বিআরটিএ ও গণপরিবহন খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: জননিরাপত্তা আজ বিপন্ন.. | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

বিআরটিএ ও গণপরিবহন খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: জননিরাপত্তা আজ বিপন্ন..

কামরুল হাসান  avatar   
কামরুল হাসান
বিআরটিএ ও গণপরিবহন খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: জননিরাপত্তা আজ বিপন্ন..
বিআরটিএ ও গণপরিবহন খাতে দুর্নীতির কালো থাবা: জননিরাপত্তা আজ বিপন্ন..
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাত, বিশেষ করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং গণপরিবহন ব্যবস্থা, দুর্নীতির এক গভীর চক্রে আবর্তিত। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরি.....

বাংলাদেশের সড়ক পরিবহন খাত, বিশেষ করে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং গণপরিবহন ব্যবস্থা, দুর্নীতির এক গভীর চক্রে আবর্তিত। সাম্প্রতিক বিভিন্ন জরিপ ও অনুসন্ধানে এই খাতের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, যা জননিরাপত্তা ও সুশাসনের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) কর্তৃক প্রকাশিত সিটিজেন পারসেপশন সার্ভে (সিপিএস) ২০২৫ অনুযায়ী, সরকারি সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে বিআরটিএ-তে ঘুষ ও দুর্নীতির হার সর্বোচ্চ। এই জরিপে অংশগ্রহণকারী ৬৩.২৯ শতাংশ নাগরিক জানিয়েছেন যে, তারা বিআরটিএ থেকে সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতি বা ঘুষের শিকার হয়েছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ২০২৩-২৪ সালের 'সার্ভিস সেক্টরস: ন্যাশনাল হাউজহোল্ড সার্ভে' অনুযায়ী, বিআরটিএ থেকে সেবা গ্রহণকারী ৮৫.২ শতাংশ পরিবারই দুর্নীতির শিকার হয়েছে, যা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর (৭৪.৫%) চেয়েও প্রায় ১১ শতাংশ বেশি ছিল। এই চিত্র স্পষ্ট করে যে, দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই খাতটি কতটা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার জালে আবদ্ধ।

বিআরটিএ-তে দুর্নীতির মূল কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সার্টিফিকেট এবং যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়ায় ঘুষের লেনদেন। দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এখানে এতটাই প্রকট যে, ডিজিটাল পদ্ধতির প্রচলন সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হচ্ছেন। দালালরা ঘুষের বিনিময়ে দ্রুত সেবা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দেয়, যা ছাড়া অনলাইনে আবেদন করেও অনাকাঙ্ক্ষিত বিলম্বের সম্মুখীন হতে হয়। টিআইবি-এর অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিআরটিএ কর্মকর্তারা ডিজিটাল পদ্ধতির তিনটি ফাঁকফোকর ব্যবহার করে সেবাগ্রহীতাদের অনলাইন সেবার প্রতি নিরুৎসাহিত করেন: নির্দেশনার অভাব, সশরীরে উপস্থিতির আবশ্যকতা এবং স্বীকৃতি স্লিপ আটকে রাখা। এমনকি পেশাদার চালকদের ডোপ টেস্টও দুর্নীতির একটি নতুন উৎস হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এই অভিযোগগুলোর পরিপ্রেক্ষিতে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ২০২৫ সালের মে মাসে সারাদেশে বিআরটিএ-এর ৩৫টি কার্যালয়ে অভিযান পরিচালনা করে, যেখানে দালালদের মাধ্যমে ঘুষ গ্রহণ করে ড্রাইভিং লাইসেন্স ও ফিটনেস সার্টিফিকেট প্রদানের অভিযোগ ছিল। এসব অভিযান সত্ত্বেও, পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হয়নি, যা এই খাতের দুর্নীতির গভীর শিকড়কেই নির্দেশ করে।

গণপরিবহন খাতেও অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র সমানভাবে উদ্বেগজনক। টিআইবি-এর একটি গবেষণা অনুযায়ী, দেশের বেসরকারি বাস পরিবহন খাতে বছরে কমপক্ষে ১,০৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়, যা রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, পুলিশ, বিআরটিএ কর্মকর্তা এবং বাস মালিক সমিতির সদস্যদের মধ্যে ভাগ হয়ে যায়। এই গবেষণায় আরও উঠে এসেছে যে, প্রায় ৯২ শতাংশ বড় বাস কোম্পানি রাজনীতিবিদদের সাথে জড়িত, যার মধ্যে ৮০ শতাংশ তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের সাথে যুক্ত ছিল। ঢাকা শহরে নিবন্ধিত বাসের প্রায় ৩০ শতাংশই তাদের নির্ধারিত আয়ুষ্কাল (২০ বছরের বেশি) অতিক্রম করেছে, এবং দেশব্যাপী প্রায় অর্ধেক বাস ও মিনিবাসের ফিটনেস সার্টিফিকেট নবায়ন করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে যে, অনানুষ্ঠানিক মাসিক লেনদেনের মাধ্যমে এই মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহনগুলো সড়কে চলাচল অব্যাহত রাখে। এছাড়া, ১৮.৯ শতাংশ বাসের রেজিস্ট্রেশন, ২৪ শতাংশের ফিটনেস সার্টিফিকেট, ১৮.৫ শতাংশের ট্যাক্স টোকেন এবং ২২ শতাংশের রুট পারমিট নেই। যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় একটি সাধারণ ঘটনা, যেখানে ৬০ শতাংশেরও বেশি যাত্রী অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের শিকার হন। শত শত অপারেটরের একই রুটে বাস চালানোর কারণে অরাজক প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হয়, যা প্রায়শই ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের দিকে ধাবিত করে।

এই দুর্নীতি ও অনিয়মের চূড়ান্ত পরিণতি হলো ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনা এবং জননিরাপত্তার চরম অবনতি। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম সর্বোচ্চ সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর হারের দেশ। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) অনুমান অনুযায়ী, ২০২১ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় ৩১,৫৭৮ জনের মৃত্যু হয়েছিল, যা প্রতি ১ লাখ মানুষের মধ্যে ১৮.৬ জন। অথচ একই বছরে সরকারি হিসাবে মৃত্যুর সংখ্যা ছিল মাত্র ৫,০০০, যা তথ্য গোপন এবং দুর্বল ডেটা ব্যবস্থাপনার ইঙ্গিত দেয়। সড়ক দুর্ঘটনার কারণে দেশের অর্থনীতিতে প্রতি বছর জিডিপি-এর ৩-৫ শতাংশ ক্ষতি হয়, যা ২০২৫ সালে ৬০,০০০ কোটি টাকারও বেশি ছিল। শুধু ঢাকা শহরে যানজটের কারণে বছরে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়। ২০১৮ সালের সড়ক পরিবহন আইন প্রণয়ন করা হলেও, দুর্বল প্রয়োগ, প্রাতিষ্ঠানিক ঘাটতি, সম্পদের অভাব এবং দুর্বল সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনার কারণে তা কাঙ্ক্ষিত ফল দিতে পারেনি। দ্রুত গতিতে গাড়ি চালানো, অমনোযোগী বা নেশাগ্রস্ত অবস্থায় ড্রাইভিং, চালকদের প্রশিক্ষণের অভাব, দুর্বল যানবাহনের নিরাপত্তা এবং অপর্যাপ্ত সড়ক অবকাঠামো দুর্ঘটনার প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। এই খাতের রাজনৈতিকীকরণ এবং 'খারাপ পুঁজির' প্রভাব দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করেছে।

এই সামগ্রিক পরিস্থিতি দেশের পরিবহন ব্যবস্থাকে একটি অকার্যকর অবস্থায় নিয়ে গেছে। বিআরটিএ-এর মতো নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার দুর্নীতি এবং গণপরিবহন খাতের অনিয়ম শুধু আর্থিক ক্ষতিই করছে না, বরং প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের জীবন কেড়ে নিচ্ছে এবং তাদের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন যখন দেখা হচ্ছে, তখন ডিজিটাল পদ্ধতির ফাঁকফোকর ব্যবহার করে দুর্নীতি চালিয়ে যাওয়াটা হতাশাজনক। এই পরিস্থিতি সরকারের প্রতি জনগণের আস্থাকে ক্ষুণ্ণ করছে এবং টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বাধা সৃষ্টি করছে। একটি নিরাপদ, সুশৃঙ্খল এবং দুর্নীতিমুক্ত সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে না পারলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সামাজিক নিরাপত্তা উভয়ই হুমকির মুখে পড়বে। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকারের দ্রুত এবং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য।

সুপারিশ: সড়ক পরিবহন খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা উচিত: ১. বিআরটিএ-তে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করে দুদক-এর অভিযান আরও জোরদার করা এবং দোষী কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। ২. ড্রাইভিং লাইসেন্স, ফিটনেস সার্টিফিকেট ও রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল করা এবং এর প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে দালালচক্রের কোনো সুযোগ না থাকে। ৩. গণপরিবহন খাতে চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব বন্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ এবং নিয়মিত নজরদারি বাড়ানো। ৪. মেয়াদোত্তীর্ণ ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন চলাচল বন্ধে বিআরটিএ এবং ট্রাফিক পুলিশকে আরও সক্রিয় ও কঠোর হতে হবে, প্রয়োজনে প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে এসব যানবাহন শনাক্ত ও অপসারণের ব্যবস্থা করতে হবে। ৫. সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন 'সড়ক নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ' গঠন করা, যা পরিবহন ইউনিয়ন বা অন্য কোনো প্রভাবশালীর দ্বারা প্রভাবিত হবে না। ৬. চালকদের উন্নত প্রশিক্ষণ, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া কঠোর করা এবং নিয়মিত ডোপ টেস্ট নিশ্চিত করা, যেখানে কোনো দুর্নীতির সুযোগ থাকবে না। ৭. সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন, আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা এবং সড়ক নিরাপত্তা সংক্রান্ত আইন, বিশেষ করে নতুন সড়ক নিরাপত্তা আইন, এর কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করা। ৮. সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত সঠিক তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশ নিশ্চিত করতে একটি সমন্বিত ডেটাবেস তৈরি করা, যাতে সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও সমাধানের পথ সুগম হয়। ৯. গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় বন্ধে কঠোর তদারকি এবং যাত্রীদের অভিযোগ জানানোর সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা চালু করা। ১০. সড়ক নিরাপত্তা এবং পরিবহন আইন সম্পর্কে ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা।


🔎 অনুসন্ধানে: কামরুল হাসান

কামরুল হাসান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: বিআরটিএ, গণপরিবহন ও সড়ক নিরাপত্তা।

コメントがありません


News Card Generator