সার, বীজ ও কৃষি ভর্তুকিতে ব্যাপক দুর্নীতি: প্রান্তিক কৃষকের হাহাকার | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

সার, বীজ ও কৃষি ভর্তুকিতে ব্যাপক দুর্নীতি: প্রান্তিক কৃষকের হাহাকার

আব্দুল্লাহ আল নোমান  avatar   
আব্দুল্লাহ আল নোমান
সার, বীজ ও কৃষি ভর্তুকিতে ব্যাপক দুর্নীতি: প্রান্তিক কৃষকের হাহাকার
সার, বীজ ও কৃষি ভর্তুকিতে ব্যাপক দুর্নীতি: প্রান্তিক কৃষকের হাহাকার
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি খাত, আর এই খাতের প্রাণভোমরা হলেন প্রান্তিক কৃষকেরা। সরকার কৃষকদের কল্যাণে প্রতি বছর সার, বীজ, কৃষি যন্ত্রপাতি ও অন্...

বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষি খাত, আর এই খাতের প্রাণভোমরা হলেন প্রান্তিক কৃষকেরা। সরকার কৃষকদের কল্যাণে প্রতি বছর সার, বীজ, কৃষি যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য উপকরণে হাজার হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিলেও, মাঠপর্যায়ে এর সুফল পৌঁছানো নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সার বিতরণ থেকে শুরু করে বীজ ও কৃষি উপকরণ প্রণোদনা কর্মসূচিতে ব্যাপক দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির কারণে প্রকৃত কৃষকেরা তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এক শ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা, ডিলার ও স্থানীয় প্রভাবশালী চক্রের যোগসাজশে সরকারের মহতী উদ্যোগ ভেস্তে যাচ্ছে, যার ফলে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষকের জীবন-জীবিকা উভয়ই হুমকির মুখে পড়ছে।

সার বিতরণে অনিয়ম ও সিন্ডিকেট একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা, যা সাম্প্রতিক সময়ে আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি) এবং বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) কর্তৃক ডিলার নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা এবং তদারকির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্তে প্রায় ২,৩১১ জন ভুয়া ডিলার চিহ্নিত হয়েছে, যারা কেবল কাগজে-কলমেই বিদ্যমান। এছাড়া, অনেক ব্যক্তি নিজের নামে এবং স্ত্রী, সন্তান, ভাই-বোনের নামে একাধিক ডিলারশিপ নিয়ে বিপুল পরিমাণ সার উত্তোলন করছেন, যা এক জেলায় সারের আধিক্য এবং অন্য জেলায় তীব্র সংকট সৃষ্টি করছে। কৃষকদের অভিযোগ, ডিলাররা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে সরকার নির্ধারিত ভর্তুকির সার কালোবাজারে চড়া দামে বিক্রি করছে। কুড়িগ্রামে ডিলারের গুদাম ভেঙে কৃষকদের সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, যা সারের সংকট ও কৃষকদের ক্ষোভের তীব্রতা প্রমাণ করে। এই অনিয়ম রোধে সরকার 'সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০০৯' সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে, যার মাধ্যমে দরপত্র প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনা, বিএডিসি-বিসিআইসি'র আলাদা ডিলার ব্যবস্থা তুলে দেওয়া এবং ডিলারের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। কৃষি সচিব সারের অনিয়ম-দুর্নীতিতে সরকারের 'জিরো টলারেন্স' নীতির কথা উল্লেখ করলেও, মাঠপর্যায়ে এর বাস্তবায়ন প্রশ্নবিদ্ধ।

