আন্তর্জাতিক প্রতারণার তদন্ত ও আস্থার সংকটে ডব্লিউএইচও-র পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

আন্তর্জাতিক প্রতারণার তদন্ত ও আস্থার সংকটে ডব্লিউএইচও-র পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ..

Roman Rahman avatar   
Roman Rahman
আন্তর্জাতিক প্রতারণার তদন্ত ও আস্থার সংকটে ডব্লিউএইচও-র পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ..
আন্তর্জাতিক প্রতারণার তদন্ত ও আস্থার সংকটে ডব্লিউএইচও-র পদ ছাড়লেন সায়মা ওয়াজেদ..
ছবি: সংগৃহীত

আন্তর্জাতিক তদন্ত, শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক এবং প্রশাসনিক সংকটের মুখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ..

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বহুমুখী প্রতারণা সংক্রান্ত গুরুতর তদন্ত এবং নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে তীব্র বিতর্কের মুখে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক পদ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ করেছেন সায়মা ওয়াজেদ, যিনি বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা। আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, গত বুধবার ডব্লিউএইচও-র মহাপরিচালক টেডরস আধানম গেব্রিয়েসাসের কাছে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন তিনি। ২০২৪ সালের শুরুর দিকে পাঁচ বছরের মেয়াদে এই গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দায়িত্ব গ্রহণ করলেও, গত এক বছর ধরে তিনি মূলত বেতনবিহীন প্রশাসনিক ছুটিতে ছিলেন। মূলত আর্থিক প্রতারণার অভিযোগ, বাংলাদেশে জমি অধিগ্রহণ সংক্রান্ত বিতর্ক এবং সার্বিক প্রশাসনিক জটিলতার জেরে সৃষ্ট নজিরবিহীন চাপের মুখেই তাঁর এই পদত্যাগের ঘটনা ঘটেছে, যা আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য খাতের সুশাসন ও নীতিগত স্বচ্ছতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তুলেছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তাঁর পিছু ছাড়েনি, যার ফলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতো একটি মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিও মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।

পদত্যাগপত্রে সায়মা ওয়াজেদ দাবি করেছেন যে, তিনি তাঁর অঞ্চলের দেশগুলোর সেবা করার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে এই পদে নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং সততার সাথেই তা পালনের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নানা বাধার কারণে তিনি কার্যকরভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি। তবে রয়টার্সের প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ডব্লিউএইচও-র বর্তমান নেতৃত্বের ওপর তিনি সম্পূর্ণ আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন এবং মহাপরিচালক টেডরসের কার্যপদ্ধতির কঠোর সমালোচনা করেছেন। দীর্ঘ প্রায় এক বছর ধরে কোনো ধরনের বেতন বা পারিশ্রমিক না পাওয়ার কারণে নিজের চরম আর্থিক সংকটের বিষয়টিও তিনি পদত্যাগপত্রে জোরালোভাবে তুলে ধরেছেন। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতার বৈধতা নিয়ে জাতিসংঘের স্বাস্থ্য সংস্থা এবং বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষের যৌথভাবে পরিচালিত উচ্চপর্যায়ের প্রতারণা সংক্রান্ত তদন্তের গতিপ্রকৃতিই তাঁকে এই আকস্মিক পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক মনে করছেন, ক্ষমতার পালাবদলের পর থেকেই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোতে নিয়োগ পাওয়া প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারের সদস্যদের দুর্নীতি ও অনিয়মের যে চিত্র উন্মোচিত হচ্ছে, সায়মা ওয়াজেদের পদত্যাগ তারই একটি প্রাতিষ্ঠানিক পরিণতি। দীর্ঘ এক বছর ধরে বেতন না পাওয়ার অজুহাত তুললেও, মূল সমস্যাটি নিহিত রয়েছে তাঁর নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার এবং পরবর্তীতে উত্থাপিত অর্থ আত্মসাৎ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের মধ্যে।

সায়মা ওয়াজেদের এই বিতর্কিত পদত্যাগের পর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি এবং রয়টার্সের পক্ষ থেকে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ডব্লিউএইচও কর্তৃপক্ষ বা সায়মা ওয়াজেদ নিজে এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে আন্তর্জাতিক জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, ডব্লিউএইচও-র মতো একটি বৈশ্বিক সংস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এই ঘটনা একটি বড় ধাক্কা হিসেবে এসেছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের মতো জনবহুল ও সংবেদনশীল একটি অঞ্চলে দীর্ঘসময় ধরে পরিচালক পদ শূন্য থাকা কিংবা কার্যক্রমে স্থবিরতা নেমে আসার পেছনে এই প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক কেলেঙ্কারি সরাসরি দায়ী। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং সংশ্লিষ্ট দুর্নীতি দমন কর্তৃপক্ষ যদি জমি অধিগ্রহণ ও আর্থিক প্রতারণার এই অভিযোগগুলোর পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্ত আন্তর্জাতিক মহলে জোরালোভাবে উপস্থাপন করে, তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের আন্তর্জাতিক সংস্থায় রাজনৈতিক ও স্বজনপ্রীতির মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়ার পথ চিরতরে বন্ধ হবে। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, কেবল পদত্যাগ করেই এই দায় এড়ানো সম্ভব নয়, বরং সংঘটিত অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিটি খাতের নিরপেক্ষ বিচার এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।

পরিশেষে বলা যায়, সায়মা ওয়াজেদের এই পদত্যাগ কেবল একজন উচ্চপদস্থ আন্তর্জাতিক কর্মকর্তার বিদায় নয়, বরং এটি স্বৈরাচারী শাসনের প্রভাবে আন্তর্জাতিক সংস্থায় ঘাপটি মেরে থাকা দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের এক লজ্জাজনক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। এই ঘটনা বিশ্বজুড়ে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নিয়োগ প্রক্রিয়া, অভ্যন্তরীণ নজরদারি এবং নৈতিকতার মানদণ্ডকে নতুন করে মূল্যায়ন করার তাগিদ তৈরি করেছে। একই সাথে, বৈশ্বিক কূটনীতি ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার মতো পবিত্র দায়িত্বকে ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করার পরিণাম যে কতটা ভয়াবহ হতে পারে, এই পদত্যাগ তার একটি স্পষ্ট ও নজিরবিহীন বার্তা দিয়ে গেল। আগামী দিনে ডব্লিউএইচও-র দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের কার্যক্রমে যাতে কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বা দুর্নীতির ছায়া না পড়ে, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে আরও অধিক সতর্ক ও কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator