জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পে দুর্নীতির কালো ছায়া: দেশের ভবিষ্যৎ হুমকিতে | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পে দুর্নীতির কালো ছায়া: দেশের ভবিষ্যৎ হুমকিতে

ওয়াসিফ ইকবাল  avatar   
ওয়াসিফ ইকবাল
জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পে দুর্নীতির কালো ছায়া: দেশের ভবিষ্যৎ হুমকিতে
জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্পে দুর্নীতির কালো ছায়া: দেশের ভবিষ্যৎ হুমকিতে
ছবি: সংগৃহীত
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা এবং জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে নিজস্ব ও আন্তর...

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বজুড়ে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা এবং জলবায়ু সহনশীলতা বাড়াতে নিজস্ব ও আন্তর্জাতিক উৎস থেকে প্রাপ্ত জলবায়ু তহবিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, সম্প্রতি প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন ও অনুসন্ধানে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে, যা দেশের পরিবেশ সুরক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে মারাত্মক ঝুঁকির মুখে ফেলছে। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর একাধিক গবেষণায় জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট তহবিল এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যক্রমে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র উন্মোচিত হয়েছে, যা ওয়াসিফ ইকবাল, 'আই নিউজ বিডি'-র একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যবেক্ষণ করছি।

টিআইবি কর্তৃক ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট (বিসিসিটি) এর অধীনে ২০১০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত অনুমোদিত ৮৯১টি প্রকল্পে প্রায় ২ হাজার ১১০ কোটি টাকা (প্রায় ২৪৮.৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার) দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে আত্মসাৎ বা অপচয় করা হয়েছে। এটি বিসিসিটি-এর মোট বরাদ্দের ৫৪ শতাংশেরও বেশি। এই দুর্নীতির মূল ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে প্রকল্প অনুমোদন প্রক্রিয়ায় ঘুষ ও অবৈধ লেনদেন (১৭৫ কোটি টাকা), ঠিকাদার নিয়োগে অনিয়ম (৬০০ কোটি টাকা) এবং বাস্তবায়ন পর্যায়ে অর্থ আত্মসাৎ (১ হাজার ২৮০ কোটি টাকা)। এমনকি তদারকি পর্যায়েও ৫৪ কোটি টাকার ঘুষ লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। ২০১৯-২০২৩ সালের মধ্যে অনুমোদিত সৌর সড়কবাতি স্থাপন সংক্রান্ত প্রকল্পগুলোর অর্ধেকেরও বেশি অতিমূল্যায়নের মাধ্যমে ১৭০ কোটি টাকার বেশি আত্মসাতের অনুমান করা হয়েছে। টিআইবি'র প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, প্রকল্প অনুমোদনে রাজনৈতিক প্রভাব, যোগসাজশ ও স্বজনপ্রীতির প্রবণতা ছিল প্রকট, এবং তহবিল ব্যবস্থাপক হিসেবে বিসিসিটি-এর কর্মকর্তারা এই অনিয়ম রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছেন। এর ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জলবায়ু তহবিলের অপচয় শুধু বিসিসিটি-তেই সীমাবদ্ধ নয়, পরিবেশ অধিদপ্তরও প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে। ২০২১ সালের ১২ নভেম্বর এবং ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর টিআইবি প্রকাশিত প্রতিবেদনে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যক্রমে সুশাসনের চ্যালেঞ্জ এবং দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের বিষয়টি উঠে আসে। পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রদান ও নবায়নে ব্যাপক অনিয়ম ও ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৭ শতাংশ শিল্পকারখানা কোনো প্রকার পরিবেশ ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা ছাড়াই পরিবেশগত ছাড়পত্র পেয়েছে, যা আইনত বাধ্যতামূলক। জরিপের আওতাভুক্ত ৬৬ শতাংশ শিল্পকারখানাকে ছাড়পত্র পেতে ৩৬ হাজার থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত অবৈধ আর্থিক লেনদেন করতে হয়েছে। পরিবেশ দূষণকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে অধিদপ্তরের কর্মীদের একাংশের যোগসাজশ এবং অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে ইটিপি (ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট) অচল রাখা বা জরিমানা মওকুফ করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। এছাড়া, 'নির্মল বায়ু ও টেকসই পরিবেশ' প্রকল্পের আওতায় অযৌক্তিকভাবে একই কর্মকর্তার ১০ বারসহ মোট ২৯৩ জন কর্মকর্তার বিদেশে প্রশিক্ষণের নামে অর্থ অপচয় করা হয়েছে। এসব অনিয়ম দেশের পরিবেশ সুরক্ষা ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দিচ্ছে এবং জনস্বাস্থ্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বাংলাদেশের বার্ষিক প্রায় ১২,৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হলেও, ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক তহবিল থেকে বছরে গড়ে মাত্র ৮৬.২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা প্রয়োজনের মাত্র ০.৭ শতাংশ। এই অপর্যাপ্ত তহবিলের মধ্যেও দুর্নীতির কারণে সম্পদের অপচয় পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলছে। উদাহরণস্বরূপ, ২০২০ সালে টিআইবি এবং সোয়াস ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন-এর যৌথ গবেষণায় দেখা গেছে, অভিযোজন প্রকল্পের প্রায় ৩৫ শতাংশ অর্থ আত্মসাৎ হয়েছে, যার ফলে অনেক বাঁধ, ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অসম্পূর্ণ বা নিম্নমানের রয়ে গেছে। ২০১৬ সালে বরগুনা ও পটুয়াখালীর পোল্ডার নির্মাণ প্রকল্পে ৭২ কোটি টাকার মধ্যে ১৬.৮ কোটি টাকা এবং ২০১৯ সালে মনু নদীর পাম্প হাউজ প্রকল্পে প্রায় ৬৩ শতাংশ অর্থ দুর্নীতিতে অপচয় হয়েছে। এমনকি সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বরের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, সুনামগঞ্জের গ্রামীণ সড়কে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে ১০ লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও অধিকাংশ চারাগাছ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করে যে, তহবিল থাকা সত্ত্বেও সুশাসনের অভাবে তা কার্যকরভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে না। চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ-এর ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৈশ্বিক জলবায়ু অর্থায়ন অনুদানের পরিবর্তে ঋণের ফাঁদে পরিণত হচ্ছে, যা বাংলাদেশের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে 'উচ্চ ঝুঁকির ঋণফাঁদ' বিভাগে ঠেলে দিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন, ২০১০ অনুযায়ী, মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) প্রতি বছর ট্রাস্টের হিসাব নিরীক্ষা করবেন এবং নিরীক্ষা প্রতিবেদন সরকার ও বোর্ডের কাছে পেশ করবেন। কৃষি ও পরিবেশ অডিট অধিদপ্তরও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ সকল দপ্তর ও প্রকল্পের অডিট পরিচালনার জন্য দায়বদ্ধ। তবে, এসব নিরীক্ষা সত্ত্বেও দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না।

সুপারিশ: জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্প খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতি দমনের জন্য অবিলম্বে নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা অপরিহার্য। প্রথমত, বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের সকল প্রকল্পের একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ফরেনসিক অডিট পরিচালনা করতে হবে এবং জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে হবে। ঠিকাদার নিয়োগে ই-টেন্ডারিং পদ্ধতিকে আরও শক্তিশালী করা এবং রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা জরুরি। তৃতীয়ত, জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট আইন, ২০১০ এর কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে এবং মহা হিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক (সিএজি) কর্তৃক প্রদত্ত নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সুপারিশগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। চতুর্থত, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ ও তদারকি বাড়াতে হবে। প্রকল্প নির্বাচন, পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে স্থানীয়দের মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে এবং তাদের অভিযোগ জানানোর জন্য একটি সহজ ও কার্যকর ব্যবস্থা চালু করতে হবে। পঞ্চমত, পরিবেশ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং কর্মীদের নৈতিকতা ও পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে বিনিয়োগ করতে হবে। একই সাথে, পরিবেশগত ছাড়পত্র প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল পদ্ধতি চালু করে মানবীয় হস্তক্ষেপ কমানো উচিত। পরিশেষে, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন যেন অনুদানের পরিবর্তে ঋণের বোঝা না হয়, সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক ফোরামে জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালাতে হবে এবং ন্যায্য ও জনগণকেন্দ্রিক অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।


🔎 অনুসন্ধানে: ওয়াসিফ ইকবাল

ওয়াসিফ ইকবাল, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: জলবায়ু তহবিল ও পরিবেশ প্রকল্প অডিট।

Nenhum comentário encontrado


News Card Generator