নদী দখল ও বালু সিন্ডিকেট: বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংসের অপ্রতিরোধ্য চিত্র | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নদী দখল ও বালু সিন্ডিকেট: বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংসের অপ্রতিরোধ্য চিত্র

হাসিবুল হাসান  avatar   
হাসিবুল হাসান
নদী দখল ও বালু সিন্ডিকেট: বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংসের অপ্রতিরোধ্য চিত্র
নদী দখল ও বালু সিন্ডিকেট: বাংলাদেশের প্রাণ-প্রকৃতি ধ্বংসের অপ্রতিরোধ্য চিত্র
ছবি: সংগৃহীত
নদীমাতৃক বাংলাদেশের অস্তিত্ব আজ গভীর সংকটে। প্রভাবশালী মহল ও অবৈধ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে দেশের নদ-নদীগুলো দখল ও দূষণের শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে। পরিবেশ, বন ও...

নদীমাতৃক বাংলাদেশের অস্তিত্ব আজ গভীর সংকটে। প্রভাবশালী মহল ও অবৈধ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যে দেশের নদ-নদীগুলো দখল ও দূষণের শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান সম্প্রতি অবৈধ বালু উত্তোলনকে সারাদেশে 'মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়া' বলে আখ্যায়িত করেছেন। এই অনিয়ম শুধু পরিবেশের ভারসাম্যই নষ্ট করছে না, বরং দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনকেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নদী দখল, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং সংশ্লিষ্ট খাতে দুর্নীতির অসংখ্য ঘটনা সামনে এলেও কার্যকর প্রতিকার মিলছে খুব কমই।

অবৈধ বালু উত্তোলন বাংলাদেশের নদীগুলোর জন্য এক ভয়াবহ বিপদ। এটি নদীর ব্যাপক ভাঙনের সৃষ্টি করে, যার ফলে বিভিন্ন স্থাপনা, বসতি এবং কৃষিজমি ধ্বংস হচ্ছে। ২০২৩ সালের মে মাসে রাজশাহীর চারঘাটে পদ্মা নদীর ধারে বড়াল নদীর উৎসমুখ পরিদর্শনে গিয়ে উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান উল্লেখ করেন যে, দেশে বালু ও মাটি দস্যুতা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। তিনি আরও জানান, বালুমহাল ইজারা নিয়েও সরকার গত বছর আড়াইশো কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে, কারণ ইজারার শর্ত ভঙ্গ করে নির্দিষ্ট সীমানার বাইরে থেকে বালু উত্তোলন করা হয়, অথবা ইজারা ছাড়াই ইচ্ছেমতো নদী থেকে বালু তোলা হয়। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত একটি গবেষণা ফলাফলে দেখা গেছে, দেশের ২৬৫ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করছে, যার মধ্যে ৫২ জন সরাসরি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী নেতা, ইউনিয়ন পরিষদ ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান। সুনামগঞ্জের ধোপাজান ও জাদুকাটা নদীর মতো বালুমহালগুলো রাজনৈতিক মহল ও সিন্ডিকেট চক্রের দখলে চলে গেছে, যা নদীপাড়ের মানুষের জীবন ও জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ফেলছে। নেত্রকোনার সোমেশ্বরী নদীতে বালুমহাল ইজারা দেওয়ার নামে নদীকে 'হত্যা' করা হচ্ছে, যেখানে প্রভাবশালী ইজারাদাররা নিয়মনীতি না মেনে শত শত ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন করছেন। অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে, নদীর দুই পাড় ভেঙে পড়ছে এবং কৃষিজমি, বসতবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মারাত্মক হুমকির সম্মুখীন হচ্ছে। এর ফলে বায়ু ও শব্দদূষণও বাড়ছে।

নদী দখলও বাংলাদেশের পরিবেশের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ। ২০০৯ সালে উচ্চ আদালতের নির্দেশনার পর ২০১৩ সালে 'জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন আইন' প্রণীত হয় এবং ২০১৪ সালে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন (এনআরসিসি) গঠিত হয় নদী দখল ও দূষণ বন্ধে। কমিশন গঠনের উদ্দেশ্য ছিল নদীর অবৈধ দখল, দূষণ, অবৈধ কাঠামো নির্মাণ ও নানাবিধ অনিয়ম রোধ করে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ পুনরুদ্ধার করা। ২০২৩ সালের অক্টোবরে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন সোনারগাঁ উপজেলার মেঘনা নদী-তীরবর্তী এলাকায় গড়ে ওঠা বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নদী দখলের বিষয়ে তদন্ত শুরু করে, যেখানে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের মতো বড় প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে আসে। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর ও ডিসেম্বরে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন এবং পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান নদী দখলকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দেন এবং জেলা প্রশাসকদের তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেন। দেশের সব নদী দখলমুক্ত করতে বিভাগীয় কমিশনারদের দুই মাসের মধ্যে কর্মপরিকল্পনা জমা দেওয়ার সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ২০১৯ সালে হাইকোর্ট বিভাগের এক রায়ে তুরাগ নদীসহ বাংলাদেশের সব নদীকে 'আইনি সত্তা' বা 'লিগ্যাল পারসন' হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং নদী রক্ষা কমিশনকে তাদের আইনি অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে, এই রায় সত্ত্বেও দখল ও দূষণ অব্যাহত রয়েছে। এমনকি, ৪৮টি নদীর দখলদারদের নিয়ে ২৯ কোটি টাকা ব্যয়ে তৈরি একটি তালিকা জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন প্রকাশ করছে না বলে অভিযোগ উঠেছে, যা জনমনে প্রশ্ন সৃষ্টি করেছে।

এই সমস্যাগুলোর মূলে রয়েছে কাঠামোগত দুর্নীতি ও আইনের দুর্বল প্রয়োগ। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক প্রতিবেদনে পরিবেশ অধিদপ্তরকে দুর্নীতিতে নিমজ্জিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে ঘুষের বিনিময়ে কারখানার মালিকদের পরিবেশগত ছাড়পত্র দেওয়ার মতো গুরুতর অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেছে। পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫ অনুযায়ী সনদপত্রগুলো বাধ্যতামূলক হলেও, অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা জমা না দিয়েই ছাড়পত্র দেওয়া হচ্ছে। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে শক্তিশালী করতে একটি নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হলেও, পরিবেশ অধিদপ্তর ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এর কিছু বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে, যা আইনটির চূড়ান্তকরণে বিলম্ব ঘটাচ্ছে। তাদের যুক্তি, এতে ক্ষমতা দ্বৈততা তৈরি হতে পারে। নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমানও স্বীকার করেছেন যে, নদী রক্ষায় আইন থাকলেও এর প্রয়োগ করার মতো মানুষ বা সাহস নেই। প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তি ও সিন্ডিকেটগুলো আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে নদী ও বালুমহাল দখল করে চলেছে, যার ফলে সরকার বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

নদী দখল ও অবৈধ বালু উত্তোলনের ফলে দেশের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক নদী নাব্য হারিয়ে নালায় পরিণত হয়েছে, যা পানি সংকট সৃষ্টি করছে এবং উত্তরাঞ্চলে মরুকরণের মতো পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। মৎস্য চাষ, নৌপরিবহন এবং কৃষির মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো নদীর উপর নির্ভরশীল, যা দেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখে। নদীর এই বিপর্যয় দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকাকে সরাসরি প্রভাবিত করছে, তাদের গৃহহীন ও ভূমিহীন করে তুলছে। নদীগুলো বিলীন হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের জলবায়ুতেও বড় পরিবর্তন এসেছে, যা দেশের সামগ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে।

সুপারিশ: বাংলাদেশের নদ-নদী এবং পরিবেশ রক্ষায় অবিলম্বে কঠোর ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ অপরিহার্য। প্রথমত, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনকে সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী করতে হবে এবং এর প্রস্তাবিত আইন দ্রুত অনুমোদন করে কার্যকর করতে হবে, যেখানে অন্যান্য সংস্থার সাথে স্পষ্ট সমন্বয় ও ক্ষমতার বিভাজন নিশ্চিত করা হবে। দ্বিতীয়ত, নদী দখলদার ও অবৈধ বালু উত্তোলনকারীদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা অবিলম্বে প্রকাশ করে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে, এক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বালুমহাল ইজারা প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে এবং ইজারার শর্তাবলী কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে হবে। চতুর্থত, পরিবেশ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সকল নিয়ন্ত্রক সংস্থার অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি দূরীকরণে কার্যকর তদন্ত ও সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিতে হবে। পঞ্চমত, নদীর আইনগত সত্তা ঘোষণার হাইকোর্টের রায়টি সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং নদী রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: হাসিবুল হাসান

হাসিবুল হাসান, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: পরিবেশ, নদী দখল ও বালি সিন্ডিকেট।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator