বিশেষজ্ঞ চোখে শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিশেষজ্ঞ চোখে শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

জাহাঙ্গীর আলম  avatar   
জাহাঙ্গীর আলম
বিশেষজ্ঞ চোখে শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
বিশেষজ্ঞ চোখে শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প: সত্য, মিথ ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকার ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের সকল জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, বিশেষ করে হংকং কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকার ২০২৬ সালের মধ্যে দেশের সকল জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডকে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড, বিশেষ করে হংকং কনভেনশন ফর দ্য সেফ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টালি সাউন্ড রিসাইক্লিং অফ শিপস-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের আওতায় আনার যে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করেছে, তা এই শিল্পের ভবিষ্যৎ পথচলার এক গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। এই পদক্ষেপ শুধু পরিবেশগত সুরক্ষা ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে না, বরং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সামুদ্রিক শিল্পের ভাবমূর্তিও উজ্জ্বল করবে। যদিও এই লক্ষ্য অর্জনে এখনও বহু চ্যালেঞ্জ বিদ্যমান, তবুও এটি একটি স্পষ্ট বার্তা দেয় যে সরকার এই খাতকে শুধু অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি হিসেবে নয়, বরং একটি টেকসই ও দায়িত্বশীল শিল্প হিসেবে দেখতে বদ্ধপরিকর।

বাংলাদেশের জাহাজ নির্মাণ শিল্প গত এক দশকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে, বিশেষত ছোট ও মাঝারি আকারের সমুদ্রগামী জাহাজ, ফেরি এবং অভ্যন্তরীণ নৌযান নির্মাণে। দেশের কয়েকটি শীর্ষস্থানীয় শিপইয়ার্ড, যেমন ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপইয়ার্ড ও আনন্দ শিপইয়ার্ড, ইউরোপ ও আফ্রিকার বাজারে জাহাজ রপ্তানি করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করেছে। এটি দেশের প্রকৌশল দক্ষতা এবং মানসম্মত উৎপাদনের একটি বড় দৃষ্টান্ত। তবে, এই খাতের পূর্ণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে এখনো উচ্চতর প্রযুক্তি, নকশা ও গবেষণা-উন্নয়নে (R&D) বিনিয়োগের অভাব রয়েছে। বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে আধুনিক জাহাজ নির্মাণ কৌশল, যেমন মডুলার কনস্ট্রাকশন এবং জ্বালানি-সাশ্রয়ী ডিজাইন আয়ত্ত করা জরুরি। এছাড়া, গভীর সমুদ্রগামী বৃহৎ জাহাজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও ভারী উত্তোলন যন্ত্রপাতির অপ্রাপ্যতা এবং দক্ষ জনবলের ঘাটতি এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যা এই খাতের সম্প্রসারণে বাধা সৃষ্টি করছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত নীতিমালায় এই বিষয়গুলো আরও নিবিড়ভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন যাতে স্থানীয় শিল্পের বিকাশ ত্বরান্বিত হয় এবং বৈদেশিক বিনিয়োগের পথ সুগম হয়।

