গত শীতকালে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের পুনরাবৃত্তি এবং শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাংলাদেশের জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিড ও জ্বালানি সংকটের গভীরতা পুনরায় স্পষ্ট করে তুলেছে। যদিও বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সিস্টেম লস এবং সরবরাহ ব্যবস্থাপনার ত্রুটিকে আংশিক কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে, তবে মূল সমস্যাটি নিহিত রয়েছে জ্বালানি আমদানির ওপর অত্যধিক নির্ভরতা, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্য এবং ডলার সংকটের মতো সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলির মধ্যে। এই পরিস্থিতি কেবল জনজীবনে দুর্ভোগই বাড়ায়নি, বরং দেশের উৎপাদনশীলতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়নের পথে বড় বাধা হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা কাগজে-কলমে প্রায় ২৬,০০০ মেগাওয়াট (ক্যাপটিভ ও নবায়নযোগ্য উৎস সহ) হলেও, প্রকৃত উৎপাদন প্রায়শই ১৬,০০০ মেগাওয়াট থেকে ১৮,০০০ মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। এর প্রধান কারণ হলো জ্বালানি সরবরাহের অপর্যাপ্ততা, বিশেষত প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লার সংকট। দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোর উৎপাদন কমে যাওয়ায় এবং নতুন মজুদের আবিষ্কারের ধীরগতির কারণে সরকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দামের অস্থিরতা এবং সরবরাহের অনিশ্চয়তা বিদ্যুৎ উৎপাদনে সরাসরি প্রভাব ফেলে, যার ফলে বহু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তাদের পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারে না। একই সাথে, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য প্রয়োজনীয় কয়লা আমদানিতেও ডলার সংকট একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই জ্বালানি বৈচিত্র্যহীনতা এবং আমদানিনির্ভরতা বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপকে তীব্রতর করেছে, যার ফলে পিডিবি এবং অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী সংস্থাগুলো উল্লেখযোগ্য লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছে।
এই জ্বালানি সংকট শিল্প খাতের জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করেছে। টেক্সটাইল, পোশাক, ইস্পাত এবং সিমেন্টের মতো ভারী শিল্পগুলো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের অভাবে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ করছে। অনেক শিল্প প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব জেনারেটরের মাধ্যমে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে, যা তাদের উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হ্রাস করছে। বিশ্বব্যাংক (World Bank) এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (ADB) তাদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের এই কাঠামোগত দুর্বলতা এবং আর্থিক অস্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারে আরও বিনিয়োগ এবং বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকীকরণের ওপর জোর দিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের গ্রিড আধুনিকায়নে অর্থায়ন করেছে এবং স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি বাস্তবায়নে কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে, যা বিতরণ ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়াতে সহায়ক হবে। অন্যদিকে, ADB বেশ কয়েকটি সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে, যার লক্ষ্য দেশের জ্বালানি মিশ্রণে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বৃদ্ধি করা। এই আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পরামর্শ এবং আর্থিক সহায়তা সত্ত্বেও, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং নীতিগত সংস্কারের গতি এখনও ধীর, যা সংকট নিরসনে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
| সূচক | ২০২০ সাল | ২০২৩ সাল | পরিবর্তন (শতাংশ) |
|---|---|---|---|
| মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা (মেগাওয়াট) | ২২,৭৮৭ | ২৬,৪০০ (প্রায়) | +১৫.৮% |
| সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন (মেগাওয়াট) | ১৩,৭০০ | ১৬,৪০০ (প্রায়) | +১৯.৭% |
| গ্যাস-নির্ভর উৎপাদন (মোটের %) | ৫৮% | ৫০% | -৮% |
| কয়লা-নির্ভর উৎপাদন (মোটের %) | ৮% | ১৫% | +৭% |
| নবায়নযোগ্য উৎস থেকে উৎপাদন (মোটের %) | ২.৫% | ৩.৫% | +১% |
| প্রতি ইউনিট গড় উৎপাদন খরচ (টাকা) | ৫.৭০ | ৯.০০ (প্রায়) | +৫৭.৯% |
উৎস: বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় প্রকাশিত প্রতিবেদন।
সুপারিশ
- বিদ্যুৎ খাতের জ্বালানি মিশ্রণে বৈচিত্র্য আনতে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক ঘোষিত নবায়নযোগ্য জ্বালানি নীতি ২০০৮ (সংশোধিত) এর কঠোর ও দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য উৎস থেকে ৪০% বিদ্যুৎ উৎপাদনের যে লক্ষ্যমাত্রা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নির্ধারণ করেছে, তা অর্জনের জন্য সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (PPP) মাধ্যমে সৌর ও বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং গ্রিড অবকাঠামো আধুনিকায়নে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
- জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের স্থিতিশীলতা ও দক্ষতা বাড়াতে পাওয়ার সিস্টেম মাস্টার প্ল্যান (PSMP) অনুযায়ী স্মার্ট গ্রিড প্রযুক্তি এবং আধুনিক সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থা দ্রুত স্থাপন করতে হবে। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর (যেমন - ডেসকো, ওজোপাডিকো) সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সিস্টেম লস কমানোর জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দিয়ে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
- দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পেট্রোবাংলাকে নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি আন্তর্জাতিক তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলোর সাথে উৎপাদন-বণ্টন চুক্তি (PSC) পর্যালোচনা করে নতুন অনুসন্ধান ব্লকগুলোতে দ্রুত কার্যক্রম শুরু করার জন্য বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক প্রয়োজনীয় নীতিগত ও আর্থিক সহায়তা প্রদান করতে হবে, যাতে আমদানি নির্ভরতা কমে আসে।