সম্প্রতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক জাতীয় লজিস্টিকস নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ এবং এর খসড়া প্রকাশ, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলে সরবরাহ চেইন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনার গুরুত্বকে নতুন করে সামনে এনেছে। বিশ্বব্যাংকের লজিস্টিকস পারফরম্যান্স ইনডেক্স (LPI) ২০২৩-এ বাংলাদেশের অবস্থান ১০৯তম, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের নিচে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, এটি আমাদের রফতানি প্রতিযোগিতা, উৎপাদন ব্যয় এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। বিশেষ করে, পোশাক শিল্পে লিড টাইম কমানো এবং কৃষিপণ্যের সঠিক বাজারজাতকরণে লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে চট্টগ্রাম বন্দরের কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ে বিলম্ব বা কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সে দীর্ঘসূত্রিতা প্রায়শই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসে। এই প্রেক্ষাপটে, সরবরাহ চেইন ও লজিস্টিকস সম্পর্কে প্রচলিত কিছু ধারণা এবং বাস্তবতার চুলচেরা বিশ্লেষণ অপরিহার্য।
বাংলাদেশের সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় মিথগুলোর একটি হলো, 'কম মজুরিই আমাদের রফতানি সাফল্যের একমাত্র চাবিকাঠি'। বাস্তবতা হলো, শুধুমাত্র কম মজুরি দিয়ে দীর্ঘমেয়াদী বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা ধরে রাখা অসম্ভব, যদি না পণ্য উৎপাদন থেকে শুরু করে চূড়ান্ত গ্রাহকের কাছে পৌঁছানো পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি দক্ষ ও ব্যয়সাশ্রয়ী হয়। পণ্য পরিবহনে উচ্চ ব্যয়, বন্দরের সক্ষমতার অভাব, এবং শুল্ক ও কাস্টমস প্রক্রিয়ায় ডিজিটালকরণের অভাব এই মিথকে দুর্বল করে দেয়। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (CPD) এর বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদনে বারবার উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (GDP) প্রায় ১৫-২০ শতাংশ ব্যয় হয় লজিস্টিকস খাতে, যা প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। এই উচ্চ ব্যয় একদিকে যেমন স্থানীয় শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তেমনি রফতানিকারকদের বৈশ্বিক বাজারে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে দিচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি তৈরি পোশাক কারখানার পণ্য জাহাজীকরণে সময়ক্ষেপণ বা ভুল ব্যবস্থাপনার কারণে ক্রেতা প্রতিষ্ঠান থেকে অর্ডার হারানোর ঘটনা নতুন নয়। শুধু পরিবহন নয়, গুদামজাতকরণ, ইনভেন্টরি ম্যানেজমেন্ট, এবং তথ্যের সঠিক প্রবাহ নিশ্চিত করাও লজিস্টিকসের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যেখানে আমাদের এখনো অনেক ঘাটতি রয়েছে। NBR-এর কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়করণ এবং 'জাতীয় একক জানালা' (National Single Window) বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত এই ব্যয় নিয়ন্ত্রণ কঠিন।
আরেকটি ভুল ধারণা হলো, 'সাপ্লাই চেইন মানে শুধু পণ্য পরিবহন'। এই ধারণাটি লজিস্টিকসের ব্যাপকতা এবং এর বহুমুখী প্রভাবকে খাটো করে দেখে। আধুনিক সাপ্লাই চেইন ব্যবস্থাপনা একটি জটিল ইকোসিস্টেম, যা ইনবাউন্ড লজিস্টিকস (কাঁচামাল সংগ্রহ), ইন-হাউস লজিস্টিকস (উৎপাদন ও গুদামজাতকরণ), আউটবাউন্ড লজিস্টিকস (পণ্য বিতরণ), এবং রিভার্স লজিস্টিকস (ফেরত পণ্য ব্যবস্থাপনা) সহ আরও অনেক কিছুকে অন্তর্ভুক্ত করে। এর সাথে তথ্য প্রযুক্তি, ফিন্যান্সিয়াল লজিস্টিকস, এবং মানবিক সম্পদ ব্যবস্থাপনাও নিবিড়ভাবে জড়িত। বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (BSEC) এর অধীনে পুঁজিবাজারের মাধ্যমে লজিস্টিকস অবকাঠামোতে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা যেতে পারে, যা বড় আকারের বন্দর উন্নয়ন, ওয়্যারহাউস বা কোল্ড চেইন ফ্যাসিলিটিজ নির্মাণে সহায়ক হতে পারে। বর্তমানে, অধিকাংশ লজিস্টিকস অবকাঠামো সরকারি বিনিয়োগ বা সীমিত বেসরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল। এই সীমাবদ্ধতা দেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্য চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে, কৃষিভিত্তিক রফতানি পণ্যের জন্য একটি কার্যকর কোল্ড চেইন লজিস্টিকস ব্যবস্থার অভাব প্রায়শই উৎপাদকদের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত করে এবং পণ্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। EPB-এর রফতানি লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে এই ধরনের অবকাঠামোগত দুর্বলতা একটি বড় বাধা। চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের যুগে, ডেটা অ্যানালিটিকস এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সাপ্লাই চেইনের প্রতিটি ধাপকে অপটিমাইজ করা সম্ভব, যা আমাদের দেশে এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে।
সাপ্লাই চেইন ও লজিস্টিকস ব্যবস্থাপনার উন্নতির জন্য একটি সমন্বিত ও কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য। এখানে কিছু বাস্তব ডেটা উল্লেখ করা হলো যা বর্তমান পরিস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে তোলে:
| সূচক | ২০২২-২৩ অর্থবছর | ২০২১-২২ অর্থবছর | পরিবর্তন (শতাংশ) |
|---|---|---|---|
| লজিস্টিকস ব্যয় (জিডিপি'র শতাংশ) | ১৫.৫% | ১৫.৮% | -০.৩% |
| চট্টগ্রাম বন্দরের গড় জাহাজ টার্নঅ্যারাউন্ড সময় (দিন) | ৩.৫ দিন | ৪.২ দিন | -০.৭ দিন |
| রফতানি আয় (EPB ডেটা, বিলিয়ন ডলার) | ৫৩.১২ বিলিয়ন | ৫২.০৮ বিলিয়ন | +২.০১% |
| এনবিআর কাস্টমস রাজস্ব বৃদ্ধি (বার্ষিক) | ১৪.৮% | ১৭.৩% | -২.৫% |
উৎস: বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ, EPB এবং NBR-এর প্রাথমিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ, CPD গবেষণা প্রতিবেদন ২০২৩।
সুপারিশ
- বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কে অবিলম্বে 'জাতীয় লজিস্টিকস নীতি' চূড়ান্ত করে কার্যকর বাস্তবায়নের রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে। এই নীতিতে আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় (যেমন – নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, রেলওয়ে মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়) নিশ্চিত করতে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন টাস্কফোর্স গঠন করা উচিত, যা মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থার (সড়ক, রেল, নৌপথ) সমন্বিত উন্নয়নে কাজ করবে।
- NBR-কে কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ ডিজিটাল ও স্বয়ংক্রিয় করতে 'জাতীয় একক জানালা' (National Single Window) প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। শুল্কায়ন ও ছাড়করণে কাগজবিহীন লেনদেন এবং ঝুঁকি-ভিত্তিক অডিট পদ্ধতির মাধ্যমে ব্যবসায়ী ব্যয় ও সময় কমাতে সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করা আবশ্যক।
- BSEC-কে লজিস্টিকস অবকাঠামো খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণে পুঁজিবাজারের ভূমিকা সম্প্রসারণ করতে হবে। বিশেষ করে, দীর্ঘমেয়াদী বন্ড মার্কেট এবং ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফান্ডের মাধ্যমে গভীর সমুদ্রবন্দর, বিশেষায়িত ওয়্যারহাউস, এবং কোল্ড চেইন ফ্যাসিলিটিজ নির্মাণে অর্থায়ন সহজ করতে নীতিগত প্রণোদনা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা উচিত, যা 'বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বন্ড) বিধিমালা, ২০১৫' এর আওতায় নির্দিষ্ট সংশোধনী বা নতুন নীতিমালা যোগ করে করা যেতে পারে।