নগর উন্নয়নে দুর্নীতির কালো থাবা: রাজউক, সিডিএ ও ভূমি প্রশাসনে অনিয়মের জাল | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

নগর উন্নয়নে দুর্নীতির কালো থাবা: রাজউক, সিডিএ ও ভূমি প্রশাসনে অনিয়মের জাল

তাসনিম হক  avatar   
তাসনিম হক
নগর উন্নয়নে দুর্নীতির কালো থাবা: রাজউক, সিডিএ ও ভূমি প্রশাসনে অনিয়মের জাল
নগর উন্নয়নে দুর্নীতির কালো থাবা: রাজউক, সিডিএ ও ভূমি প্রশাসনে অনিয়মের জাল
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের নগর উন্নয়ন খাত, বিশেষ করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং ভূমি নিবন্ধন অফিসগুলো দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ...

বাংলাদেশের নগর উন্নয়ন খাত, বিশেষ করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক), চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) এবং ভূমি নিবন্ধন অফিসগুলো দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতি ও অনিয়মের আখড়া হিসেবে পরিচিত। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন তদন্ত, আদালতের নির্দেশনা এবং গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এই খাতে চলমান দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে, যা নগরবাসীর জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলোর অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা পরিকল্পিত নগর গড়ার স্বপ্নকে বারবার বাধাগ্রস্ত করছে।

রাজউকের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নতুন নয়, তবে এর গভীরতা উদ্বেগজনক। ২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে হাইকোর্ট রাজউকের কর্মচারীদের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ অনুসন্ধান করে দুই মাসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেন। 'রাজউক চেরাগে বাড়ি গাড়ি প্লট দোকান' শিরোনামে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০-৩০ হাজার টাকা মাসিক বেতনের নিম্নপদস্থ কর্মচারীরাও রাজধানীতে একাধিক বহুতল বাড়ি, আধুনিক গাড়ি, প্লট, ফ্ল্যাট ও দোকানের মালিক হয়েছেন। ২০১৯ সালের ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে উঠে আসে যে, রাজউকের কর্মকর্তারা ভবন নকশা অনুমোদনের জন্য ৫০ হাজার টাকা থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেন এবং রাজউক ও দুর্নীতি সমার্থক হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ১০ তলার বেশি ভবন বা বিশেষ প্রকল্পের নকশা অনুমোদনে ডেভেলপারদের কাছ থেকে ১৫ লাখ থেকে ২ কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া হয়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসার পরেও রাজউকের প্লট বরাদ্দ, নকশা অনুমোদন এবং ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্রে অনিয়ম আগের মতোই রয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে, যেখানে প্ল্যান পাসের জন্য ৫ লাখ থেকে কোটি টাকা পর্যন্ত ঘুষ দিতে হয়। এমনকি, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) রাজউকের নিম্নমান সহকারী সাইদুর রহমানের কোটি কোটি টাকার দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু করেছে। নতুন বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) অনুমোদনের পর উঁচু ভবন নির্মাণে পুরোনো নথি ব্যবহার করে ছাড়পত্র নেওয়ার জালিয়াতির ঘটনায় রাজউকের একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছে। রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম নিজেও স্বীকার করেছেন যে, রিহ্যাব, রাজউক পরিদর্শক এবং ভবন মালিকদের 'যৌথ প্রযোজনায়' ভবন নির্মাণ ও অনুমোদনে অনিয়ম হচ্ছে। যদিও তিনি ৪৮ জন কর্মকর্তাকে বরখাস্ত এবং ১৮ জনকে ঢাকার বাইরে বদলির কথা জানিয়েছেন, যা দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি বড় পদক্ষেপ।

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)-ও দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্ত নয়। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) অধীনে নেওয়া প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ১৩টি (কিছু সূত্র মতে ১৪ বা ১৫টি) প্রকল্পের অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্ত শুরু করেছে। পূর্ববর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সময় অনুমোদিত এই প্রকল্পগুলোর মধ্যে লালখান বাজার থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, বহদ্দারহাট ফ্লাইওভার, মুরাদপুর ফ্লাইওভার, কদমতলী ফ্লাইওভার, নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প, কালুরঘাট থেকে চাক্তাই পর্যন্ত সড়ক নির্মাণ প্রকল্প, সিটি আউটার রিং রোডসহ আরও কয়েকটি উল্লেখযোগ্য প্রকল্প রয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মনিটরিং অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব কামাল উদ্দিনের নেতৃত্বে গঠিত পাঁচ সদস্যের কমিটি ইতোমধ্যে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেছে এবং কিছু প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছে। এই তদন্তের মাধ্যমে সিডিএর দীর্ঘদিনের অনিয়মের চিত্র আরও স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

ভূমি নিবন্ধন সেবা খাতেও দুর্নীতির চিত্র ভয়াবহ। ২০১৯ সালের টিআইবি'র এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমি দলিল নিবন্ধন সেবার প্রতিটি পর্যায়ে ব্যাপক অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে, যা দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণের ঝুঁকি তৈরি করেছে। দলিল নিবন্ধনের জন্য সেবাগ্রহীতাদের ১ হাজার থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়মবহির্ভূত লেনদেন করতে হয়। দলিলের নকল তোলার জন্য ১ হাজার থেকে ৭ হাজার টাকা এবং দলিল লেখক সমিতিকে ৫০০ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে দুদকের একটি ছদ্মবেশী দল তেজগাঁও ভূমি রেজিস্ট্রি অফিসে গিয়ে সরকারি ফির বাইরে বাড়তি অর্থ দাবির প্রমাণ পায় এবং তাৎক্ষণিকভাবে তিন কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। ভূমি নিবন্ধনে রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টিও একটি 'ওপেন সিক্রেট' হিসেবে রয়ে গেছে, যদিও সরকার নিবন্ধন কার্যক্রম ডিজিটাইজ করার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। এছাড়া, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সাবেক চেয়ারম্যান নুরুল বাসিরের বিরুদ্ধে ৬০ কোটি টাকায় পদ কেনার অভিযোগ এবং অবৈধভাবে বাণিজ্যিক প্লট রূপান্তরে আর্থিক ক্ষতির অভিযোগ উঠেছে, যার ফলস্বরূপ তাকে ওএসডি করা হয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত একটি নগর উন্নয়ন প্রকল্পে ৪২৫ কোটি টাকা অনিয়ম ও জবাবদিহিতার অভাবে নষ্ট হয়েছে, যার উদ্দেশ্য ছিল ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশনে অটো সিগন্যাল, সোলার সিস্টেম, ফুটপাত ও ফুটওভার ব্রিজ স্থাপন।

নগরীর শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) সম্প্রতি অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে। ২০২৬ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে পুরান ঢাকা, গুলিস্তান এবং জিরো পয়েন্ট থেকে বঙ্গভবন এলাকায় সড়ক ও ফুটপাত দখল করে গড়ে ওঠা অবৈধ দোকানপাট ও স্থাপনা অপসারণ করা হয়েছে। এসব অভিযানে অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা এবং মেয়াদোত্তীর্ণ ট্রেড লাইসেন্সের জন্য জরিমানা আরোপ ও আদায় করা হয়েছে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সক্রিয় পদক্ষেপ নিয়েছে, যার মধ্যে প্লট ও ফ্ল্যাট বরাদ্দে কোটা ব্যবস্থা বাতিল এবং অনিয়মের মাধ্যমে বরাদ্দকৃত ধানমন্ডির ১২টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট বাতিল উল্লেখযোগ্য। তবে এসব বিচ্ছিন্ন অভিযান ও পদক্ষেপ সত্ত্বেও, নগর উন্নয়ন খাতের সামগ্রিক দুর্নীতি ও অনিয়মের মূল উৎপাটন এখনও সম্ভব হয়নি। রাজউক, সিডিএ এবং ভূমি অফিসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাঠামোগত দুর্বলতা এবং জবাবদিহিতার অভাবই এই সমস্যার মূল কারণ।

সুপারিশ: নগর উন্নয়ন খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে এবং দুর্নীতি ও অনিয়ম বন্ধে একটি সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। প্রথমত, রাজউক, সিডিএ এবং ভূমি নিবন্ধন অফিসগুলোর সকল সেবা প্রক্রিয়া সম্পূর্ণরূপে ডিজিটাল করা উচিত, যাতে মানবিক হস্তক্ষেপের সুযোগ কমে আসে এবং স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পায়। দ্বিতীয়ত, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়কে চলমান তদন্তগুলো দ্রুত শেষ করে দোষী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কেউ এমন অনিয়ম করার সাহস না পায়। তৃতীয়ত, ভবন নির্মাণ ও নকশা অনুমোদনের ক্ষেত্রে 'একক জানালা' সেবা চালু করে প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং নিয়মিত তদারকি ও পরিদর্শন ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে, যাতে অবৈধ নির্মাণ বন্ধ হয়। চতুর্থত, ভূমি নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় রাজস্ব ফাঁকি রোধে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জমির সঠিক মূল্য নির্ধারণ এবং ডিজিটাল ভূমি জরিপ দ্রুত সম্পন্ন করতে হবে। পঞ্চমত, এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সর্বশেষে, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নাগরিকদের অভিযোগ জানানোর প্রক্রিয়া সহজ ও নিরাপদ করতে হবে, যাতে সাধারণ মানুষ নির্ভয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারে।


🔎 অনুসন্ধানে: তাসনিম হক

তাসনিম হক, 'আই নিউজ বিডি'-র অ্যান্টি-করাপশন ইনভেস্টিগেটিভ উইং-এর সদস্য। তাঁর বিট: রাজউক, সিডিএ ও নগর উন্নয়ন।

Inga kommentarer hittades


News Card Generator