হংকং কনভেনশন ও জাহাজ ভাঙা শিল্প: বাংলাদেশের প্রস্তুতি বনাম বাস্তবতা | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

হংকং কনভেনশন ও জাহাজ ভাঙা শিল্প: বাংলাদেশের প্রস্তুতি বনাম বাস্তবতা

জাহাঙ্গীর আলম  avatar   
জাহাঙ্গীর আলম
হংকং কনভেনশন ও জাহাজ ভাঙা শিল্প: বাংলাদেশের প্রস্তুতি বনাম বাস্তবতা
হংকং কনভেনশন ও জাহাজ ভাঙা শিল্প: বাংলাদেশের প্রস্তুতি বনাম বাস্তবতা
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকার হংকং কনভেনশন (Hong Kong Convention for the Safe and Environmentally Sound Recycling of Ships) অনুসমর্থন করে জাহাজ ভাঙা শিল্পের আন্তর...

সম্প্রতি, বাংলাদেশ সরকার হংকং কনভেনশন (Hong Kong Convention for the Safe and Environmentally Sound Recycling of Ships) অনুসমর্থন করে জাহাজ ভাঙা শিল্পের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উন্নীত হওয়ার এক ঐতিহাসিক অঙ্গীকার করেছে। যদিও এই পদক্ষেপকে শিল্পমহল ও পরিবেশবিদরা স্বাগত জানিয়েছেন, ওয়ার্ল্ড ব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB)-এর সাম্প্রতিক মূল্যায়নগুলি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, এই উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য অর্জনে বাংলাদেশের বিদ্যমান অবকাঠামো, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং নিয়ন্ত্রক কাঠামোতে এখনও বড় ধরনের শূন্যতা রয়েছে। ২০২৩ সালের জুন মাসে প্রকাশিত ওয়ার্ল্ড ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রায় ৮০ শতাংশ জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ড এখনও কনভেনশনের মৌলিক নিরাপত্তা ও পরিবেশগত মান পূরণে ব্যর্থ। এই বাস্তবতা ইঙ্গিত করে যে, অনুসমর্থন শুধুমাত্র একটি আইনি প্রক্রিয়ার শুরু মাত্র, প্রকৃত প্রস্তুতি এবং বাস্তবায়ন এখনও অনেক দূর। দেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প, যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম, তার ঐতিহ্যবাহী স্লাইডিং পদ্ধতি থেকে আধুনিক, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে উত্তরণের জন্য এক বিশাল চ্যালেঞ্জের মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, যেমন শিল্প মন্ত্রণালয় ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, এই রূপান্তরের জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করলেও, এর বাস্তবায়ন গতি অত্যন্ত ধীর এবং সমন্বয়হীনতা স্পষ্ট।

বাংলাদেশের জাহাজ ভাঙা শিল্প প্রতি বছর প্রায় ২.৫ মিলিয়ন টন স্ক্র্যাপ স্টিল সরবরাহ করে, যা দেশের ইস্পাত শিল্পের কাঁচামালের প্রায় ৫০-৬০ শতাংশ পূরণ করে এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ২ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। তবে, এই শিল্পের বেশিরভাগ ইয়ার্ডেই কর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE), জরুরি চিকিৎসা সুবিধা, অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা এবং বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক পদ্ধতি অনুপস্থিত। কনভেনশনের মূল শর্তগুলির মধ্যে রয়েছে ইয়ার্ডগুলিতে 'ইনভেন্টরি অফ হ্যাজার্ডাস ম্যাটেরিয়ালস' (IHM) নিশ্চিত করা, বিপজ্জনক বর্জ্যের জন্য সুরক্ষিত স্টোরেজ ও ডিসপোজাল ব্যবস্থা থাকা, স্লিপওয়ে বা ড্রাই ডকিং পদ্ধতি ব্যবহার করা এবং কর্মীদের জন্য উচ্চমানের প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। বাস্তব চিত্র হলো, অনেক ইয়ার্ডেই জাহাজ ভাঙার সনাতন পদ্ধতি, যেমন জোয়ারের উপর নির্ভরশীল 'বিচিং' পদ্ধতি, এখনও প্রচলিত। এই পদ্ধতিতে জাহাজকে সরাসরি সৈকতে টেনে নিয়ে ভাঙা হয়, যা পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। ভারী ধাতু, অ্যাসবেস্টস, পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন (PAHs) এবং অন্যান্য বিষাক্ত পদার্থ মাটি ও পানিতে মিশে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের পাশাপাশি উপকূলীয় মানুষের স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিবেশ অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত নিয়মিত পরিদর্শনেও অনেক সময় এই অনিয়মগুলি উঠে আসে, কিন্তু পর্যাপ্ত জনবল ও প্রয়োগের অভাবে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। হংকং কনভেনশন বাস্তবায়নে শুধুমাত্র প্রযুক্তির পরিবর্তন নয়, বরং একটি সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিবর্তন এবং জবাবদিহিতার পরিবেশ তৈরি করা অপরিহার্য।

