কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য: শ্রম আইনে 'দায়িত্ব' আছে, 'অধিকার' কি সুদূরপরাহত? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য: শ্রম আইনে 'দায়িত্ব' আছে, 'অধিকার' কি সুদূরপরাহত?

অ্যাডভোকেট তানিয়া  avatar   
অ্যাডভোকেট তানিয়া
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য: শ্রম আইনে 'দায়িত্ব' আছে, 'অধিকার' কি সুদূরপরাহত?
কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য: শ্রম আইনে 'দায়িত্ব' আছে, 'অধিকার' কি সুদূরপরাহত?
ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০১৯ সালের যৌথ জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৬.৮% কোন...

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH) এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) ২০১৯ সালের যৌথ জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৬.৮% কোনো না কোনো মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কর্মজীবী, যারা কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ, হয়রানি এবং উদ্বেগের শিকার হচ্ছেন। সাম্প্রতিককালে পোশাক শিল্প থেকে শুরু করে তথ্যপ্রযুক্তি খাত পর্যন্ত বিভিন্ন পেশায় কর্মরতদের মধ্যে মানসিক অবসাদ, দুশ্চিন্তা এবং কর্মোদ্দীপনা হারানোর ঘটনা ক্রমবর্ধমানভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে। বিশেষ করে কোভিড-১৯ অতিমারীর পর কাজের চাপ, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং কর্ম-জীবনের ভারসাম্যহীনতা মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। অথচ বাংলাদেশের শ্রম আইনে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট বিধানের অনুপস্থিতি এই সংকটকে আরও গভীর করে তুলছে। নিয়োগকর্তাদের জন্য যেখানে শারীরিক স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার বিষয়ে স্পষ্ট 'দায়িত্ব' আছে, সেখানে কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার 'অধিকার' এখনও এক সুদূরপরাহত স্বপ্ন।

বাংলাদেশের শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৮) কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকদের শারীরিক নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়ে বিস্তারিত বিধান রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ, ধারা ৫৬ (কর্মক্ষেত্রের স্বাস্থ্য), ধারা ৫৮ (প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা) এবং ধারা ৬১ (ক্ষতিকর ধূলি ও ধোঁয়া নিয়ন্ত্রণ) সুস্পষ্ট নির্দেশিকা প্রদান করে। এমনকি ধারা ৬২-৬৯ এ কর্মক্ষেত্রে বিপদজনক যন্ত্রপাতি ও প্রক্রিয়ার নিরাপত্তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা আছে। কিন্তু মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো ধারা বা উপধারা এই আইনে অনুপস্থিত। কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ, উদ্বেগ, অবসাদ বা হয়রানির কারণে সৃষ্ট মানসিক অসুস্থতা প্রতিরোধ, চিহ্নিতকরণ এবং এর প্রতিকারের জন্য নিয়োগকর্তার আইনি বাধ্যবাধকতা অস্পষ্ট। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় (MOHFW) যদিও সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যের উন্নতিতে কাজ করে, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠান-ভিত্তিক কার্যকর নীতি প্রণয়ন বা পরিবীক্ষণে তাদের সরাসরি এখতিয়ার বা পর্যাপ্ত কাঠামো নেই। ফলস্বরূপ, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে যায়, যা ব্যক্তি এবং জাতীয় অর্থনীতি উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর।

এই আইনি শূন্যতার ফলস্বরূপ, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো প্রায়শই উপেক্ষিত থেকে যায়। নিয়োগকর্তারা আইনি বাধ্যবাধকতার অভাবে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যকে গুরুত্ব দিতে আগ্রহী হন না, অথবা এটি কেবল কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়, মৌলিক অধিকার হিসেবে নয়। এই পরিস্থিতিতে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগা একজন শ্রমিকের জন্য আইনি প্রতিকারের পথ কার্যত রুদ্ধ। একটি সাম্প্রতিক গবেষণা অনুসারে, মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণে কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিতি (absenteeism) এবং উপস্থিত থেকেও কম উৎপাদনশীলতা (presenteeism) বাবদ বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রতি বছর বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়। ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) যদিও বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ে কাজ করে, কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের উপর এর পদ্ধতিগত তথ্য সংগ্রহ বা বিশ্লেষণ এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে। এই ডেটার অভাব নীতি নির্ধারকদের জন্য কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণকে আরও কঠিন করে তোলে। মানসিক স্বাস্থ্যকে কেবল ব্যক্তিগত বিষয় না রেখে এটি যে একটি জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সমস্যা, তা অনুধাবন করা জরুরি।

কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষার অধিকার তাই অনেক শ্রমিকের কাছেই সুদূরপরাহত। সামাজিক কুসংস্কার এবং মানসিক অসুস্থতা নিয়ে খোলামেলা আলোচনার অভাব এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। একজন শ্রমিক যখন মানসিক স্বাস্থ্যজনিত সমস্যার কারণে কর্মক্ষেত্রে প্রতিকূলতার শিকার হন, তখন তার জন্য আইনি প্রতিকারের পথ কার্যত রুদ্ধ। এমনকি যদি কোনো নিয়োগকর্তা কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে নজর দিতেও চান, সুনির্দিষ্ট আইনি বাধ্যবাধকতার অভাবে এটি প্রায়শই কর্পোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়, মৌলিক অধিকার হিসেবে নয়। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA) যদিও মানসিক রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণ ও বিতরণ নিশ্চিত করে, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় এর কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই। প্রতিষ্ঠানটি কেবল চিকিৎসাজনিত প্রয়োজনে ঔষধের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করে, কিন্তু কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ বা অসুস্থতার উৎস নির্মূলে বা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে এর কোনো আইনি ম্যান্ডেট নেই। এই প্রেক্ষাপটে, মানসিক স্বাস্থ্যকে কেবল চিকিৎসার বিষয় না রেখে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে শ্রম আইনে অন্তর্ভুক্ত করা অপরিহার্য। কর্মপরিবেশ সুস্থ ও উৎপাদনশীল রাখতে একটি সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

পেশা/খাত মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্তের হার (২০২৩, সম্ভাব্য %) কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ (উচ্চ/মধ্যম/নিম্ন) মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রাপ্তির হার (%)
পোশাক শিল্প কর্মী ২৫% উচ্চ ৫%
স্বাস্থ্যসেবা কর্মী ৩০% উচ্চ ১০%
ব্যাংকিং ও আর্থিক খাত ১৮% মধ্যম ৮%
শিক্ষক ২০% মধ্যম ৭%
তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী ২২% উচ্চ ১২%

উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) ও জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH)-এর যৌথ সমীক্ষা (২০২৩, সম্ভাব্য)।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশের শ্রম আইন ২০০৬-কে সংশোধন করে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষাকে স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। এতে নিয়োগকর্তাদের জন্য মানসিক স্বাস্থ্য নীতি প্রণয়ন, কর্মীদের মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তার ব্যবস্থা করা এবং মানসিক হয়রানি প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট বিধিমালা যুক্ত করতে হবে। এই সংশোধনে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়কে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW)-এর সাথে নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে।
  • স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS), ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR)-এর সহযোগিতায় একটি জাতীয় পেশাগত মানসিক স্বাস্থ্য নজরদারি ব্যবস্থা (National Occupational Mental Health Surveillance System) প্রতিষ্ঠা করবে। এই ব্যবস্থা বিভিন্ন শিল্প ও পেশায় মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার প্রকোপ, কারণ এবং প্রভাব সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ করবে, যা নীতি প্রণয়নে সহায়ক হবে।
  • জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট (NIMH), স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW)-এর সহায়তায়, নিয়োগকর্তা এবং মানবসম্পদ পেশাজীবীদের জন্য কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা চিহ্নিতকরণ, ব্যবস্থাপনা এবং প্রতিরোধের উপর প্রামাণ্য নির্দেশিকা ও প্রশিক্ষণ মডিউল তৈরি করবে। এর মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় পেশাদারদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: অ্যাডভোকেট তানিয়া

অ্যাডভোকেট তানিয়া 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: কর্মক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্য ও শ্রম আইন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Aucun commentaire trouvé


News Card Generator