকে দেশীয় শিল্পে অন্তর্ভুক্তির জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ এবং দীর্ঘমেয়াদী ক্যারিয়ার পাথওয়ে তৈরি করা আবশ্যক।
  • তৃতীয়ত, বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস (BANBEIS)-কে একটি 'জাতীয় মেধা ট্র্যাকিং ও সম্পৃক্তকরণ পোর্টাল' (National Talent Tracking and Engagement Portal) প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যা বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি মেধাবীদের তথ্য সংগ্রহ করবে এবং তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করবে। 'জাতীয় প্রবাসী কল্যাণ আইন'-এর অধীনে বিদেশে কর্মরত মেধাবীদের দেশে বিনিয়োগ, গবেষণা ও উদ্ভাবনী কার্যক্রমে অংশগ্রহণের জন্য বিশেষ কর সুবিধা, বিনিয়োগ সুরক্ষা এবং নাগরিক সেবায় অগ্রাধিকার প্রদানের মতো প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা উচিত, যাতে তারা দেশের উন্নয়নে অংশ নিতে আগ্রহী হন এবং পর্যায়ক্রমে দেশে ফিরে আসার সুযোগ বিবেচনা করেন।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. জহিরুল ইসলাম

ড. জহিরুল ইসলাম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: ব্রেন ড্রেন ও মেধা পাচার। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator