অর্গানিক পুষ্টি: বিজ্ঞান যা বলে, বাজার যা বোঝায় | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

অর্গানিক পুষ্টি: বিজ্ঞান যা বলে, বাজার যা বোঝায়

সুমাইয়া পারভীন  avatar   
সুমাইয়া পারভীন
অর্গানিক পুষ্টি: বিজ্ঞান যা বলে, বাজার যা বোঝায়
অর্গানিক পুষ্টি: বিজ্ঞান যা বলে, বাজার যা বোঝায়
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট আবাদি জমির এক শতাংশেরও কম ভূমি বর্তমানে আন্তর্জাতিক...

সম্প্রতি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) এর প্রকাশিত এক বিশ্লেষণাত্মক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, বাংলাদেশের মোট আবাদি জমির এক শতাংশেরও কম ভূমি বর্তমানে আন্তর্জাতিক বা জাতীয়ভাবে প্রত্যয়িত জৈব কৃষি পদ্ধতির আওতায় রয়েছে। অথচ, গত পাঁচ বছরে শহুরে বাজারগুলোতে 'অর্গানিক' লেবেলযুক্ত বিভিন্ন কৃষি পণ্যের চাহিদা এবং বিক্রি প্রতি বছর গড়ে প্রায় ২০-২৫ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই পরিসংখ্যানগত বৈষম্য কেবল ভোক্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তিই সৃষ্টি করছে না, বরং 'অর্গানিক পুষ্টি: বিজ্ঞান যা বলে, বাজার যা বোঝায়' শীর্ষক বিতর্কের এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। একদিকে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণা যেখানে জৈব কৃষির সীমাবদ্ধতা এবং পুষ্টিগত সুবিধা নিয়ে সতর্ক বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে বাজার তার নিজস্ব গতিতে 'অর্গানিক' ব্র্যান্ডিংকে একটি প্রিমিয়াম পণ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই তথ্যনির্ভরতা ও স্বচ্ছতার অভাবে ভুগছে।

এই বাজারের ক্রমবর্ধমান প্রবণতা এবং বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার মধ্যে যে ব্যবধান, তা গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) এর সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রচলিত পদ্ধতির তুলনায় জৈব পদ্ধতিতে শস্য উৎপাদন প্রায় ১৫-৩০ শতাংশ কম হতে পারে, যা একটি জনবহুল দেশের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে, জৈব পদ্ধতিতে উচ্চ ফলনশীল এবং পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ শস্যের জাত উদ্ভাবনে এখনও দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে, 'জৈব' শব্দটির মূল ফোকাস হলো উৎপাদন পদ্ধতি, মাটির স্বাস্থ্য এবং পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা, পুষ্টিগুণে অসামান্য শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ নয়। বহু বৈজ্ঞানিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, জৈব ও প্রচলিত পদ্ধতির উৎপাদিত খাদ্যের মধ্যে মূল পুষ্টি উপাদান, যেমন ভিটামিন ও খনিজ পদার্থের পরিমাণে উল্লেখযোগ্য তারতম্য প্রায়শই অনুপস্থিত থাকে। বরং, পুষ্টিগুণ নির্ভর করে শস্যের জাত, মাটির গুণাগুণ, জলবায়ু এবং ফসল তোলার পরবর্তী প্রক্রিয়াজাতকরণের উপর। বাজারে যে উচ্চমূল্যে জৈব পণ্য বিক্রি হচ্ছে, তার পেছনে মূলত উৎপাদন পদ্ধতির উচ্চ ব্যয়, প্রত্যয়ন প্রক্রিয়া, এবং বিপণন কৌশলের ভূমিকা বেশি, পুষ্টিগত শ্রেষ্ঠত্বের বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণের তুলনায়।

