প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা? | আই নিউজ বিডি | বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ ও ভিডিও

প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?

তৌহিদুর রহমান  avatar   
তৌহিদুর রহমান
প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি: নীতি প্রণেতাদের ব্যর্থতা নাকি সিস্টেমের দুর্বলতা?
ছবি: সংগৃহীত
সম্প্রতি World Bank-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলোতে দৈনিক প্রায় ৩০০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার একটি বিশাল অংশ অপরিশোধিত...

সম্প্রতি World Bank-এর এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, বাংলাদেশের প্রধান শহরগুলোতে দৈনিক প্রায় ৩০০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার একটি বিশাল অংশ অপরিশোধিত অবস্থায় পরিবেশ ও জলাশয়ে মিশে যাচ্ছে। এই বিপুল পরিমাণ বর্জ্যের প্রায় ৭৯% আসে বিভিন্ন প্রকার প্যাকেজিং শিল্প থেকে। এই পরিসংখ্যান কেবল একটি সংখ্যা নয়, বরং প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং খাতের অব্যবস্থাপনা এবং এর দীর্ঘমেয়াদী পরিবেশগত ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক, এই পরিস্থিতি কি নীতি প্রণেতাদের দূরদর্শিতার অভাবের ফল, নাকি আমাদের সামগ্রিক সিস্টেমের গভীরে প্রোথিত দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ?

বাংলাদেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি এবং শহরায়ন প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পের প্রসারকে ত্বরান্বিত করেছে। খাবার, পানীয়, ওষুধ থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্লাস্টিকের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই শিল্প যেমন একদিকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে অবদান রাখছে, তেমনি অন্যদিকে এর অপরিকল্পিত বৃদ্ধি পরিবেশের উপর মারাত্মক চাপ সৃষ্টি করছে। বিশেষত, সিঙ্গেল-ইউজ প্লাস্টিক ও ফুড-প্যাকেজিং প্লাস্টিকের ব্যবহার যেভাবে বাড়ছে, তা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উপর নজিরবিহীন চাপ তৈরি করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ অন্যান্য বড় শহরগুলোতে সামান্য বৃষ্টিতেই ড্রেনেজ ব্যবস্থা প্লাস্টিক বর্জ্যে অচল হয়ে পড়ে, যা জলাবদ্ধতা এবং জনদুর্ভোগের কারণ হয়। নদী এবং সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রেও প্লাস্টিক দূষণের ভয়াবহ প্রভাব দৃশ্যমান, যা মৎস্যসম্পদ এবং জীববৈচিত্র্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্লাস্টিক পণ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো কার্যকর বর্জ্য সংগ্রহ, পৃথকীকরণ ও পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়া গড়ে ওঠেনি, যা এই খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

নীতিগত দিক থেকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশ সরকার প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য কিছু পদক্ষেপ নিলেও সেগুলোর বাস্তবায়ন অত্যন্ত দুর্বল। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রণীত 'প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১' একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হলেও, এর যথাযথ প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এই বিধিমালাতে Extended Producer Responsibility (EPR) বা বর্ধিত উৎপাদক দায়িত্বের মতো আধুনিক ধারণা অন্তর্ভুক্ত করা হলেও, তা কার্যকরভাবে বাধ্যতামূলক করা বা এর প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এখনও অপ্রতুল। ফলস্বরূপ, উৎপাদকরা তাদের পণ্যের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী হচ্ছে না। একইসাথে, প্লাস্টিক বিকল্প পণ্যের উৎপাদন ও ব্যবহারকে উৎসাহিত করার জন্য শিল্প মন্ত্রণালয় কর্তৃক সুনির্দিষ্ট এবং বাস্তবায়নযোগ্য প্রণোদনা প্যাকেজের অভাবও লক্ষণীয়। World Bank ও ADB-এর মতো উন্নয়ন সহযোগীরা প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে আর্থিক ও কারিগরি সহায়তা দিতে প্রস্তুত থাকলেও, নীতিগত দুর্বলতার কারণে সেই সহায়তাগুলোও পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।

সিস্টেমের দুর্বলতাগুলো আরও গভীরে প্রোথিত। প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, যেমন – আধুনিক বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র, পৃথকীকরণ সুবিধা এবং পুনর্ব্যবহার প্ল্যান্টের অভাব প্রকট। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা সিটি কর্পোরেশন ও পৌরসভাগুলোর বর্জ্য সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। তাদের বাজেট, জনবল এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান প্রায়শই আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথেষ্ট নয়। উপরন্তু, সাধারণ জনগণের মধ্যে প্লাস্টিক বর্জ্য পৃথকীকরণ এবং পরিবেশ-বান্ধব ব্যবহারের বিষয়ে সচেতনতার অভাবও একটি বড় সমস্যা। দেশের অনানুষ্ঠানিক বর্জ্য সংগ্রহকারীরা প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও, তাদের কাজের পরিবেশ এবং নিরাপত্তার অভাব একটি বড় উদ্বেগের কারণ। প্লাস্টিক বর্জ্যকে সম্পদে রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় উদ্ভাবনী প্রযুক্তি এবং বিনিয়োগের অভাবও একটি সিস্টেমিক দুর্বলতা, যা প্লাস্টিক দূষণের চক্রকে ভাঙতে বাধা দিচ্ছে।

প্লাস্টিক বর্জ্য সংক্রান্ত তথ্য সংখ্যা/শতাংশ উৎস
বাংলাদেশে দৈনিক প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপাদন (শহর অঞ্চলে) প্রায় ৩০০০ টন World Bank, বাংলাদেশ প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিবেদন, ২০২০
প্যাকেজিং খাত থেকে সৃষ্ট প্লাস্টিক বর্জ্যের অংশ ৭৯% World Bank, বাংলাদেশ প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রতিবেদন, ২০২০
পুনর্ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্যের আনুমানিক হার ২৮% পরিবেশ অধিদপ্তর, বাংলাদেশ (২০১৯-২০২০ সালের তথ্য)
প্লাস্টিক বর্জ্য যা সরাসরি পরিবেশ ও জলাশয়ে যায় ৩৭% ADB-এর আঞ্চলিক গবেষণা, ২০১৯-২০২০
প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং শিল্পের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি হার ১০-১২% বাংলাদেশ শিল্প মন্ত্রণালয়, জাতীয় শিল্প নীতি পর্যালোচনা, ২০২১

উৎস: World Bank, ADB, বাংলাদেশ পরিবেশ অধিদপ্তর ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন প্রতিবেদন ও পর্যালোচনা।

সুপারিশ

  • পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে অবশ্যই 'প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১'-এর অধীনে Extended Producer Responsibility (EPR) নীতিকে কঠোরভাবে বাধ্যতামূলক করতে হবে এবং এর প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য একটি শক্তিশালী পর্যবেক্ষণ ও জবাবদিহিতা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
  • স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়কে (LGED) পৌরসভা ও সিটি কর্পোরেশনগুলোতে World Bank এবং ADB-এর আর্থিক ও কারিগরি সহায়তায় আধুনিক বর্জ্য পৃথকীকরণ, সংগ্রহ ও পুনর্ব্যবহার প্ল্যান্ট স্থাপনের জন্য সুনির্দিষ্ট এবং সময়বদ্ধ প্রকল্প হাতে নিতে হবে।
  • শিল্প মন্ত্রণালয়কে 'জাতীয় শিল্প নীতি'র আওতায় প্লাস্টিকের পরিবেশ-বান্ধব বিকল্প উদ্ভাবন ও উৎপাদনে বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা, কর ছাড় এবং প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করতে হবে, যার জন্য বাংলাদেশ সরকার একটি নির্দিষ্ট তহবিল গঠন করতে পারে।

✍️ নিবন্ধ লেখক: তৌহিদুর রহমান

তৌহিদুর রহমান 'আই নিউজ বিডি'-র একজন সিনিয়র সাংবাদিক ও বিষয়ভিত্তিক গবেষক। তাঁর বিশেষত্বের জায়গা: প্লাস্টিক ও প্যাকেজিং ইন্ডাস্ট্রি। এই নিবন্ধটি তাঁর নিজস্ব গবেষণা ও বিশ্লেষণ থেকে সংকলিত।

کوئی تبصرہ نہیں ملا


News Card Generator