এই বিশাল রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় বিনিয়োগের পরিমাণও নেহাত কম নয়। ADB-এর একটি প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রতিটি জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডকে হংকং কনভেনশনের মানদণ্ডে উন্নীত করতে গড়ে প্রায় ৫-১০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হতে পারে। দেশের প্রায় ১৫০টিরও বেশি ইয়ার্ডের জন্য এই অঙ্ক হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে। যদিও বাংলাদেশ সরকার 'বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮' এবং 'বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা, ২০২০' প্রণয়ন করেছে, এর বাস্তবায়নে আর্থিক প্রণোদনা এবং সহজ শর্তে ঋণের অভাব একটি বড় বাধা। স্থানীয় ব্যাংকগুলি প্রায়শই এই খাতে দীর্ঘমেয়াদী ও বৃহৎ বিনিয়োগে দ্বিধাগ্রস্ত থাকে, কারণ ইয়ার্ডগুলির আধুনিকীকরণ ব্যয়বহুল এবং প্রাথমিক পর্যায়ে লাভজনকতা কম হতে পারে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক এবং ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি কারিগরি সহায়তা ও পরামর্শ প্রদান করলেও, সরাসরি বৃহৎ আকারের অর্থায়ন এখনও সীমিত। ফলে, অনেক ইয়ার্ড মালিকই ব্যয়বহুল আধুনিকীকরণ প্রক্রিয়া এড়িয়ে যাচ্ছেন, যা শিল্পটিকে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে এবং 'গ্রিন শিপ রিসাইক্লিং' (Green Ship Recycling) এর বৈশ্বিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত করছে। এই শিল্পে বিনিয়োগের অভাব কেবল পরিবেশগত ক্ষতিই করছে না, বরং শ্রমিকদের জীবনহানি ও পঙ্গুত্বের ঘটনাকেও বাড়িয়ে তুলছে, যা দেশের শ্রমবাজার এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থার কাছে বাংলাদেশের ভাবমূর্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

সূচক বর্তমান বাস্তবতা (আনুমানিক) হংকং কনভেনশন লক্ষ্যমাত্রা
মোট জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডের সংখ্যা ১৫০+ ১৫০+ (সব ইয়ার্ড HKC সম্মত)
HKC মানসম্মত ইয়ার্ডের শতাংশ ১৫-২০% ১০০%
প্রতি বছর সংগৃহীত স্ক্র্যাপ স্টিল (মিলিয়ন টন) ২.৫ - ৩.০ ২.৫ - ৩.০ (পরিবেশবান্ধব উপায়ে)
কর্মক্ষেত্রে দুর্ঘটনার হার (প্রতি বছর, গুরুতর) ২০-৩০টি ০-৫টি
গড় ইয়ার্ড আধুনিকীকরণ ব্যয় (মিলিয়ন USD) ০ ৫-১০

উৎস: বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ সমিতি (BSBRA), পরিবেশ অধিদপ্তর, World Bank, ADB-এর প্রতিবেদন ও শিল্প বিশেষজ্ঞদের প্রাক্কলন।

সুপারিশ

  • বাংলাদেশ সরকার, বিশেষ করে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, 'বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ আইন, ২০১৮' এবং 'বাংলাদেশ জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ বিধিমালা, ২০২০'-এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য নৌপরিবহন অধিদপ্তর এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শক ও এনফোর্সমেন্ট কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ করতে হবে, যাতে নিয়মিত ও অনিয়মিত পরিদর্শন, জরিমানা ও প্রয়োজনে লাইসেন্স বাতিল করার ক্ষমতা কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা যায়।
  • বাংলাদেশ ব্যাংক, অর্থ মন্ত্রণালয়ের সাথে সমন্বয় করে, জাহাজ ভাঙা ইয়ার্ডগুলির আধুনিকীকরণের জন্য একটি বিশেষ 'গ্রিন ফাইন্যান্সিং স্কিম' চালু করবে। এই স্কিমের আওতায় ইয়ার্ড মালিকদেরকে দীর্ঘমেয়াদী, স্বল্প সুদের ঋণ এবং কর অব্যাহতি বা ভর্তুকি প্রদান করতে হবে, যাতে তারা হংকং কনভেনশনের মানদণ্ড অনুযায়ী অবকাঠামো উন্নয়নে (যেমন - ইম্পারমিয়েবল প্যাড, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, আধুনিক উত্তোলন সরঞ্জাম) বিনিয়োগে উৎসাহিত হয়। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক ও ADB-এর মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলির সাথে অংশীদারিত্ব করে এই তহবিল গঠন করা যেতে পারে।
  • শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, নৌপরিবহন অধিদপ্তর এবং শিল্প মালিকদের সংগঠন (যেমন BSBRA)-এর সহযোগিতায়, জাহাজ ভাঙা শিল্পের সকল স্তরের কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক, আন্তর্জাতিক মানসম্মত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করবে। এই প্রশিক্ষণে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা সরঞ্জাম ব্যবহার, বিপজ্জনক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, অগ্নি নিরাপত্তা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই লক্ষ্যে দেশের প্রধান জাহাজ ভাঙা অঞ্চলে একটি বা একাধিক বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করা যেতে পারে, যা কর্মীদের দক্ষতা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: জাহাঙ্গীর আলম

জাহাঙ্গীর আলম 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: শিপবিল্ডিং ও জাহাজ ভাঙা শিল্প। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

No se encontraron comentarios


News Card Generator