এই প্রেক্ষাপটে, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর তত্ত্বাবধানে পরিচালিত গবেষণাগুলো সমন্বিত পুষ্টি ব্যবস্থাপনার উপর জোর দিচ্ছে, যেখানে জৈব এবং অজৈব উভয় পদ্ধতির গুণগত বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে টেকসই কৃষি উৎপাদন নিশ্চিত করার কথা বলা হচ্ছে। BARC এর গবেষকরা উল্লেখ করেছেন যে, মাটির স্বাস্থ্য রক্ষায় এবং পরিবেশের উপর রাসায়নিকের বিরূপ প্রভাব কমাতে জৈব সারের ব্যবহার অনস্বীকার্য। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, সমস্ত প্রচলিত কৃষি পদ্ধতি পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর অথবা উৎপাদিত খাদ্য পুষ্টিহীন। পরিবেশ মন্ত্রণালয়ও রাসায়নিক সারের যথেচ্ছ ব্যবহার নিয়ন্ত্রণের জন্য বিভিন্ন নীতিমালা প্রণয়ন করছে এবং জৈব সারের ব্যবহারকে উৎসাহিত করছে, যা পরিবেশগত টেকসইতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে, এই উৎসাহকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে বাজারে 'অর্গানিক' পণ্যের নামে যা বিক্রি হচ্ছে, তার অনেক কিছুই প্রকৃত জৈব মানদণ্ড পূরণ করে না। সঠিক প্রত্যয়নের অভাব এবং ভোক্তা সচেতনতার অভাবে এক শ্রেণীর অসাধু ব্যবসায়ী 'অর্গানিক' লেবেলকে একটি আকর্ষণীয় বিপণন কৌশল হিসেবে ব্যবহার করছে, যা শেষ পর্যন্ত প্রকৃত জৈব কৃষকদের জন্য একটি অসম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করছে এবং ভোক্তাদের আস্থার সংকট সৃষ্টি করছে।

বাংলাদেশে জৈব কৃষি ও সংশ্লিষ্ট উপাত্ত (২০১৮-২০২২)
সাল প্রত্যয়িত জৈব জমির পরিমাণ (হেক্টর) জৈব সার উৎপাদন (লক্ষ মেট্রিক টন) মোট আবাদি জমির শতাংশ রাসায়নিক সার ব্যবহার (লক্ষ মেট্রিক টন)
২০১৮ ১,২০০ ১.৫ ০.০৭% ২৫.২
২০২০ ১,৪৫০ ২.২ ০.০৮% ২৬.৫
২০২২ ১,৮০০ ৩.৫ ০.১০% ২৭.৮

উৎস: কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর (DAE) ও বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর বার্ষিক প্রতিবেদন।

সুপারিশ

  • কৃষি মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (BSTI) এর যৌথ উদ্যোগে দ্রুত একটি সুনির্দিষ্ট 'জৈব কৃষি পণ্য প্রত্যয়ন আইন' প্রণয়ন ও কার্যকর করতে হবে। DAE এর মাধ্যমে প্রত্যয়ন প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও কঠোর করে, আন্তর্জাতিক মানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রত্যয়ন চিহ্ন (Certification Mark) বাধ্যতামূলক করতে হবে যাতে ভোক্তারা সহজেই প্রকৃত জৈব পণ্য শনাক্ত করতে পারে।
  • বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (BARC) এর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI) এবং বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (BRRI) কে জৈব পদ্ধতির মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল এবং পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ শস্যের জাত উদ্ভাবন, মাটির পুষ্টিগুণ বজায় রাখার কৌশল এবং সমন্বিত বালাই দমন (IPM) পদ্ধতি নিয়ে নিবিড় ও দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা পরিচালনা করতে হবে। DAE এর সম্প্রসারণ কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকদের জন্য ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি সহায়তা কর্মসূচী চালু করতে হবে।
  • পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে 'জৈব' পণ্যের সঠিক সংজ্ঞা, পুষ্টিগত বাস্তবতা এবং প্রত্যয়ন চিহ্ন সম্পর্কে দেশব্যাপী নিবিড় জনসচেতনতা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। বাজারে অননুমোদিত 'জৈব' লেবেলযুক্ত পণ্যের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি, নিয়মিত অভিযান ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে যাতে ভোক্তাদের প্রতারিত হওয়ার সুযোগ না থাকে এবং প্রকৃত জৈব কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পান।

✍️ নিবন্ধ লেখক: সুমাইয়া পারভীন

সুমাইয়া পারভীন 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: অর্গানিক ফার্মিং ও নিউট্রিশন। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

কোন মন্তব্য পাওয়া যায়নি


News Card Generator