বীজ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ বিতরণেও একই ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র বিদ্যমান। মদন উপজেলায় প্রণোদনার বীজ-সার বিতরণে মাস্টার রোলে স্বাক্ষর ও টিপসই জাল করে ১০-১৫ জন কৃষকের বরাদ্দ একজনই উত্তোলন করে নিয়ে যাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এমনকি নারীদের ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করে বীজ-সার উত্তোলন করে বিক্রিও করা হচ্ছে। নাটোরের বড়াইগ্রামে ভুয়া তালিকা করে প্রকৃত কৃষকদের সার-বীজ আত্মসাৎ করা হয়েছে, যেখানে প্রণোদনার উপকরণ পেয়ে অনেক ভুয়া কৃষক তা বাজারের সার ব্যবসায়ীর দোকানে বিক্রি করে দিয়েছেন। ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির বরাদ্দ থাকলেও অধিকাংশ প্রান্তিক কৃষক তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, যেখানে স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ—প্রকৃত কৃষকদের বাদ দিয়ে রাজনৈতিক পরিচয়ধারী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠদের মধ্যে এসব উপকরণ বিতরণ করা হচ্ছে। চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়ও একই চিত্র দেখা গেছে, যেখানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কিছু অসাধু কর্মকর্তা স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে নামের তালিকা তৈরি করে বিনামূল্যে সার-বীজ উত্তোলন করে কম দামে ডিলারদের কাছে বিক্রি করছেন, ফলে কৃষকদের চড়া দামে সেগুলো কিনতে হচ্ছে। কুষ্টিয়া ও সাতক্ষীরাতেও প্রণোদনার সার ও বীজ বিতরণে কৃষি বিভাগের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে, যেখানে প্রান্তিক কৃষকেরা সরকারি বরাদ্দের এসব উপকরণ পাননি। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলায় ধান বীজ বিতরণে অনিয়ম হাতেনাতে ধরা পড়লেও জড়িত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুই মাস ধরে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পেও দুর্নীতির কালো ছায়া পড়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) 'কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্প'-এর আওতায় ৪০ হাজার কৃষি যন্ত্র (যেমন হারভেস্টার মেশিন) বিতরণে অনিয়মের অভিযোগে দেশজুড়ে ছয়টি স্থানে একযোগে অভিযান চালিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত কৃষক নির্ধারণে জালিয়াতি ও প্রতারণার আশ্রয় নেওয়া হয়েছে, কৃষকদের কাছ থেকে হারভেস্টার মেশিনের দাম বাবদ প্রকৃত দামের চেয়ে তিন গুণ বেশি অর্থ আদায় করা হয়েছে এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের গাফিলতি ছিল। অভিযানকালে একই পরিবারের বিভিন্ন সদস্যদের নামে একাধিক মেশিন বরাদ্দ, এমনকি একজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরিবারের সদস্যদের নামে ১০টি মেশিন বিতরণের তথ্য পাওয়া গেছে। এছাড়াও, একই মেশিন দুইবার বিতরণ, নিকটাত্মীয়দের নামে একাধিক মেশিন পাওয়া এবং মেশিন প্রাপ্তির পরপরই বিক্রি করে দেওয়ার মতো অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে। সামগ্রিকভাবে কৃষি অফিসগুলোতেও ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে, যেখানে কৃষক প্রশিক্ষণ, মাঠ দিবস, প্রদর্শনী, কৃষি যন্ত্রপাতিতে ভর্তুকি ও দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বরাদ্দের সিংহভাগ লুটপাট হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকদের স্বাক্ষর ও টিপসই ফাঁকা কলামে নিয়ে বরাদ্দ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন দেশ থেকে আসা বিনামূল্যে বিতরণের সবজির বীজ কৃষি মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা কোম্পানির কাছে বিক্রি করে টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। কৃষি মন্ত্রণালয় সম্প্রতি ১০৯ জন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দিয়েছে এবং ১৯ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে, পাশাপাশি শতাধিক কর্মকর্তার দুর্নীতির তদন্তের জন্য দুদকে পাঠিয়েছে।

এই লাগামহীন দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে দেশের কৃষি খাত এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। একদিকে সরকার কৃষকদের উন্নয়নে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে, অন্যদিকে সেই অর্থের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে অসাধু চক্রের পকেটে। এর ফলে প্রকৃত কৃষকেরা তাদের প্রাপ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, উৎপাদন খরচ বাড়ছে, এবং অনেক কৃষক কৃষি কাজ ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এটি কেবল কৃষকদের ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়, বরং দেশের সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদন, গ্রামীণ অর্থনীতি এবং জাতীয় উন্নয়নে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কৃষকদের মধ্যে হতাশা বাড়ছে এবং সরকারি সহায়তার প্রতি তাদের আস্থা কমছে। যদি এই পরিস্থিতি চলতে থাকে, তবে দেশের কৃষি খাত তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে ব্যর্থ হবে এবং খাদ্য নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

সুপারিশ: কৃষি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে এবং প্রান্তিক কৃষকদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা জরুরি: ১. সার, বীজ ও কৃষি উপকরণ বিতরণে একটি ডিজিটাল ও বায়োমেট্রিক পদ্ধতি চালু করতে হবে, যেখানে প্রকৃত কৃষকের নিবন্ধন ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া কঠোরভাবে অনুসরণ করা হবে। ২. সার ডিলার নিয়োগ নীতিমালা দ্রুত সংশোধন করে ভুয়া ডিলারদের বাতিল করতে হবে এবং ডিলারশিপে স্বচ্ছতা আনতে হবে, যাতে কোনো ব্যক্তি বা পরিবার একাধিক ডিলারশিপ নিতে না পারে। ৩. কৃষি যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের মতো বৃহৎ প্রকল্পগুলোতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ৪. কৃষি অফিসের কর্মকর্তাদের নিয়মিত তদারকি ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং অনিয়মের অভিযোগ পেলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। ৫. কৃষকদের জন্য বরাদ্দকৃত সকল তথ্য (যেমন: ভর্তুকির পরিমাণ, উপকরণের তালিকা) সহজে প্রাপ্তিসাধ্য করতে হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে কৃষক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: আব্দুল্লাহ আল নোমান

আব্দুল্লাহ আল নোমান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: সার, বীজ ও কৃষি ভতুর্কি।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator