যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার চলমান সামরিক উত্তেজনার পারদ যখন চরমে, ঠিক সেই মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক চাঞ্চল্যকর পূর্বাভাস দিয়েছেন। ডালাসে রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচনী সম্মেলনে যাওয়ার পথে জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুসে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে উল্লেখ করেন যে, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার এই সংঘাত আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের ঠিক পরপরই চিরতরে শেষ হয়ে যাবে। ট্রাম্পের এই মন্তব্যের মূল ভিত্তি হলো ইরানের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা, যা মার্কিন আক্রমণ ও কঠোর নিষেধাজ্ঞার জেরে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। প্রেসিডেন্ট সরাসরি অভিযোগ করেন যে, তেহরান প্রশাসন মার্কিন নির্বাচনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাব ফেলার জন্য অত্যন্ত মরিয়া হয়ে উঠেছে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো এমন একটি নমনীয় রাজনৈতিক শক্তিকে হোয়াইট হাউসের ক্ষমতায় নিয়ে আসা, যারা ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ও আঞ্চলিক আগ্রাসনে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করবে না। সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালীকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট ভূ-রাজনৈতিক সংকট এবং দুই দেশের পাল্টাপাল্টি সামরিক পদক্ষেপের মাঝেই ট্রাম্প এই রাজনৈতিক ও কৌশলগত বার্তা দিলেন। আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের স্পর্শকাতর সমীকরণে এই মন্তব্য বিশ্বজুড়ে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে, যা আগামী দিনের বৈশ্বিক নিরাপত্তা কাঠামোর ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
এই সংঘাতের সামরিক মাত্রা কেবল কথার লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নেই, বরং মাঠপর্যায়ে তা ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে যা গত কয়েকদিনের রক্তক্ষয়ী ও ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সংঘাতে ইরান হরমুজ প্রণালীর কৌশলগত জলসীমায় অন্তত দশটি জলযানকে লক্ষ্যবস্তু করে হামলা চালিয়েছে, যার মধ্যে দুটি মার্কিন জাহাজ এবং আটটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এর ঠিক আগের দিনই যুক্তরাষ্ট্র শক্তিপ্রদর্শন করে ইরানের পাঁচটি তেলবাহী ট্যাঙ্কার সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়, যা তেহরানের অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহের ওপর এক মারাত্মক আঘাত। মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিজেই দাবি করেছেন যে তাদের সামরিক পদক্ষেপে ইতিমধ্যে ইরানের বেশ কয়েকটি জাহাজ অকেজো করে দেওয়া হয়েছে এবং এই ধরনের কঠোর সামরিক অভিযান ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। এই পরিস্থিতি একদিকে যেমন মধ্যপ্রাচ্যের জলপথকে অত্যন্ত বিপজ্জনক করে তুলেছে, অন্যদিকে দুই দেশের দীর্ঘমেয়াদি বৈরিতাকে এক খোলা যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিয়েছে। ইরান সরকারের পক্ষ থেকে আলোচনা বা সমঝোতার কোনো কার্যকর সদিচ্ছা দেখা যাচ্ছে না দেখে ট্রাম্প প্রশাসনও এখন কূটনীতির টেবিল ছেড়ে সামরিক শক্তির ওপরই পূর্ণ ভরসা রাখছে। ফলে হরমুজ প্রণালীর মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল আন্তর্জাতিক বাণিজ্য রুটে যেকোনো সময় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞরা।
কূটনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনার এই ডামাডোলে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে ইরানের যেকোনো ধরনের নতুন সমঝোতায় পৌঁছানোর সম্ভাবনাও এখন প্রায় শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন যে, শুরুতে তিনি তেহরানের সঙ্গে একটি কূটনৈতিক চুক্তি করার আগ্রহ প্রকাশ করলেও বর্তমান পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন যে পরিস্থিতি এখন অনেক দূর গড়িয়ে গেছে এবং ওয়াশিংটনের হাতে নতুন করে আলোচনা শুরুর মতো পর্যাপ্ত সময় বা অনুকূল পরিস্থিতি আর নেই। তবে ট্রাম্পের এই অনমনীয় অবস্থানের পেছনে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাও গভীরভাবে জড়িত রয়েছে যা রিপাবলিকান পার্টির নীতিনির্ধারকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। সর্বশেষ প্রকাশিত রয়টার্স ও ইপসোস যৌথ জরিপের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমান প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি এবং জনজীবনকে বিপর্যস্তকারী দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ব্যক্তিগত জনসমর্থন ধস নামতে নামতে মাত্র ৩৩ শতাংশে এসে ঠেকেছে। ইরান যুদ্ধ এবং মুদ্রাস্ফীতির এই যমজ সংকট ভোটারদের মনে গভীর ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে, যা আসন্ন নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থীদের পতন ঘটাতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন। অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক এই চরম অস্থিরতা ও জনসমর্থন হারানোর আতঙ্ক থেকেই ট্রাম্প প্রশাসন ইরান ইস্যুকে দ্রুত সামরিক উপায়ে সমাধান করার রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সবমিলিয়ে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই আগাম পূর্বাভাস এবং তেহরানের বিরুদ্ধে কঠোর সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের ঘোষণা বৈশ্বিক রাজনীতিতে এক নতুন অস্থিতিশীলতার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য হোয়াইট হাউসের নীতিনির্ধারকরা ইরান সংকটকে একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করছেন, যার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি অত্যন্ত বিপজ্জনক হতে পারে। একদিকে সামরিক শক্তির মহড়া এবং অন্যদিকে ঘরোয়া রাজনীতিতে জনপ্রিয়তা ধরে রাখার এই মরিয়া চেষ্টা আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের মূল্য বৃদ্ধিসহ বিশ্ব অর্থনীতিতে এক মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির সঙ্গে যুদ্ধের এই প্রত্যক্ষ সংযোগ ভোটারদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা নির্বাচনী ফলাফলের গতিপ্রকৃতি সম্পূর্ণ বদলে দিতে পারে। যদি নির্বাচনের পরপরই সত্যিই সংঘাতের অবসান না ঘটে এবং মধ্যপ্রাচ্যে সর্বাত্মক যুদ্ধ বেধে যায়, তবে তা কেবল যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান নয়, বরং গোটা বিশ্বব্যবস্থাকে এক দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার খাদে ফেলে দেবে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক উত্তেজনার পারদ কমানোর পরিবর্তে তা বাড়িয়ে তোলার এই আত্মঘাতী প্রবণতা থেকে বিশ্বনেতাদের সরে এসে সংযত ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়া সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।