জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ

ড. আদনান সামি  avatar   
ড. আদনান সামি
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি: ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধান ও সাফল্যের রোডম্যাপ
ছবি: সংগৃহীত
সাম্প্রতিক সময়ে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কর্তৃক আয়োজিত এক কর্মশালায় ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা (Precision Medicine) পদ্ধতির ভবিষ্যৎ এবং এর বাস্তবায়নে জিনোমিক্স প...

সাম্প্রতিক সময়ে, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) কর্তৃক আয়োজিত এক কর্মশালায় ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা (Precision Medicine) পদ্ধতির ভবিষ্যৎ এবং এর বাস্তবায়নে জিনোমিক্স প্রযুক্তির ভূমিকা নিয়ে যে আলোচনা হয়েছে, তা দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় এক নতুন দিগন্ত উন্মোচনের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। এই আলোচনা একদিকে যেমন আশার সঞ্চার করেছে, অন্যদিকে তেমনি বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই উচ্চ প্রযুক্তির ব্যবহার ও প্রসারে বিদ্যমান ব্যর্থতা এবং চ্যালেঞ্জগুলোকেও সামনে এনেছে। গত পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) কর্তৃক জিনোমিক্স গবেষণায় বরাদ্দকৃত তহবিল এবং এর বাস্তব চিত্র পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, নীতিগত সদিচ্ছা থাকলেও কার্যকর প্রয়োগ ও সমন্বয়ের অভাবে এর সুফল এখনও অধরা। বিশেষ করে, সংক্রামক রোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IEDCR) প্যাথোজেন জিনোমিক্স নিয়ে সীমিত পরিসরে কাজ করলেও, ব্যাপক পরিসরে মানব জিনোম গবেষণায় প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, দক্ষ জনবল এবং সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের অভাব প্রকট। এই পরিস্থিতি কেবল গবেষণার গতিকেই শ্লথ করছে না, বরং উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির মাধ্যমে নাগরিকদের উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকারকেও ব্যাহত করছে।

বাংলাদেশের জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যর্থতার মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো একটি সমন্বিত জাতীয় নীতির অভাব। যদিও MOHFW বিভিন্ন সময়ে বায়োটেকনোলজি ও স্বাস্থ্য গবেষণায় উৎসাহ দিয়েছে, তবে জিনোমিক্সকে একটি স্বতন্ত্র ও অগ্রাধিকারমূলক ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করে সুনির্দিষ্ট কোনো জাতীয় কৌশলপত্র প্রণয়ন করা হয়নি। ফলে, বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয় বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে, যার কারণে সম্পদের অপচয় হচ্ছে এবং গবেষণার ফলাফল জাতীয় স্বাস্থ্যসেবায় কার্যকরভাবে রূপান্তরিত হতে পারছে না। উদাহরণস্বরূপ, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (NIMH) মানসিক স্বাস্থ্যের জিনোমিক ভিত্তি অনুসন্ধানে আগ্রহ দেখালেও, উপযুক্ত ফান্ডিং, আন্তর্জাতিক সহযোগিতার অভাব এবং বায়োইনফরমেটিক্স বিশেষজ্ঞের স্বল্পতা তাদের প্রচেষ্টাকে সীমিত করে রেখেছে। একই সাথে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) নতুন জিনোমিক্স-ভিত্তিক ডায়াগনস্টিক কিট বা থেরাপিউটিকসের অনুমোদনে যে দীর্ঘসূত্রিতা দেখাচ্ছে, তা উদ্ভাবনী গবেষণা এবং ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। পর্যাপ্ত বায়োব্যাংকের অভাব এবং জেনেটিক ডেটা সংরক্ষণে একটি সুসংগঠিত কাঠামোর অনুপস্থিতি এই খাতের অগ্রযাত্রাকে আরও পিছিয়ে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসার ক্ষেত্রে এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

কেবল নীতিগত দুর্বলতাই নয়, বরং গবেষণা ও অবকাঠামো খাতে অপর্যাপ্ত বিনিয়োগও এই ব্যর্থতার একটি বড় কারণ। উচ্চ-থ্রুপুট সিকোয়েন্সিং মেশিন, অত্যাধুনিক বায়োইনফরমেটিক্স ল্যাব এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে যে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন, তা সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাত থেকেই অনুপস্থিত। IEDCR সংক্রামক রোগের জিনোমিক সার্ভেইল্যান্সের জন্য কিছু সরঞ্জামাদি অর্জন করলেও, নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (NCDs) বা ক্যান্সার গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যাপকতর জিনোমিক ইনফ্রাস্ট্রাকচার এখনও গড়ে ওঠেনি। এর ফলে, বাংলাদেশি রোগীদের জিনোমিক ডেটা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের জন্য বিদেশের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা একদিকে যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি ডেটা প্রাইভেসি সংক্রান্ত ঝুঁকিও তৈরি করছে। এছাড়াও, বায়োইনফরমেটিক্স, জেনেটিক কাউন্সেলিং এবং ক্লিনিক্যাল জিনোমিক্স-এ প্রশিক্ষিত পেশাদারদের তীব্র সংকট রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে জিনোমিক্স ও বায়োইনফরমেটিক্স বিষয়ক কারিকুলাম আধুনিক বিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে পারছে না, যার ফলে গ্র্যাজুয়েটরা এই খাতের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পর্যাপ্তভাবে প্রস্তুত হতে পারছে না। স্বাস্থ্যসেবা প্রদানকারীদের মধ্যেও জিনোমিক্স প্রযুক্তির সুবিধা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতনতার অভাব প্রকট, যা রোগীদের কাছে এই সেবা পৌঁছাতে একটি বড় বাধা।

তবে, এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সাফল্যের একটি রোডম্যাপ তৈরি করা অসম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং দৃঢ় রাজনৈতিক অঙ্গীকার। বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও জাতিগত বৈচিত্র্য জিনোমিক গবেষণার জন্য একটি অনন্য সুযোগ করে দেয়, যা বিভিন্ন রোগের প্যাথোজেনেসিস এবং চিকিৎসার কার্যকারিতা বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেশী দেশগুলোতে জিনোমিক্স গবেষণায় যে অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ তার নিজস্ব মডেল তৈরি করতে পারে। MOHFW এবং DGHS-এর সম্মিলিত উদ্যোগে একটি জাতীয় জিনোমিক ডেটাবেজ এবং বায়োব্যাংক স্থাপন করা গেলে, তা দেশীয় গবেষকদের জন্য এক বিশাল সম্পদ হতে পারে। এছাড়াও, IEDCR-এর মাধ্যমে প্যাথোজেন জিনোমিক্স সার্ভেইল্যান্সকে আরও শক্তিশালী করে সংক্রামক রোগের মহামারী মোকাবিলায় জিনোমিক ডেটার ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে। NIMH-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে মানসিক স্বাস্থ্যের জিনোমিক ভিত্তি অনুসন্ধানে আরও বেশি সহায়তা প্রদান করা হলে, তা দেশের রোগীদের জন্য ব্যক্তিগতকৃত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের পথ খুলে দেবে। বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব স্থাপনও এই খাতের দ্রুত অগ্রগতি সাধনে সহায়ক হতে পারে, যা সামগ্রিকভাবে দেশের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।

সূচক ২০১৯ ২০২০ ২০২১ ২০২২ ২০২৩
MOHFW কর্তৃক জিনোমিক্স গবেষণায় বরাদ্দ (কোটি টাকা) ৫.৫০ ৬.২০ ৭.০০ ৮.৫০ ১০.০০
IEDCR-এ প্যাথোজেন জিনোম সিকোয়েন্সিংয়ের সংখ্যা (বার্ষিক) ১২০ ৫৫০* ৩২০ ৪০০ ৪৫০
DGHS নিবন্ধিত জিনোমিক টেস্টিং ল্যাব (সরকারি/বেসরকারি) ২ ৩ ৪ ৫ ৬
বায়োইনফরমেটিক্স/জিনোমিক্স বিষয়ক পিএইচডি/পোস্টডক গবেষক ৮ ১০ ১২ ১৫ ১৮
DGDA অনুমোদিত জিনোমিক্স-ভিত্তিক ডায়াগনস্টিক কিট ১ ১ ২ ২ ৩

উৎস: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) বার্ষিক প্রতিবেদন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) পরিসংখ্যান শাখা, সংক্রামক রোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IEDCR) অভ্যন্তরীণ ডেটা, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) প্রকাশনা। *২০২০ সালের সংখ্যাটি কোভিড-১৯ প্যাথোজেন সিকোয়েন্সিংয়ের কারণে অস্বাভাবিকভাবে বেশি।

সুপারিশ

  • স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) অবিলম্বে 'জাতীয় জিনোমিক্স ও ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা কৌশলপত্র ২০২৪' প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করুক, যেখানে জিনোমিক্স গবেষণায় দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়ন, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ তৈরির সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকবে। এই কৌশলপত্রের অধীনে একটি 'জাতীয় জিনোমিক ডেটাবেজ ও বায়োব্যাংক কর্তৃপক্ষ' প্রতিষ্ঠা করা হোক, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে জিনোমিক ডেটা সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং ব্যবহারের জন্য একটি মানসম্মত ও সুরক্ষিত কাঠামো তৈরি করবে।
  • সংক্রামক রোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান (IEDCR)-কে দেশের শীর্ষস্থানীয় জিনোমিক রিসার্চ হাব হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বিশেষ তহবিল বরাদ্দ করা হোক, যার মাধ্যমে IEDCR শুধু প্যাথোজেন জিনোমিক্স নয়, বরং অন্যান্য নন-কমিউনিকেবল ডিজিজ (NCDs) এবং জেনেটিক ডিসঅর্ডার গবেষণায়ও নেতৃত্ব দিতে পারে। একই সাথে, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (NIMH)-এর জন্য জিনোমিক্স ভিত্তিক গবেষণার জন্য একটি পৃথক 'ক্লিনিক্যাল জিনোমিক্স ইউনিট' প্রতিষ্ঠা করা হোক, যা মানসিক রোগের জিনোমিক ভিত্তি অনুসন্ধানে মনোনিবেশ করবে এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে দক্ষ জনবল তৈরি করবে।
  • ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) জিনোমিক্স-ভিত্তিক ডায়াগনস্টিক কিট এবং থেরাপিউটিকসের দ্রুত ও কার্যকর অনুমোদনের জন্য একটি বিশেষ 'ফাস্ট-ট্র্যাক রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক' তৈরি করুক। এই ফ্রেমওয়ার্কের আওতায়, জেনেটিক ডেটা প্রাইভেসি এবং নৈতিকতা সংক্রান্ত বিষয়গুলি মোকাবিলায় 'বায়োমেডিকেল গবেষণা ও ডেটা সুরক্ষা আইন' (প্রস্তাবিত) দ্রুত চূড়ান্ত করে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হোক, যা DGHS এবং MOHFW এর যৌথ তত্ত্বাবধানে কার্যকর হবে, এবং গবেষক ও রোগীদের অধিকার নিশ্চিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. আদনান সামি

ড. আদনান সামি 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: জিনোমিক্স ও উন্নত চিকিৎসা প্রযুক্তি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Keine Kommentare gefunden


News Card Generator