অন্যদিকে, জাহাজ ভাঙা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক অপরিহার্য খাত, যা দেশের ইস্পাত শিল্পের কাঁচামালের প্রায় ৮০ শতাংশ যোগান দেয় এবং লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। কিন্তু এই শিল্পের সঙ্গে বহু বছর ধরে পরিবেশ দূষণ ও শ্রমিক সুরক্ষার প্রশ্নটি ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিল। বিষাক্ত বর্জ্য যেমন অ্যাসবেস্টস, পলিক্লোরিনেটেড বাইফেনাইলস (PCBs) এবং ভারী ধাতু অপরিকল্পিতভাবে পরিবেশে মিশে গিয়েছে, যা সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও উপকূলীয় জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে। শ্রমিকদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) এবং প্রশিক্ষণের অভাবের কারণে প্রায়শই দুর্ঘটনা ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ আইন, ২০১৮' প্রণয়ন এবং হংকং কনভেনশন অনুসমর্থনের মাধ্যমে এই শিল্পের পরিবেশগত ও নিরাপত্তা মান উন্নয়নের একটি আইনি কাঠামো তৈরি হয়েছে। World Bank এবং ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো এই খাতে সবুজ প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শ্রমিক নিরাপত্তা প্রশিক্ষণের জন্য কারিগরি সহায়তা ও অর্থায়নের সুযোগ দিচ্ছে, যা ইয়ার্ডগুলোর আধুনিকায়নে সহায়ক হতে পারে। তবে, এই আইন ও কনভেনশনের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং নজরদারি এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, যেখানে পরিবেশ অধিদপ্তর ও শ্রম মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দুই শিল্পের মধ্যে একটি স্বাভাবিক সম্পর্ক বিদ্যমান, যেখানে জাহাজ ভাঙা শিল্প থেকে প্রাপ্ত ইস্পাত জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য একটি সাশ্রয়ী কাঁচামাল সরবরাহ করতে পারে। এই অভ্যন্তরীণ সরবরাহ শৃঙ্খল একদিকে আমদানি নির্ভরতা কমাবে এবং অন্যদিকে উভয় শিল্পের মধ্যে এক ধরনের সমন্বয় সাধন করবে। কিন্তু এই সমন্বয়ের জন্য একটি সামগ্রিক নীতি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর প্রয়োজন, যা উভয় শিল্পের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। বর্তমানে, আলাদাভাবে পরিচালিত হওয়ায় এই খাতগুলো তাদের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে না। উদাহরণস্বরূপ, জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড থেকে প্রাপ্ত উচ্চ মানের পুনঃপ্রক্রিয়াজাত ইস্পাত যদি জাহাজ নির্মাণে ব্যবহারের জন্য মান নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সরবরাহ করা যায়, তবে তা উভয় শিল্পের জন্যই লাভজনক হবে। এক্ষেত্রে, বাংলাদেশ সরকার একটি সমন্বিত সামুদ্রিক শিল্প উন্নয়ন নীতিমালা প্রণয়ন করতে পারে, যেখানে উভয় খাতের জন্য সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা থাকবে। এই ধরনের একটি নীতিমালা শুধু দেশীয় শিল্পকে শক্তিশালী করবে না, বরং বিদেশি বিনিয়োগকারীদেরও আকৃষ্ট করবে, যারা টেকসই ও দায়িত্বশীল শিল্পে বিনিয়োগে আগ্রহী।

সাল পুনঃপ্রক্রিয়াকৃত জাহাজের সংখ্যা (ইউনিট) ইস্পাত পুনরুদ্ধার (মিলিয়ন টন) সৃষ্ট কর্মসংস্থান (আনুমানিক) আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ/সহায়তা (মিলিয়ন মার্কিন ডলার)
২০১৮ ২২০ ১.৯ ৩৫,০০০ ৫০ (World Bank)
২০২০ ১৮০ ১.৬ ৩০,০০০ ৭৫ (ADB)
২০২২ ২৫০ ২.২ ৪০,০০০ ১০০ (বাংলাদেশ সরকার/World Bank যৌথ)
২০২৪ (লক্ষ্যমাত্রা) ৩০০+ ২.৫+ ৪৫,০০০+ ১৫০+ (ADB/World Bank)

উৎস: সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় (শিল্প মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়), World Bank এবং ADB-এর প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক 'জাতীয় সামুদ্রিক শিল্প উন্নয়ন নীতি' প্রণয়ন করা উচিত, যা জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ ভাঙা উভয় খাতকে একটি সমন্বিত কাঠামোর অধীনে আনবে। এই নীতিমালায় জাহাজ নির্মাণ শিল্পের জন্য আধুনিক প্রযুক্তি হস্তান্তর, গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগ এবং দক্ষ জনবল তৈরির জন্য 'শিল্প মন্ত্রণালয়' ও 'নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়' এর যৌথ উদ্যোগে একটি বিশেষ তহবিল গঠনের বিধান অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
  • 'পরিবেশ অধিদপ্তর'কে 'বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াকরণ আইন, ২০১৮' এবং হংকং কনভেনশন অনুযায়ী জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলোর পরিবেশগত মান ও শ্রমিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি স্বায়ত্তশাসিত ও শক্তিশালী মনিটরিং ও এনফোর্সমেন্ট উইং স্থাপন করতে হবে। এই উইংকে World Bank এর কারিগরি সহায়তায় আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং আধুনিক পরিদর্শন সরঞ্জাম সরবরাহ করা যেতে পারে, যাতে অনিরাপদ ও পরিবেশ দূষণকারী ইয়ার্ডগুলোর বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া যায়।
  • 'বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)' এর অধীনে বিশেষায়িত 'মেরিন ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল জোন' প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে, যেখানে জাহাজ নির্মাণ ও জাহাজ ভাঙা উভয় শিল্পের জন্য আধুনিক অবকাঠামো, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সুবিধা এবং দক্ষ শ্রমবাজার গড়ে তোলা হবে। ADB এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় এই জোনগুলোতে সবুজ শিল্পায়নকে উৎসাহিত করতে সুনির্দিষ্ট বিনিয়োগ নীতি ও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা উচিত, যা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করবে এবং দেশের সামুদ্রিক শিল্পের বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বৃদ্ধি করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

कोई टिप्पणी नहीं मिली


News Card Generator