মোংলায় ডেঙ্গু ও হামের দ্বিমুখী থাবায় স্বাস্থ্যঝুঁকি চরমে, আক্রান্ত ছাড়াল চার শতাধিক.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

মোংলায় ডেঙ্গু ও হামের দ্বিমুখী থাবায় স্বাস্থ্যঝুঁকি চরমে, আক্রান্ত ছাড়াল চার শতাধিক..

রবি ডাকুয়া avatar   
রবি ডাকুয়া
মোংলায় ডেঙ্গু ও হামের দ্বিমুখী থাবায় স্বাস্থ্যঝুঁকি চরমে, আক্রান্ত ছাড়াল চার শতাধিক..
মোংলায় ডেঙ্গু ও হামের দ্বিমুখী থাবায় স্বাস্থ্যঝুঁকি চরমে, আক্রান্ত ছাড়াল চার শতাধিক..
ছবি: সংগৃহীত
বাগেরহাটের মোংলায় গত তিন মাসে ডেঙ্গু ও হামের প্রকোপে চার শতাধিক মানুষ আক্রান্ত হয়েছেন, যার মধ্যে দুইজনের মৃত্যু হয়েছে।..

বাগেরহাটের মোংলা উপজেলায় গত তিন মাসের ব্যবধানে ডেঙ্গু ও হামের অভূতপূর্ব প্রকোপ জনস্বাস্থ্যকে চরম ঝুঁকিপূর্ণ ও আতঙ্কজনক এক পরিস্থিতির মুখে ঠেলে দিয়েছে। স্থানীয় স্বাস্থ্য বিভাগের নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, এই নির্দিষ্ট সময়ে উপজেলায় ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছেন ২৭৪ জন এবং হামে আক্রান্ত হয়েছেন ১৫৯ জন, যা সম্মিলিতভাবে ৪৩৩ জনের একটি বড় সংখ্যা তৈরি করেছে। এই দ্বিমুখী মহামারির কবলে পড়ে ডেঙ্গু আক্রান্তদের মধ্যে ইতোমধ্যে দুইজন রোগীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে, যা স্থানীয় সাধারণ মানুষের মনে গভীর আতঙ্ক ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৫ জন ডেঙ্গু রোগী এবং ৫ জন হাম রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মূলত বর্ষা পরবর্তী সময়ে মশার অস্বাভাবিক উপদ্রব বৃদ্ধি, সঠিক সময়ে মশা নিধনে কার্যকর পদক্ষেপের অভাব এবং শিশু পর্যায়ে টিকা কার্যক্রমের নানা সীমাবদ্ধতার কারণে ডেঙ্গুর পাশাপাশি হামের এই মারাত্মক দ্বিমুখী প্রকোপ দেখা দিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আক্রান্তদের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিশু এবং কম বয়সী ব্যক্তিদের আক্রান্ত হওয়ার হার উদ্বেগজনকভাবে বেশি, যার ফলে এলাকার অভিভাবকরা চরম উৎকণ্ঠা ও ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। স্বাস্থ্য বিভাগের এই প্রাথমিক পরিসংখ্যানে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, সময়মতো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে।

ভুক্তভোগী পরিবার ও স্থানীয় সাধারণ মানুষের পক্ষ থেকে তীব্র অভিযোগ তোলা হয়েছে যে, জনবহুল ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে মশা নিধনের কোনো নিয়মিত বা দৃশ্যমান কার্যক্রম নেই বললেই চলে। এছাড়া পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক প্রচারণার তীব্র অভাব থাকায় সাধারণ মানুষ অসুস্থতার প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক চিকিৎসা বা পদক্ষেপ নিতে মারাত্মকভাবে ব্যর্থ হচ্ছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রোগীদের স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রাথমিক অবস্থায় জ্বর বা হামের মৃদু উপসর্গ দেখা দিলেও অনেকে একে সাধারণ ঋতু পরিবর্তনজনিত রোগ মনে করে অবহেলা করছেন, যা পরবর্তীতে রোগীকে শারীরিক জটিলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এদিকে হাসপাতালের নিজস্ব শয্যা সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত হওয়ায় এবং দিন দিন রোগীর চাপ আশঙ্কাজনকভাবে বাড়তে থাকায় অনেক গরিব ও অসহায় রোগীকে হাসপাতালের মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে, যা চিকিৎসা ব্যবস্থার করুণ অবস্থাকে ফুটিয়ে তোলে। স্থানীয়দের জোরালো দাবি, মশা নিধনে মানসম্মত ও কার্যকর ওষুধের স্প্রে প্রয়োগ করা এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পর্যাপ্ত জীবনরক্ষাকারী ওষুধের সরবরাহ নিশ্চিত করা না হলে এই সংক্রমণ কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে না। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে হামের এই ব্যাপক বিস্তার এবং ডেঙ্গুর আকস্মিক ভয়াবহতা প্রতিটি পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এক ধরণের মনস্তাত্ত্বিক ভীতির সঞ্চার করেছে, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে।

পরিস্থিতি নিয়ে কথা বললে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মো. শাহীন জানিয়েছেন যে, ডেঙ্গু ও হামের এই ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের সাধ্যমতো সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া প্রতিটি রোগীর যথাযথ চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদের স্বজনদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে, যার ফলে চিকিৎসাধীনদের অনেকেই সুস্থ হয়ে নিরাপদে বাড়ি ফিরছেন। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মতে, কেবল হাসপাতালের চার দেওয়ালের ভেতরের চিকিৎসাসেবা যথেষ্ট নয়, বরং ব্যক্তিগত ও সামাজিক পর্যায়ে সচেতনতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা জরুরি। কর্তৃপক্ষের দাবি অনুযায়ী, বর্তমান পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সার্বিক নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের সর্বোচ্চ সতর্কতার সাথে কাজ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় সচেতন ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করছেন, কেবল দায়সারা সতর্কবার্তা বা মৌখিক নির্দেশনা দিয়ে এই মারাত্মক মহামারি নিয়ন্ত্রণ করা মোটেও সম্ভব নয়। বরং কার্যকর উপায়ে মশা নিধনে নিয়মিত ফগার মেশিন ও লার্ভিসাইড স্প্রে কার্যক্রম পরিচালনা এবং শিশুদের হামের টিকাদানের আওতা আরও দ্রুত বিস্তৃত করার মাধ্যমেই কেবল একটি দীর্ঘমেয়াদী ও টেকসই সমাধান অর্জন করা সম্ভব বলে তারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন।

মোংলা অঞ্চলে ডেঙ্গু ও হামের এই যুগপৎ প্রাদুর্ভাব কেবল একটি সাধারণ স্বাস্থ্য সমস্যা বা ঋতুভিত্তিক রোগ নয়, এটি মূলত স্থানীয় জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রশাসনিক সক্ষমতা ও প্রস্তুতির ওপর একটি বড় ধরনের পরীক্ষা। সঠিক সময়ে নীতিনির্ধারক ও সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে ভবিষ্যতে এই সংক্রমণ আরও বড় রূপ নিতে পারে, যা এই উপকূলীয় অঞ্চলের স্বাভাবিক জনজীবনকে পুরোপুরি স্থবির করে দিতে পারে। দ্রুততম সময়ের মধ্যে মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি জোরদার করা এবং আক্রান্ত সাধারণ রোগীদের জন্য পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জাম ও জনবল নিশ্চিত করা না হলে পরিস্থিতি যেকোনো মুহূর্তে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ার গুরুতর ঝুঁকি থেকেই যায়। সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত এবং স্বাভাবিক কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে স্থানীয় প্রশাসন, পৌর কর্তৃপক্ষ ও স্বাস্থ্য বিভাগকে অবিলম্বে একটি সমন্বিত ও কার্যকর কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে মাঠে নামতে হবে, যাতে কোনোভাবেই অমূল্য প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি না ঘটে এবং সাধারণ মানুষ মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পেতে পারে।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator