গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন

ড. সায়মা হুদা  avatar   
ড. সায়মা হুদা
গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত-এর অজানা দিক: গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ের প্রতিবেদন
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গত পাঁচ বছরে গবেষণা ও উন্...

সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গত পাঁচ বছরে গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে বরাদ্দকৃত অর্থের পরিমাণ নামমাত্র বৃদ্ধি পেলেও, এর ফলস্বরূপ উদ্ভাবন বা প্রায়োগিক গবেষণার সংখ্যা প্রত্যাশিত হারে বাড়েনি। ২০২২-২৩ অর্থবছরে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) কর্তৃক গবেষণা অনুদান বাবদ প্রায় ১৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হলেও, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কীভাবে প্রকৃত গবেষণা ও উন্নয়নে গতি আনছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে। এই পরিস্থিতি বাংলাদেশের R&D খাতের এক গভীর অজানা দিক উন্মোচন করে, যেখানে অর্থায়ন সত্ত্বেও কার্যকর ফলাফল লাভে প্রতিবন্ধকতা স্পষ্ট।

বাংলাদেশের R&D খাত, বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা ও শিল্প ক্ষেত্রে, এক জটিল চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। একদিকে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মৌলিক গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও উন্নত ল্যাবরেটরির অভাব রয়েছে, অন্যদিকে তেমনি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোও তাদের নিজস্ব R&D ইউনিটে বিনিয়োগে অনীহা প্রকাশ করে। ইউজিসি (UGC) তার বার্ষিক প্রতিবেদনে বারবার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে প্রায়োগিক গবেষণায় মনোনিবেশ করার আহ্বান জানালেও, বাস্তব ক্ষেত্রে দেখা যায়, বেশিরভাগ গবেষণাই কেবল প্রকাশনা-কেন্দ্রিক হয়ে থাকে, যার সঙ্গে শিল্পের চাহিদা বা সমাজের বাস্তব সমস্যার খুব কমই সংযোগ থাকে। এর ফলে, গবেষণার ফলাফলগুলো প্রায়শই ধুলো জমে থাকে লাইব্রেরির তাকে, যা দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কোনো প্রত্যক্ষ প্রভাব ফেলে না। গবেষণার মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনার জন্য পর্যাপ্ত গবেষণা সহকারী, আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাব এবং গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় ডেটাবেস ও জার্নাল অ্যাক্সেসের সীমাবদ্ধতা এই খাতে এক স্থবিরতা তৈরি করেছে। তাছাড়া, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা সংস্কৃতিতে উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা বিকাশের পরিবর্তে শুধুমাত্র একাডেমিক পদোন্নতির জন্য প্রকাশনার দিকে ঝোঁক থাকায়, প্রায়োগিক গবেষণার সুযোগগুলো প্রায়শই উপেক্ষিত হয়। এই মৌলিক সীমাবদ্ধতা R&D খাতের অজানা দিকগুলোর মধ্যে অন্যতম, যেখানে অর্থ বরাদ্দ হলেও তার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

R&D খাতের অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অজানা দিক হলো দক্ষ জনবলের অভাব এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে এর দুর্বল সংযোগ। জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (কারিশিঅ) দেশের কর্মক্ষম জনশক্তিকে দক্ষ করে তোলার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করলেও, R&D-নির্ভর শিল্প ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় বিশেষায়িত দক্ষতা সম্পন্ন জনবল তৈরিতে এখনো বড় ধরনের ঘাটতি বিদ্যমান। উদাহরণস্বরূপ, অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি টেকনিশিয়ান, ডেটা সায়েন্টিস্ট, বায়োটেকনোলজিস্ট বা অ্যাডভান্সড ম্যাটেরিয়ালস ইঞ্জিনিয়ারদের মতো পেশাদারদের তীব্র সংকট রয়েছে, যারা সরাসরি R&D কার্যক্রমে অবদান রাখতে পারেন। Skills for Employment Investment Program (SEIP)-এর আওতায় বিভিন্ন দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হলেও, এসব প্রশিক্ষণের কারিকুলাম কতটা R&D খাতের পরিবর্তিত চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। অনেক সময় দেখা যায়, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা প্রচলিত শিল্পে কাজ পেলেও, উদ্ভাবনী গবেষণা বা নতুন প্রযুক্তি উন্নয়নের মতো উচ্চমানের R&D কার্যক্রমে তাদের সম্পৃক্ততা সীমিত। এই দুর্বল সংযোগের কারণে, গবেষণা ও উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় একটি শক্তিশালী মানবসম্পদ ভিত্তি তৈরি হচ্ছে না, যা R&D খাতের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে এবং দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। ফলস্বরূপ, বাংলাদেশের R&D খাত আন্তর্জাতিক মানদণ্ড থেকে পিছিয়ে পড়ছে এবং বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছে।

সূচক বাংলাদেশ (২০২২-২৩) উন্নয়নশীল দেশের গড় (২০২২-২৩)
মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) শতাংশ হিসেবে R&D ব্যয় ০.৩% ১.৫%
প্রতি মিলিয়ন জনসংখ্যায় পূর্ণকালীন গবেষকের সংখ্যা ৫০ জন ৩০০ জন
ইউজিসি (UGC) কর্তৃক বরাদ্দকৃত মোট গবেষণা অনুদান (কোটি টাকা) ১৮০ কোটি পর্যবেক্ষণাধীন
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পেটেন্ট প্রাপ্তির সংখ্যা (বার্ষিক) ১০-১৫টি ১০০-২০০টি
শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় যৌথ R&D প্রকল্পের সংখ্যা (বার্ষিক) ৮-১২টি ৩০-৫০টি

উৎস: ইউজিসি বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২২-২৩, BANBEIS শিক্ষা পরিসংখ্যান ২০২২, UNESCO Institute for Statistics (UIS) ডেটাবেস (আনুমানিক)

সুপারিশ

  • জাতীয় গবেষণা নীতি, ২০১৮-এর পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে ইউজিসি (UGC) এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে একটি সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে প্রায়োগিক গবেষণার জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের স্বচ্ছ ব্যবহার, গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ এবং শিল্প-বিশ্ববিদ্যালয় সহযোগিতা বাধ্যতামূলক করা হবে। বিশেষত, ইউজিসিকে এমন একটি ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করতে হবে যেখানে গবেষণার ফলাফল পেটেন্ট ও বাণিজ্যিকীকরণের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিতে সরাসরি অবদান রাখতে পারে।
  • জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর (কারিশিঅ) যেন শিল্প খাতের R&D-নির্ভর চাহিদা পূরণের জন্য উচ্চতর প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কারিকুলাম প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সমন্বিতভাবে কাজ করে। SEIP (Skills for Employment Investment Program) এর আওতায় পরিচালিত প্রোগ্রামগুলোতে অ্যাডভান্সড ম্যানুফ্যাকচারিং, বায়োটেকনোলজি, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এবং ডেটা সায়েন্সের মতো R&D-সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রগুলোতে বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের জন্য বাজেট বৃদ্ধি ও মডিউল তৈরি করতে হবে।
  • শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং BANBEIS (বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো) যেন R&D খাতে বিনিয়োগ, গবেষকের সংখ্যা, গবেষণার ফলাফল, পেটেন্ট এবং বাণিজ্যিকীকরণের ডেটা নিয়মিত সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও প্রকাশ করার জন্য একটি জাতীয় R&D ডেটা পোর্টাল প্রতিষ্ঠা করে। এই পোর্টালটি দেশের R&D খাতের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ চিত্র তুলে ধরবে এবং ভবিষ্যৎ নীতি প্রণয়ন ও বিনিয়োগ আকর্ষণে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: ড. সায়মা হুদা

ড. সায়মা হুদা 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাত। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Hiçbir yorum bulunamadı


News Card Generator