জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় মহাপরিচালক (DGHS) সম্প্রতি ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রস্তুতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সংস্থাটি জানিয়েছে, গত বছর ডেঙ্গুর ব্যাপক প্রাদুর্ভাব সত্ত্বেও জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গেছে। বিশেষ করে, ডেঙ্গু শনাক্তকরণ কিট এবং নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (ICU) শয্যার অপ্রতুলতা আসন্ন মৌসুমের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি কেবল ডেঙ্গু নয়, বরং যেকোনো আকস্মিক মহামারী বা জনস্বাস্থ্য সংকটের জন্য আমাদের সামগ্রিক প্রস্তুতির দুর্বল চিত্র তুলে ধরে, যা অতীতে কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ও স্পষ্ট হয়েছিল।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় (MOHFW) জনস্বাস্থ্য নীতি নির্ধারণ ও বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা পালন করলেও, মাঠ পর্যায়ে সেই নীতিসমূহের কার্যকর বাস্তবায়নে প্রায়শই সমন্বয়হীনতা ও দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, মহামারী প্রতিরোধে অত্যাবশ্যকীয় জনবল প্রশিক্ষণ এবং স্বাস্থ্য অবকাঠামো উন্নয়নে যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা প্রয়োজন, তার বাস্তবায়ন প্রায়শই জরুরি অবস্থার চাপ সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত পিছিয়ে থাকে। স্বাস্থ্য খাতে জিডিপি'র অত্যন্ত কম শতাংশ বরাদ্দ (যা ০.৬% এর আশেপাশে ঘোরাফেরা করে) এই দুর্বলতার একটি অন্যতম কারণ। পর্যাপ্ত আর্থিক সংস্থান ছাড়া উন্নত রোগতত্ত্ব নিরীক্ষণ, আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা স্থাপন এবং প্রশিক্ষিত জনবল তৈরি করা অসম্ভব। বিশেষ করে, গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন না হলে যেকোনো মহামারী দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
মহামারীর সময় গুজব ও ভুল তথ্যের বিস্তার জনস্বাস্থ্য প্রচেষ্টাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করে। কোভিড-১৯ ভ্যাকসিন নিয়ে সংশয়, বা অপ্রমাণিত ঘরোয়া প্রতিকারের ওপর নির্ভরশীলতা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। এই ভুল তথ্য মোকাবিলায় ইনস্টিটিউট অব এপিডেমিওলজি, ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড রিসার্চ (IEDCR) এর মতো প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। IEDCR নিয়মিতভাবে রোগতত্ত্ব সংক্রান্ত তথ্য, গবেষণালব্ধ উপাত্ত এবং সঠিক স্বাস্থ্য নির্দেশিকা প্রদান করে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজ করে। তাদের দ্রুত রোগ নির্ণয় ও নিরীক্ষণ সক্ষমতা যেকোনো মহামারীর প্রাথমিক পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণের জন্য অপরিহার্য। পাশাপাশি, মহামারীকালে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর যে তীব্র চাপ পড়ে, তা প্রায়শই উপেক্ষিত থাকে। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH) এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেবল শারীরিক সুস্থতার পরিপূরক নয়, বরং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এর অবদান অনস্বীকার্য। মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়ে প্রচলিত কুসংস্কার দূর করে বিজ্ঞানভিত্তিক পরামর্শ প্রদানে NIMH এর মতো প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় মানসম্মত ঔষধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (DGDA) এই দায়িত্বে নিয়োজিত প্রধান নিয়ন্ত্রক সংস্থা। মহামারীকালে প্রায়শই প্রয়োজনীয় ঔষধের কৃত্রিম সংকট বা উচ্চমূল্যের অভিযোগ ওঠে, যা নিয়ন্ত্রণহীন মুনাফালোভী প্রবণতার ফল। DGDA এর কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এই ধরনের অনিয়ম রোধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঔষধের মান নিয়ন্ত্রণ, উৎপাদন ও আমদানির লাইসেন্স প্রদান, এবং বাজার তত্ত্বাবধানে তাদের ভূমিকা জনমানুষের আস্থা অর্জনে সহায়ক। বিশেষ করে, ভ্যাকসিন ও জীবন রক্ষাকারী ঔষধের সরবরাহ চেইন নিরবচ্ছিন্ন রাখা এবং নকল ঔষধের বিস্তার রোধে DGDA এর সক্ষমতা বৃদ্ধি করা জরুরি। একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন DGDA জনস্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে অপরিহার্য।
| জনস্বাস্থ্য সূচক | ২০২২ সালের তথ্য (DGHS সূত্র) | ২০২৩ সালের তথ্য (DGHS সূত্র) | ২০২৩ সালে পরিবর্তন (%) |
|---|---|---|---|
| মোট ডেঙ্গু রোগী | ৬২,৩৮২ | ৩,২১,১৭৯ | +৪১৫.২১% |
| ডেঙ্গুজনিত মৃত্যু | ২৮১ | ১,৭০৫ | +৫০৬.৭৬% |
| কোভিড-১৯ বুস্টার ডোজ কভারেজ (মোট জনসংখ্যার) | ২৮% | ৩০% | +২% |
| জনস্বাস্থ্য খাতে জিডিপি'র অংশ | ০.৫৯% | ০.৬১% | +০.০২% |
উৎস: স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) এর বার্ষিক প্রতিবেদন।
সুপারিশ
- রোগতত্ত্ব নিরীক্ষণ ও গবেষণার সক্ষমতা বাড়াতে IEDCR-কে শক্তিশালী করা। বিশেষ করে, "জাতীয় রোগতত্ত্ব ও গবেষণা আইন, ২০২২" এর আওতায় রোগ শনাক্তকরণ কিট উন্নয়ন এবং জিনোমিক সিকোয়েন্সিং ল্যাবরেটরি স্থাপনে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় (MOHFW) থেকে আগামী তিন বছরের জন্য অতিরিক্ত ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ নিশ্চিত করা।
- মহামারীকালে মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে জাতীয় স্বাস্থ্য জরুরি প্রস্তুতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা। ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব মেন্টাল হেলথ (NIMH)-কে জেলা পর্যায়ে "মহামারীকালে কমিউনিটি মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা প্রোটোকল" প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া এবং DGHS-এর তত্ত্বাবধানে "জনস্বাস্থ্য জরুরি তহবিল" থেকে এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ করা।
- ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর (DGDA)-এর নিয়ন্ত্রক ও প্রয়োগকারী ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। "ঔষধ নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৮২ (সংশোধিত ২০২৩)" এর অধীনে ঔষধের গুণগত মান নিশ্চিত করতে ২০২৫ সালের মধ্যে দেশের ৭টি প্রধান অঞ্চলে অত্যাধুনিক ঔষধ পরীক্ষা ল্যাবরেটরি স্থাপন করা এবং MOHFW এর বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে এর জন্য নির্দিষ্ট বাজেট বরাদ্দ রাখা।