খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৬০১ কোটি ৭৯ লাখ ৭ হাজার টাকার প্রস্তাবিত বাজেট ঘোষণা করা হয়েছে। সোমবার দুপুরে নগর ভবনের শহিদ আলতাফ মিলনায়তনে কেসিসি প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু এই বাজেট উপস্থাপন করেন। এবারের বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২১১ কোটি ৯০ লাখ ৫ হাজার টাকা এবং রাজস্ব ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪১ কোটি ৪৪ লাখ ১৭ হাজার টাকা। এছাড়া সরকারি অনুদান বাবদ ১৯৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের বিশেষ খাতে ৭৯ কোটি ৪৬ লাখ ৫৫ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। বিগত অর্থবছরে ৭১৯ কোটি ৫০ লাখ ৩৬ হাজার টাকার প্রস্তাবিত বাজেট থাকলেও সংশোধিত আকারে তা ৩৩৮ কোটি ৯৭ লাখ ২১ হাজার টাকায় নেমে আসে, যা সংস্থার নিজস্ব আয় আহরণে দীর্ঘস্থায়ী কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত দেয়। নিজস্ব তহবিলের ৭১.৭০ শতাংশ এবং উন্নয়ন তহবিলের মাত্র ৩৮.৫২ শতাংশ অর্জনের হার এই অর্থবছরে বিশাল বাজেটের বাস্তবায়নযোগ্যতা নিয়ে জনমনে যৌক্তিক প্রশ্ন তৈরি করেছে। নতুন কোনো কর আরোপ না করে বকেয়া কর আদায়ের মাধ্যমে আয় বৃদ্ধির যে পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষ নিয়েছে, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রশাসনিক কঠোরতার প্রয়োজন অনস্বীকার্য।
বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, নগরবাসীর প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা নিরসন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সড়ক সংস্কারের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে ভুক্তভোগী নাগরিকরা মনে করছেন, অতীতের প্রকল্পগুলোর ধীরগতি এবং দীর্ঘসূত্রতার কারণে সুফল পেতে তাদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। প্রশাসক জানিয়েছেন, সংস্থাপন ব্যয় মিটিয়ে নিজস্ব তহবিল থেকে বিভিন্ন উন্নয়ন খাতে মোট ৭৩ কোটি ৩৫ লাখ ৫৬ হাজার টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে পূর্তখাত, সড়কবাতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও পরিবেশ রক্ষায় উল্লেখযোগ্য অংকের অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া এডিপির জন্য ১৫০ কোটি টাকা এবং জরুরি পানির চাহিদা মেটানোর জন্য ২ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। নাগরিক প্রতিনিধিরা বলছেন, কেবল খাতওয়ারি বরাদ্দ দিলেই হবে না, বরং প্রকল্পগুলোর গুণগত মান নিশ্চিত করা এবং দুর্নীতির উর্ধ্বে থেকে কাজ সম্পন্ন করাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে জিয়া হল কমপ্লেক্স নির্মাণ এবং অবকাঠামো উন্নয়নে বিশাল অংকের বরাদ্দ রাখলেও তা কত দ্রুত দৃশ্যমান হবে, তা নিয়ে নগরবাসীর মধ্যে সংশয় রয়েই গেছে।
বাজেট অনুষ্ঠানে উপস্থিত কেসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রাজিব আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার সহায়তায় প্রায় ৩টি বড় প্রকল্প চলমান রয়েছে। বাজেটে এসব প্রকল্পে ৪৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে ১২ কোটি ৫০ লাখ টাকা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় ২৫ কোটি টাকা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে বিশেষজ্ঞ মহলের মতে, বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন হার বাড়াতে হলে প্রশাসনিক জবাবদিহিতা ও নিয়মিত মনিটরিং প্রয়োজন। নগর অঞ্চল প্রকল্প-২, সাসটেইনেবল আরবান ওয়াটার সাইকেল প্রকল্প এবং ইউনিসেফের স্মার্ট ওয়াশ ইনিশিয়েটিভের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেগুলোর কার্যকারিতা কতটা নগরবাসীর দোরগোড়ায় পৌঁছাবে, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। কর আদায় বাড়াতে নতুন কোনো কর না চাপিয়ে বকেয়া আদায়ের যে কৌশল নেওয়া হয়েছে, তা কতটা সফল হয় সেদিকেই এখন সবার নজর।
পরিশেষে, খুলনা সিটি কর্পোরেশনের এই বাজেট কেবল সংখ্যাতাত্ত্বিক হিসাব নয়, বরং এটি একটি উন্নয়নমুখী পরিকল্পনার প্রতিফলন। তবে এই বাজেটের প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা এবং সময়ের সঠিক ব্যবহারের ওপর। বিগত বছরগুলোতে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অর্জন কম হওয়ার যে প্রবণতা দেখা গেছে, তা থেকে শিক্ষা নিয়ে এবার কর্তৃপক্ষকে অধিকতর কৌশলী হতে হবে। নগরীর ভৌত অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আধুনিক নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গৃহীত এই বাজেট যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা খুলনার জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে। অন্যথায়, প্রতি বছরের মতো এটিও কেবল কাগজ-কলমের পরিকল্পনায় সীমাবদ্ধ থেকে যাবে, যা নগরবাসীর দীর্ঘমেয়াদী ভোগান্তির কারণ হয়েই থাকবে।