প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

কাজী মাকসুদুল হক  avatar   
কাজী মাকসুদুল হক
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি, দেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) তাদের এক প্রতিবেদনে মাধ্যমিক স্তর থেকে আগত শিক্ষার্থীদের মৌলিক বিশ্লেষণাত্মক ...

সম্প্রতি, দেশের উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (UGC) তাদের এক প্রতিবেদনে মাধ্যমিক স্তর থেকে আগত শিক্ষার্থীদের মৌলিক বিশ্লেষণাত্মক দক্ষতা এবং প্রায়োগিক জ্ঞানে ঘাটতির বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। একই সময়ে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় কর্তৃক নতুন জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা বাস্তবায়নের চলমান প্রক্রিয়া, বিশেষত মূল্যায়ন পদ্ধতির পরিবর্তন নিয়ে জনমনে আলোচনা তুঙ্গে। এই পরিস্থিতি কেবল শিক্ষাবিদদের নয়, নীতি প্রণেতা, অভিভাবক এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে: আমাদের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম কি শিক্ষার্থীদের একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রস্তুত করতে পারছে, নাকি এটি নীতি প্রণেতাদের দুর্বল পরিকল্পনা অথবা সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটির ফসল?

বাংলাদেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম দীর্ঘকাল ধরে মুখস্থ-নির্ভরতা এবং তত্ত্বীয় জ্ঞানের উপর অধিক জোর দিয়ে আসছে। যদিও সম্প্রতি নতুন শিক্ষাক্রম প্রবর্তনের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক শিখন এবং প্রায়োগিক দক্ষতার উপর গুরুত্ব আরোপের চেষ্টা করা হয়েছে, মাঠ পর্যায়ে এর বাস্তবায়ন বহুলাংশে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ছে। শিক্ষার্থীরা এখনও সৃজনশীলতা, সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা এবং সমস্যা সমাধানের মতো মৌলিক দক্ষতা অর্জনে পিছিয়ে থাকছে, যা উচ্চশিক্ষার প্রবেশদ্বারেই তাদের জন্য প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এমনকি, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) কর্তৃক নির্ধারিত জাতীয় দক্ষতা কাঠামোর (National Skills Qualification Framework) সঙ্গে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য প্রায়শই অসংলগ্ন থেকে যায়। ফলস্বরূপ, মাধ্যমিক স্তর পেরিয়ে আসা শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ উচ্চশিক্ষা বা কর্মজীবনে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় মৌলিক দক্ষতা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যা দেশের সামগ্রিক মানবসম্পদ উন্নয়নে এক বড় বাধা। কর্মসংস্থান বাজারে ক্রমবর্ধমান চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের অর্জিত দক্ষতার এই ব্যবধান দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারাকেও প্রভাবিত করছে, যেখানে উপযুক্ত প্রশিক্ষিত কর্মীর অভাবে অনেক শিল্প খাতকে বিদেশের উপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

এই সমস্যার মূলে রয়েছে কেবল কারিকুলামের ত্রুটি নয়, বরং এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার পদ্ধতিগত দুর্বলতা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও, মাঠ পর্যায়ে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ, অবকাঠামোগত সহায়তা এবং পর্যাপ্ত সম্পদের অভাব এই নতুন শিক্ষাক্রমের উদ্দেশ্য পূরণে বাধা সৃষ্টি করছে। অধিকাংশ শিক্ষকই নতুন শিক্ষাক্রমের অন্তর্নিহিত দর্শন, অভিজ্ঞতা-ভিত্তিক শিখন পদ্ধতি এবং ধারাবাহিক মূল্যায়নের কৌশল সম্পর্কে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও ধারণা পাননি। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS)-এর বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আধুনিক বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব এবং পাঠাগারের মতো প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব রয়েছে, যা প্রায়োগিক ও দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষার জন্য অপরিহার্য। উপরন্তু, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর কর্তৃক পরিচালিত কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা খাতকে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার মূলধারার সঙ্গে একীভূত করার প্রচেষ্টা এখনও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক স্তর থেকেই কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব এবং সম্ভাবনা সম্পর্কে অবগত নয়, যার ফলে মাধ্যমিক স্তরে এসেও তারা সাধারণ শিক্ষার প্রতিই বেশি ঝুঁকে থাকে, অথচ দেশের কর্মসংস্থান বাজারে কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মীর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। এই ধারা শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান এবং দেশের শিল্প খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

সূচক ২০১৮ সাল ২০২২ সাল পরিবর্তন (%)
মাধ্যমিক স্তরে মোট শিক্ষার্থী (লক্ষ) ১৭১.৫ ২০২.৮ +১৮.২%
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় শিক্ষার্থী (মাধ্যমিক স্তর, লক্ষ) ১০.২ ১২.৪ +২১.৬%
শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত (মাধ্যমিক) ১:৩২ ১:২৯ উন্নতি
প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষকের হার (মাধ্যমিক, %) ৬১.৫% ৬৫.২% +৩.৭%
জাতীয় শিক্ষায় বাজেট বরাদ্দ (মোট বাজেট %) ১১.৬% ১২.২% +০.৬%

উৎস: বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরো (BANBEIS), শিক্ষা মন্ত্রণালয়

সুপারিশ

  • শিক্ষা মন্ত্রণালয়, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (NSDA) এবং শিল্প খাতের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি কর্তৃক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রমের একটি বিস্তারিত পর্যালোচনা ও সংস্কার করতে হবে, যা NSDA-এর জাতীয় যোগ্যতা কাঠামোর (National Qualifications Framework) সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে একবিংশ শতাব্দীর জন্য অত্যাবশ্যকীয় সমালোচনামূলক চিন্তাভাবনা, সমস্যা সমাধান ও ডিজিটাল দক্ষতার বিকাশ নিশ্চিত করবে।
  • কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়-এর অধীনে থাকা সকল শিক্ষক প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানকে আধুনিক পাঠদান পদ্ধতি, ডিজিটাল দক্ষতা এবং শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক ধারাবাহিক মূল্যায়নের উপর বাধ্যতামূলক ও নিয়মিত উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এই প্রশিক্ষণের কার্যকারিতা BANBEIS-এর সংগৃহীত তথ্যের ভিত্তিতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং মূল্যায়নের আওতায় আনতে হবে, যাতে প্রশিক্ষিত শিক্ষকগণ নতুন শিক্ষাক্রমের দর্শন সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারেন।
  • UGC-এর পরামর্শক্রমে এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়-এর তত্ত্বাবধানে পাবলিক পরীক্ষার পাশাপাশি ধারাবাহিক মূল্যায়নের পদ্ধতিকে আরও শক্তিশালী ও স্বচ্ছ করতে হবে, যেখানে শিক্ষার্থীদের বাস্তবিক দক্ষতা, প্রায়োগিক জ্ঞান এবং সৃজনশীলতার উপর জোর দেওয়া হবে। BANBEIS-এর মাধ্যমে সংগৃহীত শিক্ষার্থীদের পারফরম্যান্স এবং দক্ষতার তথ্যের ভিত্তিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিত ফলাবর্তন প্রদান করতে হবে এবং এর ভিত্তিতে শিক্ষাপদ্ধতির প্রয়োজনীয় সমন্বয় সাধন করতে হবে, যা শিক্ষার্থীদের সামগ্রিক বিকাশে সহায়ক হবে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: কাজী মাকসুদুল হক

কাজী মাকসুদুল হক 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কারিকুলাম। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

Nessun commento trovato


News Card Generator